ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বার্থবিরোধী ওয়াকফ সংশোধনী বিল পাস ও বিজেপি সরকারের ধারাবাহিকভাবে মুসলিমবিরোধী পদক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।
এ আইন ভারতে মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে ভারতের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর ক্রমাগত বৈষম্য ও নিপীড়নের আরেকটি অধ্যায় রচনা করবে বলে তিনি উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
রোববার এক ফেসবুক পোস্টে আসিফ নজরুল বলেন, ‘ভারতে মোদি সরকার মুসলমান বিরোধী আরও একটি পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন আইন পাস করে তারা মুসলমানদের ‘ওয়াকফ’ সম্পত্তি পরিচালনা বোর্ডে অমুসলিমদেরও রাখার এবং এসব সম্পত্তিতে সরকারের সরাসরি খবরদারিত্বের বিধান করেছে। এই আইন ব্যবহার করে পুরোনো মসজিদসহ মুসলমানদের বহু ঐতিহাসিক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।’
হিন্দু মন্দির পরিচালনায় অন্য ধর্মাবলম্বীরা স্থান পান না উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘এই প্রশ্ন সেখানে উঠেছে যে, ওয়াক্ফ বোর্ডে তাহলে অমুসলিমদের রাখা হবে কেন? এই আইন ভারতে মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে ভারতের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর ক্রমাগত বৈষম্য ও নিপীড়নের আরেকটি অধ্যায় রচনা করবে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এরাই আবার বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিপীড়নের ভুয়া অভিযোগ তুলে যাচ্ছে অব্যাহতভাবে।’
প্রসঙ্গত, ভারতে মুসলমানদের দান করা শত শত কোটি ডলার মূল্যের ওয়াক্ফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ও বহু বছরের পুরোনো পরিচালনা পদ্ধতি সংশোধনে ওয়াক্ফ বিল পাস হয়েছে। ২ এপ্রিল লোকসভায় ২৮৮-২৩২ ভোটে ওয়াক্ফ (সংশোধনী) বিল পাস হয়। লোকসভায় পাস হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বিলটি উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় দীর্ঘ বিতর্ক শেষে সহজেই পাস হয়ে যায়। উচ্চকক্ষের ভোটাভুটিতে বিলের পক্ষে ১২৮টি এবং বিপক্ষে ৯৫টি ভোট পড়ে। এখন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু বিলটিতে স্বাক্ষর করলেই তা আইনে পরিণত হবে।
অথচ ইসলামি বিধান অনুযায়ী ওয়াক্ফ হলো ধর্মীয় বা সমাজকল্যাণমূলক দান, যা মুসলিমরা জনগণের কল্যাণে করেন। একবার কোনো সম্পত্তি ওয়াক্ফ হিসেবে নির্ধারিত হলে তা বিক্রি করা যায় না, কিংবা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারও করা যায় না। এর মানে—ওয়াক্ফ সম্পত্তি আসলে আল্লাহর নামে উৎসর্গীকৃত।
এ সম্পত্তিগুলোর একটা বড় অংশ মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান ও এতিমখানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবার অনেক সম্পত্তি রয়েছে, যা ফাঁকা পড়ে আছে কিংবা দখল হয়ে গেছে।
ভারতে ওয়াক্ফ প্রথার ইতিহাস বহু পুরোনো। ১২ শতকে দিল্লি সালতানাত আমলে মধ্য এশিয়া থেকে আগত মুসলিম শাসকদের হাত ধরেই এই প্রথার সূচনা হয়। বর্তমানে ওয়াক্ফ সম্পত্তি ‘ওয়াক্ফ আইন, ১৯৯৫’-এর আওতায় পরিচালিত হয়। এই আইনে রাজ্যভিত্তিক ওয়াক্ফ বোর্ড গঠনের বিধান রয়েছে, যেখানে সরকার মনোনীত ব্যক্তি, মুসলিম জনপ্রতিনিধি, বার কাউন্সিল সদস্য, ইসলামি চিন্তাবিদ এবং ওয়াক্ফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওয়াক্ফ বোর্ডগুলো ভারতের অন্যতম বৃহৎ ভূমির মালিক। দেশজুড়ে কমপক্ষে ৮ লাখ ৭২ হাজার ৩৫১টি ওয়াক্ফ সম্পত্তি রয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার একর। এসবের মোট মূল্য ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন রুপি, যা প্রায় ১৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন পাউন্ড।
বিজেপি নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, বিলটি আইনে পরিণত হলে তা ওয়াক্ফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনবে। অন্যদিকে বিরোধী দল এবং বেশির ভাগ মুসলিম সংগঠনের দাবি, ভারতের সর্ববৃহৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করতেই বিলটি আনা হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

