‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বাদ দেওয়ার দাবি নূরুল কবীর ও সন্তোষ শর্মার

সংবিধান সংশোধনে ফের গণভোট হবে

সংবিধান সংশোধনে ফের গণভোট হবে

জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনে নতুন করে গণভোট আয়োজনের কথা জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। আদালতের রায়ে সংবিধানের বিশেষ কিছু ধারা সংশোধনে গণভোটের বিধান ফিরে আসায় এ উদ্যোগ নিতে হবে। তবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে হওয়া গণভোট বাতিল হয়নি বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী। ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটির রিপোর্ট চূড়ান্ত করে নতুন বছরের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপনের কথা জানান তিনি।

গতকাল রোববার বিকালে সংবাদপত্রের সম্পাদক ও বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সংবিধান সংশোধন বিষয়ে মতবিনিময় সভায় সালাহউদ্দিন আহমদ কমিটি ও সরকারের অবস্থান ব্যক্ত করেন। বিরোধী দল কমিটিতে প্রতিনিধি না দিলেও সংশোধন বিল সংসদে উত্থাপিত হলে তারা তার ওপর আলোচনায় অংশ নেবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিজ্ঞাপন

বৈঠক সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত মতবিনিময়ে সিনিয়র সাংবাদিকদের বেশিরভাগই উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করার বিষয়ে সংবিধান সংশোধনে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। দলীয় প্রভাবমুক্ত নিয়োগ না হলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো অতীতের মতোই বিতর্কিত ও দুর্বল হয়ে পড়বে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সংবিধান সংশোধনে দুর্বলতা থেকে যাবে বলেও মতপ্রকাশ করেন কয়েকজন সম্পাদক। বিরোধী দলের পাঁচ সংসদ সদস্যকে কমিটিতে আনার চেষ্টা অব্যাহত রাখার ওপরও জোর দেন তারা। সম্পাদক নূরুল কবীর ও সন্তোষ শর্মা ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করেন বলে জানা গেছে।

বৈঠকে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান মনোনয়নে সতর্ক থাকতে হবে। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্যথায় অতীতের মতো বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হবে। প্রধানমন্ত্রীর হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রাখার বর্তমান ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি যে অঙ্গীকার বিএনপি নির্বাচনের আগে করেছে, তা বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেন তিনি।

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল না থাকাকে তাদের ‘রাজনৈতিক ভুল’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এটা তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য সংবিধানে নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়ে তিনি এ বিষয়ে বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছেÑতা রক্ষার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী একদিকে সরকারপ্রধান, একইসঙ্গে সংসদ নেতা। তারপরও তাকে দলীয়প্রধান থাকতে হবে কেন? এতে দলেরও ক্ষতি হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিচার বিভাগের বাইরে থেকে মনোনীত করা গেলে ভালো হতো উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে এর বাইরে ভালো অপশন নেই। সুপ্রিম কোর্টের বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টিও সংবিধান সংশোধনে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানের পরামর্শের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, সংবিধানের গোড়ায় গলদ রয়েছে। ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ শব্দটি ঔপনিবেশিক। প্রজাতন্ত্রের মধ্যে জনসাধারণকে প্রজায় পরিণত করা হয়েছে। ‘রিপাবলিক’-এর বাংলা ‘প্রজাতন্ত্র’ কী করে হয়Ñসে প্রশ্ন তুলে বিষয়টি সংশোধনীতে বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি। ‘রাজনীতি’ শব্দের পরিবর্তে ‘জননীতি’ শব্দ ব্যবহার করা উচিত বলেও মত দেন তিনি। সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ রাখাকে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীকে প্রোটেক্ট করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পৃথিবীর কোথাও এমনটি নেই। মন্ত্রীদের শপথে গোপনীয়তার বিষয়টি বাদ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

বৈঠকে সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিল প্রসঙ্গে বলেন, এ ধরনের প্রস্তাব অধ্যাপক আলী রীয়াজের কমিটির সঙ্গে আলোচনাকালে উঠেছিল; কিন্তু কেউ এ বিষয়টি স্পর্শ করতে চায়নি।

প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মারুফ কামাল খান রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান রাখার প্রস্তাব করেন। জুলাই সনদে বিএনপি যে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, তার আলোকে এবং নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকার অনুসরণ করে সংবিধান সংশোধন করতে বলেন তিনি। জনগণ ভোটের মাধ্যমে বিএনপির ইশতেহার যেভাবে অনুমোদন করেছে, তার বাইরে সরকারের যাওয়ার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক ও বিএফইউজের সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহ বলেন, উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে সরকার ও বিরোধী দলের আসন সংখ্যায় যে সামান্য হেরফের হবে, তাতে সরকারের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করে না। এমনকি সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সদস্যদের সম্পৃক্ত করলেও তেমন কোনো ঝুঁকি থাকে না। কারণ, সরকারের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে বিদায়ের কথা ভাবতে পারেননি বলে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিল করেছেন, নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করেছেন। এখন সেই শেখ হাসিনাই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তুলবেন। ক্ষমতাসীন বিএনপিকেও মাথায় রাখতে হবেÑকোনো এক সময় ক্ষমতার বাইরে যেতে হবে, বিরোধী দলের আসনে বসতে হবে। সে সময় যাতে পস্তাতে না হয়, সেভাবে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

এ পর্যায়ে কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমাদের মাইন্ডসেট অলরেডি আছে যে, আমাদের বিরোধী দলের আসনে একসময় বসতে হতে পারে। সেটা মাথায় রেখেই আমরা সংবিধান সংশোধন করতে যাচ্ছি।

নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। উচ্চকক্ষকে গুরুত্ব দিতে সংবিধান সংশোধনে অংশ নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষে মত দেন এবং বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ও টেলিভিশন সম্পাদক ফোরামের সভাপতি ড. আবদুল হাই সিদ্দিক নোট অব ডিসেন্টসহ স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে মত দেন।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ প্রয়োজনে একতরফা উদারতা দেখিয়ে এবং সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দিয়ে হলেও বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি মিডিয়া সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিশ্চিতে সংবিধানে প্রয়োজনীয় ধারা যুক্ত করার পরামর্শ দেন।

কালবেলার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা অষ্টম সংশোধনী বাতিল করে সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেওয়ার দাবি জানান। নিম্নকক্ষের সদস্যদের অনুপাতে উচ্চকক্ষে নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়ে সংবিধান সংশোধনে তাদের সম্পৃক্ত করার কথাও বলেন।

মতবিনিময় সভায় আরো অংশ নেনÑফ্যাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, সমকালের সম্পাদক শাহেদ মোহাম্মদ আলী, দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, দ্য ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম, বণিক বার্তা সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, দ্য নিউ নেশনের সম্পাদক মোকাররম হোসেন, বাসসের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফজলুল হক, আমার দেশ-এর উপসম্পাদক ও ইআরএফের সাবেক সভাপতি সুলতান মাহমুদ বাদল, বিএফইউজের সাবেক মহাসচিব এমএ আজিজ, ডিইউজের সভাপতি শহীদুল ইসলাম, ডিআরইউর সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল, ইআরএফের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা, সাবেক সভাপতি খাজা মাইনুদ্দিন, ইত্তেফাকের চিফ রিপোর্টার শামসুদ্দিন আহমদ, পার্লামেন্ট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন জামিল, টিবিএসের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন প্রমুখ।

সংবিধান সংশোধনী কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেনÑচিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন, জোনায়েদ আহমেদ সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, মাহমুদুল হক রুবেল এবং সাকিলা ফারজানা।

ব্রিফিং

সভা শেষে সংসদ ভবনের বাইরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা বারবারই তাদের আহ্বান জানিয়েছি। তারা যখনই যোগ দেবেন, আমরা স্বাগত জানাব। আপনাদের যেসব বক্তব্য আছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে যেগুলো গ্রহণযোগ্য, সবার মতামতের ভিত্তিতে আমরা গ্রহণ করব। এটা ভালো হতো, তারা যদি আলোচনায় অংশ নিতেন। তাহলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে উচ্চারিত অনেক বিষয় আমরা ধারণ করতে পারতাম।

তিনি বলেন, আমরা চাই আমাদের মধ্যে পক্ষ থাকুক, বিভক্তি নয়। জুলাই জাতীয় সনদ আমরা যেভাবে স্বাক্ষর করেছি, সেভাবেই বাস্তবায়ন করব। এর বাইরে যেসব বিষয় আলোচনায় আসেনি বা বাদ পড়েছে, সেগুলোও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে চাই।

জুলাই জাতীয় সনদ ও বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন বলেন, প্রায়োরিটি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ। তবে আমাদের নির্বাচনি ইশতেহার অনুসারে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করে আমরা ম্যান্ডেট পেয়েছি, সেগুলো ধারণ করব।

গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু অনুচ্ছেদ সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধানসহ আরো দুটি অনুচ্ছেদকে গণভোটের আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সংসদ এসব বিধান পরিবর্তন করতে চাইলে জনগণের অনুমোদন নিতে হয়।

তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে পাস হওয়ার পর যেসব অনুচ্ছেদের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে সেগুলোয় গণভোট হবে।

বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছি, যাতে ডিসেম্বরের ভেতরে আমরা আমাদের রিপোর্টটি পার্লামেন্টে উপস্থাপন করতে পারি। সেক্ষেত্রে এই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিল আসবে। আমি আশা করি, জানুয়ারি সেশনে, যেটা বছরের প্রথম অধিবেশন, ওই সেশনে বিলটি আসবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন