তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কাঠামোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি উল্লেখ করে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এ ব্যবস্থা আমাদের প্রবর্তন করতেই হবে, এর কোনো গত্যন্তর নেই।
জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে কয়েকটি প্রস্তাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে সমঝোতা না হলে পরবর্তী বিকল্প কী হবে, সে বিষয়েও প্রস্তাব রয়েছে। একটি প্রস্তাব ছিল র্যাঙ্কড চয়েস ভোট। এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে তাদের মতামত ছিল। এছাড়া আলোচনার মাধ্যমে জাতীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য অন্য কোনো প্রস্তাব এলে সেটিও বিবেচনা করা হবে।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, কী প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে, এর কাঠামো কী হবে, কত দিনের মধ্যে গঠন করা হবে এবং কোন বাছাই কমিটির মাধ্যমে গঠন করলে বিতর্কের অবকাশ থাকবে না, এসব বিষয় পরীক্ষা করে দেখা হবে। সংসদে বিল উত্থাপনের পর বিতর্কের সময়ও বিভিন্ন পরামর্শ ও প্রস্তাব আসতে পারে।
সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা রাস্তায় আন্দোলন করে যেসব দাবি জানাচ্ছে, সেগুলো নিয়ে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে এলে তাদের বক্তব্য শোনা যেত। কিন্তু বিরোধী দল রাস্তার আন্দোলনকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
কমিটির সভাপতি জানান, বিগত ১৭ বছরের গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য শুনেছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। ভবিষ্যতে দেশে যাতে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংবিধানে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, সেগুলো সংবিধানে এবং যেসব বিষয় আইন, বিধি ও বিধানের মাধ্যমে করা সম্ভব, সেগুলো সেভাবেই বাস্তবায়ন করা হবে।
আমন্ত্রিতদের বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের প্রত্যেকের বক্তব্যে একটি অভিন্ন দাবি ছিল, দেশে ভবিষ্যতে যেন কেউ গুমের শিকার না হন। যারা গুমের শিকার হয়ে এখনো ফিরে আসেননি বা ফিরে এসেছেন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ অন্যান্য আদালতে মামলা করেছেন, তারা যেন দ্রুত সুষ্ঠু বিচার পান, সেই আবেদন জানিয়েছেন তারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যারা গুমের শিকার হয়ে ফিরে আসেননি, তাদের পরিবারের সদস্যরা স্বজনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। এ সময়ে তাদের সহায়-সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা নিয়ে আবেদন জানিয়েছেন তারা। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে এ বিষয়ে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা করা যায়। এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পুনর্বাসনের বিষয়েও আবেদন জানিয়েছেন। এ জন্য নতুন কোনো আইন প্রণয়ন প্রয়োজন হলে সে বিষয়টিও বিবেচনার অনুরোধ করেছেন তারা।
তিনি বলেন, আমরা চাই বাংলাদেশ আর কখনো এ রকম সময়ে ফিরে না আসুক। গুমের অপসংস্কৃতি ও অপরাধ চিরতরে বন্ধ হোক। বাংলাদেশে কোনো দিন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হবে না, গুমের শিকার হবে না, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হবে না এবং পুলিশের হেফাজতে বা কারা হেফাজতে মৃত্যুও হবে না।
সংবিধানে গুম প্রতিরোধের বিষয়ে নতুন কোনো বিধান যুক্ত করার চিন্তা রয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত রয়েছে। এ বিষয়ে সংবিধানে পর্যাপ্ত স্বীকৃতি আছে। তবে প্রতিরোধের জন্য আরো কিছু প্রয়োজন হতে পারে। যারা এসব কাজ করেছে, তারা সংবিধান লঙ্ঘন করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পুলিশের মহাপরিদর্শকের ক্রসফায়ার-সংক্রান্ত বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের এই সরকারের মেয়াদ এখন আট মাস পার হয়েছে। কোনো ক্রসফায়ার হয়েছে? বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে একটিও? কোনো কাস্টডিয়াল ডেথ হয়েছে? গুমের শিকার হয়েছে কেউ?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের মহাপরিদর্শকের বক্তব্যের পর ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। আইনের কঠোর প্রয়োগের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে হয়তো অসতর্কভাবে শব্দচয়ন করা হয়েছে। তবে তিনি ক্রসফায়ার করার নির্দেশ পেয়েছেন বা নিজে তা করতে চান, এমন কথা বলেননি। তারপরও এ ধরনের শব্দচয়ন করা বা উচ্চারণ করা সঠিক নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গুমের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদে পাস হওয়া আইনে গুমের শিকার ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দুটি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
গুমের ঘটনায় যে বাহিনী বা সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠবে, সেই বাহিনীই তদন্ত করবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন সংশোধন করে পাস করার সময় ভবিষ্যতে গুম প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ আইনে তদন্তের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও বিস্তারিত বিধান রয়েছে। যে বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শাখার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠবে, সেই বাহিনী নিজে ওই অভিযোগের তদন্ত করবে না, অন্য বাহিনী তদন্ত করবে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট বাহিনীর আচরণ, শৃঙ্খলা ও বিভাগীয় ব্যবস্থা সম্পর্কেও আইনে বিধান রাখা হয়েছে।
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

