আগামী ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটের সম্ভাব্য তারিখ ২৪ ডিসেম্বর বুধবার। ভোটের দিন থাকবে সাধারণ ছুটি। এরপর তিনদিন ছুটি থাকায় কমিশন ওইদিনকে নির্বাচনের জন্য বাছাই করেছেন।
এ উপলক্ষে ইসি একটি প্রাথমিক রোডম্যাপ তৈরি করেছে। সেখানে ভোটগ্রহণের তারিখটি ফাঁকা রেখে তফসিলের বাকি সময়গুলো চূড়ান্ত করা আছে। ইসি কমিশনের দু’জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
সূত্র জানায়, সরকার ঘোষিত দুটি সময়ের প্রথমটি ধরে তারা জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের প্রত্যাশা. চলমান রাজনৈতিক বিভাজন জুন-জুলাইয়ের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে। রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছবে। আর ডিসেম্বরেই নির্বাচন হবে। দৈবদুর্বিপাকে নির্বাচনের সময় পেছালে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ভোটটি করার প্রস্তুতি রাখছে ইসি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন আমার দেশকে জানান, ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচন করব, এ চিন্তা রেখেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। নির্বাচনি সরঞ্জাম কেনার কাজ ফাইনাল করতে সব কাজ শেষ, চলতি মাসেই দরপত্র আহ্বান করা হবে। সীমানা আইন সংশোধন না হলে বিদ্যমান সীমানায় ভোট করা হবে। তবে দৈবদুর্বিপাকে নির্বাচন চলতি বছর না হলে এপ্রিলের প্রথম ভাগে সম্পন্ন করা হবে। এরপর যাওয়ার সুযোগ নেই।
ইসিসংশ্লিষ্টরা জানান, ডিসেম্বরে নির্বাচন সম্পন্নে যে ধরণের প্রস্তুতি থাকা দরকার সবই করছে কমিশন। এর অংশ হিসেবে চলতি মাসেই নির্বাচনের সামগ্রী কেনার জন্য দরপত্র আহবান করা হবে। ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন শেষ করে যাতে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করতে পারে ওই লক্ষ্যে একত্রে মালামাল কেনা হচ্ছে। যার মধ্যে কিছু নির্বাচনি সরঞ্জাম জাতিসংঘ উন্নয়ন কমসূচি (ইউএনডিপি) থেকে সংগ্রহ করা হবে।
এদিকে দেশজুড়ে চলছে হালনাগাদ ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম। আগামী ১১ এপ্রিল এ প্রক্রিয়া শেষে জুনের মধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। এ তালিকায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার নতুন ও বাদপড়া ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন।
তৃতীয় প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সংসদীয় আসনের সীমানা বিন্যাস সম্পন্ন করা। ইসিতে জমা প্রায় ৪০০ আবেদন নথিভুক্ত করে প্রাথমিক পর্যালোচনা চূড়ান্ত হয়েছে। বিগত কমিশনের বিতর্কিত সীমানা বিন্যাসের ধারা সংশোধনের খসড়া মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আইনটি সংশোধিত হয়ে এলে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই কাজটি সম্পন্ন করার সময়সীমা রোডম্যাপে নির্ধারণ করা আছে।
ইতিমধ্যে জিওগ্রাফিক্যাল ইনরফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) পদ্ধতিতে সীমানা বিন্যাস কাজ সমাধান করতে ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান সন্ধানে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এরপরও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে আসনবিন্যাস করার কথা বলা হয়েছে। সরকার থেকে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হলেও আসনবিন্যাস ছাড়াই বিদ্যমান সীমানা ধরে ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচন করবে।
চতুর্থ ধাপে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনকাজ করবে কমিশন। এই কাজটিও আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করবে। পুরোনো ও নতুন আবেদন যাচাই-বাছাই করে দল নিবন্ধনের শর্তপূরণসাপেক্ষে যারাই যোগ্য হবেন, তাদের নিবন্ধন দেবে ইসি। সোমবার দল নিবন্ধনের আবেদন চেয়ে ইসি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ৯৩টি দল আবেদন করেছিল, যার মধ্যে ১৩টি বাছাইয়ে টিকে ছিলো। এগুলো হলো, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বাংলাদেশ (ন্যাপ বাংলাদেশ), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি), ন্যাশনাল কংগ্রেস বাংলাদেশ (এনসিবি), বাংলাদেশ বৈষম্যবিরোধী গণতান্ত্রিক দল, তৃণমূল জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম পার্টি, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ রিপাবলিক পার্টি, সর্বজন বিপ্লবী দল ও সমতা পার্টি।
পঞ্চম ধাপে প্রবাসীদের ভোটাধিকার কীভাবে নিশ্চিত করতে পারেন, সে বিষয়ে তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে কাজ করছে কমিশন। এর মধ্যে পোস্টাল ব্যালট, ই-ভোটিং ও প্রবাসীদের দেশে থাকা বিশ্বস্ত নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে প্রক্সি ভোট দিয়ে প্রবাসীদের মনরক্ষা করা। ইতিমধ্যে পোস্টাল ব্যালট ও ই-ভোটিংয়ের নেতিবাচক উদাহরণ খুঁজে পাওয়ায় প্রক্সি ভোট কীভাবে দিতে পারে, সে উপায় খুঁজছে ইসি। এই কাজটিও আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করতে কমিশন।
ষষ্ঠ ধাপে জুন-জুলাইয়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করে আগস্ট থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় শুরু করবে। সেপ্টেম্বেরের মধ্যভাগে এ কাজটিও শেষ করবে। বর্তমান দেশি-বিদেশি ও সাংবাদিকদের পর্যবেক্ষণ নীতিমালা সংশোধনের কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে। এপ্রিলের মধ্যে এ সংক্রান্ত সংশোধনের কাজও শেষ করার চিন্তা খসড়া রোডম্যাপে রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গত কমিশনের বিতর্কিত ভোটকেন্দ্রের নীতিমালা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারির কাজটিও চলতি মাসের মধ্যে শেষ করবে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের জন্য সংস্কারযোগ্য বিষয়গুলোর অনুশীলন শেষ করেছি। ভোটার তালিকা হালনাগাদ জুনের মধ্যে শেষ করা হবে। সীমানা বিন্যাসের জন্য জিআইএস পদ্ধতির ওয়ার্ক অর্ডার হয়েছে, মে-জুনের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যাবে। রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের যে শর্ত সেগুলো পূরণ হলেই নিবন্ধন দেওয়া হয়। অক্টোবরে তফসিল ঘোষণা করা হলে এর দুই-তিন মাস আগে দল নিবন্ধন সম্পন্ন করব।
তিনি বলেন, অতীতে ৬৭ দিনের মধ্যে তফসিল থেকে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। এবার ৬০ দিন রাখা হতে পারে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও আপিলের সময় বাড়িয়ে প্রচারের সময় কমানো হতে পারে।
ভোটে চ্যালেঞ্জগুলো কি জানতে চাইলে- তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে ভোট করা একটা চ্যালেঞ্জ। তবে, আইন-শৃঙ্খলার যে পরিবর্তন হচ্ছে, এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকে তাহলে আমরা মনে করি, জুন-জুলাইয়ের মধ্যে নির্বাচন করার একটা পরিবেশ পেয়ে যাব। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে নিরপেক্ষতার পরিপ্রেক্ষিতে পোস্টিং হয়েছে। এরপরও আমাদের একটা পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এগুলো নিয়ে জন-প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা বসব। এটা অক্টোবরে তফসিল ঘোষণার আগেই হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


