দালাল ধরলে কেন কাজ দ্রুত হয়ে যায়, প্রশ্ন জাইমার

দালাল ধরলে কেন কাজ দ্রুত হয়ে যায়, প্রশ্ন জাইমার

জীবনের দ্বিতীয় ড্রাইভিং টেস্ট দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ ও সরকারি সেবার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীকন্যা জাইমা রহমান। বুধবার সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব প্রশ্ন তোলেন।

পোস্টে জাইমা রহমান লেখেন, ‘গত সপ্তাহে আমি জীবনের দ্বিতীয় ড্রাইভিং টেস্ট দিলাম, এবার বাংলাদেশে গাড়ি চালানোর অনুমতির জন্য। প্রথমটি দিয়েছিলাম লন্ডনে, দশ বছরেরও বেশি আগে। দুটিতেই প্রথমবারে উত্তীর্ণ হয়েছি। কিন্তু গাড়ি চালানোর বাস্তবতার জন্য একটি পরীক্ষা আমাকে যতটা প্রস্তুত করেছে, অন্যটি ততটা করেনি।’

বিজ্ঞাপন

‘এখানকার পুরো প্রক্রিয়াটির ভেতর দিয়ে যেতে যেতে আমি কেবল ড্রাইভিং টেস্ট বা লাইসেন্স নিয়ে ভাবিনি। ভেবেছি আমাদের সড়ক ব্যবহারের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা নিয়ে, আর সেই সড়ক নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে।’

‘অনেক তরুণ বাংলাদেশির, বিশেষ করে ঢাকার তরুণদের, একটি মৌলিক হতাশা আছে: আমাদের কাছ থেকে নিয়ম মেনে চলার প্রত্যাশা করা হয় এমন একটি ব্যবস্থার ভেতরে, যেটি সব সময় নিরাপদ বা অনুমানযোগ্য মনে হয় না।’

তিনি আরো লেখেন, ‘পথচারী হিসেবে আপনাকে হয়তো পর্যাপ্ত ক্রসিং ছাড়াই দ্রুতগতির সড়ক পার হতে হয়, এমন ফুটপাত ধরে হাঁটতে হয় যেটি হঠাৎ শেষ হয়ে যায় কিংবা দখল হয়ে থাকে, আর পথ করে নিতে হয় বাস, মোটরসাইকেল, রিকশা ও প্রাইভেট কারের ভিড়ের মধ্য দিয়ে, যেগুলোর প্রত্যেকটি চলছে আলাদা আলাদা অলিখিত নিয়মে।’

‘যাত্রী হিসেবে আপনার হাতে কার্যত কিছুই থাকে না। আপনার বাসটি যাত্রী তোলার জন্য অন্য বাসের সঙ্গে পাল্লা দেবে কি না, হঠাৎ ব্রেক কষবে কি না, গাড়িটির যান্ত্রিক ফিটনেস আছে কি না, কিংবা চালক ঠিকমতো প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম পেয়েছেন কি না, কোনো কিছুই আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই।’

প্রশ্ন করে জাইমা রহমান লেখেন, ‘আর নতুন চালক হিসেবে সবকিছু নিয়ম মেনে করতে গেলে আরেক দফা প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়।’

‘নিয়মগুলো আসলে কী? কেন সেগুলো একেকজনের জন্য একেক রকম মনে হয়? সঠিক পদ্ধতিটা কী? অনলাইন প্রক্রিয়া কেন সব সময় যথেষ্ট নয়? দালাল ধরলে কেন কাজটা দ্রুত হয়ে যায়? পরীক্ষায় পাস করার পরও কেন মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় সেই কাগজটির জন্য, যা প্রমাণ করে আমি পাস করেছি? এভাবে প্রশ্ন চলতেই থাকে।’

তিনি আরো লেখেন, ‘বিআরটিএ তার অনেক সেবা ডিজিটাল করেছে, যা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু ডিজিটাল করা তখনই কাজে আসে, যখন তা সত্যি সত্যি মানুষের জীবন সহজ করে। ‘

‘অনলাইনে শুরু হওয়া কোনো সমস্যার সমাধান যদি শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় ‘অফিসে এসে কথা বলুন’-এ, তাহলে সমস্যাটির সমাধান আসলে হয়নি। প্রতিটি অপ্রয়োজনীয় সশরীরে যোগাযোগ দেরি, পক্ষপাত কিংবা লেনদেনের নতুন সুযোগ তৈরি করে। ব্রোকারেরা এই প্রক্রিয়ার ফাটলটিরই সুযোগ নেয়। মানুষ আইন ভাঙতে চায় বলে নয়, বরং সরকারি প্রক্রিয়াটি এতটাই কঠিন হয়ে ওঠে যে একজন মধ্যস্থতাকারীই সবচেয়ে সহজ পথ হয়ে দাঁড়ায়। এটি বিশেষভাবে ক্ষতিকর, কারণ এতে দুর্নীতি ব্যতিক্রম না থেকে কাজ আদায়ের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়।’

জাইমা রহমান লেখেন, ‘একই সমস্যা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও। লাইসেন্স, ফিটনেস, প্রশিক্ষণ ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ চমৎকার সব নিয়ম করতে পারে। কিন্তু নিয়ম যদি বেছে বেছে প্রয়োগ হতে দেখা যায়, মানুষ দ্রুতই সেসব নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে। একজন নতুন চালক তখন ভাবেন: আমাকে বলা হচ্ছে নিয়ম মানা অপরিহার্য, অথচ চোখের সামনেই ফিটনেসবিহীন গাড়ি, বেপরোয়া চালনা আর নানা লঙ্ঘন দিব্যি চলছে। কেন?’

‘দুর্নীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা তাই কেবল অন্যায়টি ঘটা নয়, সেটির প্রতিকার কীভাবে হয়, সেটিও। অভিযোগ করে কিছু হবে না, বরং নিজেরই বাড়তি ভোগান্তি হবে, মানুষ যদি এমনটা বিশ্বাস করে, তাহলে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াটি দাঁড়ায়: ‘কী দরকার? চেনাজানা কাউকে বলি। আর এই ভাবে বেপারটি চলতেই থাকে ‘

‘এ কারণেই সড়ক নিরাপত্তা কেবল গাড়ি, লাইসেন্স আর শাস্তির বিষয় হতে পারে না। এটি হতে হবে সেই মানুষগুলোকে ঘিরে, যাঁরা প্রতিদিন পথ চলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে হেঁটে যাওয়া একজন শিক্ষার্থী। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরা একজন নারী। পরের অর্ডারটি ধরার তাড়ায় থাকা একজন ফুড ডেলিভারি রাইডার। অতিরিক্ত সময় ধরে গাড়ি চালানো একজন বাসচালক। ব্যস্ত সড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করা একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। একজন রিকশাচালক, যার বাহনটিই তার জীবিকা। একই সড়ক তাদের প্রত্যেকের কাছে সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা।’

‘ভালো নীতিমালাকে এই বাস্তবতাগুলো বুঝতে হবে। নইলে নিয়ম উল্টো দরিদ্র বা বেশি ঝুঁকিতে থাকা সড়ক ব্যবহারকারীদের আরও গভীরভাবে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেবে, আর তাতে শোষণ ও ঘুষের নতুন সুযোগই তৈরি হবে।’

‘এসব কথা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নিরাপদ সড়কের দাবিতে তরুণেরা বছরের পর বছর কথা বলে আসছেন। ২০১৮ সালে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল, লাইসেন্স পরীক্ষা করেছিল, যানবাহন চলাচল সামলানোর চেষ্টা করেছিল এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। আট বছর পরও সেই উদ্বেগগুলোর অনেকটাই রয়ে গেছে।’

‘তাই প্রশ্নটি এখন সম্ভবত আর এই নয় যে ‘সড়ক নিরাপদ নয়’। প্রশ্নটি বরং এই: ‘সমস্যাগুলো তো আমরা আগেই চিহ্নিত করে দিয়েছি। ব্যবস্থাটি এখনো সেগুলো ঠিক করল না কেন?’

জাইমা লেখেন, আমার মনে হয়, এখানেই আমাদের প্রশ্নটা বদলে যায়। প্রশ্ন কেবল এটি হতে পারে না যে ‘নাগরিকদের দিয়ে কীভাবে নিয়ম মানানো যাবে?’

আমাদের এটিও জিজ্ঞাসা করা উচিত: ‘সংযোগ থাকুক বা না থাকুক, আমরা কীভাবে নিশ্চিত করব যে সবাই একই পরিষেবা পাবে?’

'আমরা কীভাবে আইন প্রয়োগকে ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারি?'

‘কীভাবে আমরা অভিযোগ ও অন্যায়ের বিষয়ে জানানোকে নিরাপদ ও সার্থক করে তুলতে পারি?’

‘এবং আমরা কীভাবে রাস্তা ডিজাইন করব, যাতে একটি সাধারণ ভুলের কারণে কারও জীবনহানি না ঘটে?’

পরিবর্তন যদি আমরা সত্যিই চাই, তাহলে আমাদের ভাবনার কাঠামোটাই নতুন করে সাজাতে হবে।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন