ফিডের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, খরচ সামলাতে হিমশিম পোলট্রি খামারিরা

ফিডের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি,
খরচ সামলাতে হিমশিম
পোলট্রি খামারিরা

পোলট্রি খামারিদের টিকে থাকাই যেন দায় হয়ে পড়েছে। ফিডের দাম বাড়ার পেছনে এবার সামনে আসছে কাঁচামালের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা। ফিড তৈরির প্রধান উপাদান ভুট্টা, ডিওআরবি (ডি-অয়েলড রাইস ব্রান), রাইস ব্রান, সরিষার খৈল ও সয়াবিন মিলসহ প্রায় প্রতিটির দামই এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে। স্থানীয় বাজারগুলোয় সরবরাহ পরিস্থিতি, উৎপাদন ও মজুত, আমদানিনির্ভরতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার এবং ডলারের বিনিময়হারও এই মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

বিজ্ঞাপন

পোলট্রি খামারিরা বলছেন, মাসখানেক আগে এক বস্তা খাবারের দাম ছিল ৩,৪৭৫ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৩,৬০০ থেকে ৩,৬৫০ টাকায়। সয়াবিন ফিডের দামও বেড়ে ৯৫০ টাকা থেকে ১,২০০ টাকা হয়েছে। কিছু দরকারি ওষুধের দাম ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৩৬০-৩৭০ টাকায়। এছাড়াও বেড়েছে বিদ্যুৎ বিল ও জ্বালানি খরচ। তবে সে অনুপাতে বাড়েনি মুরগির দাম। এক মাস আগে পাইকারিতে প্রতি কেজি মুরগির দাম ছিল ১৪০ টাকা। এখন তা কমে ১৩২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সব মিলিয়ে খরচ মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন খামারিরা।

দুই দফায় ফিডের দাম বাড়ার পর এখন মুরগিকে আগের মতো ফিড দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে তা কমিয়ে দিয়েছেন। তারা বলছেন, এতে মুরগির কাঙ্ক্ষিত ওজন হচ্ছে না, বাজারে ভালো দামও মিলছে না। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত খামার বন্ধ করে দিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খামারিরা।

ফিডের কাঁচামালের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি ভুট্টা। খাতসংশ্লিষ্টদের দেওয়া হিসাবে ১৩ শতাংশ আর্দ্রতার ভুট্টার দাম এক মাস আগে কেজিপ্রতি ছিল ৩১ টাকা ৩০ পয়সা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ টাকা ৮০ পয়সায়। অর্থাৎ এক মাসে কেজিতে দাম বেড়েছে সাত টাকা ৫০ পয়সা।

মৌসুমি বাজারেও ভুট্টার দামের বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে প্রতি কেজি ভুট্টা ২৮-২৯ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও জুন, জুলাই ও আগস্টে তা বেড়ে ৩৮-৪০ টাকায় উঠেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও ভুট্টার দাম প্রতি টন ২৩৫-২৪০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২৯০ ডলারে পৌঁছেছে।

বাড়ছে বিকল্প প্রোটিন উপাদানের দামও

শুধু ভুট্টা নয়, ফিড তৈরিতে ব্যবহৃত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের দামও বেড়েছে। এক মাসের ব্যবধানে ডিওআরবির দাম কেজিপ্রতি ২৬ টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ টাকা হয়েছে। ১৬ শতাংশ তেলযুক্ত চালের কুঁড়ার দাম ৩৩ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৯ টাকা। সরিষার খৈলের দাম ৩৬ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৯ টাকা ৭০ পয়সায় উঠেছে।

অন্যদিকে সয়াবিন মিলের দামও কেজিপ্রতি ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে ৬৬ টাকা হয়েছে। ফিড তৈরিতে এসব উপাদান প্রোটিন ও শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হওয়ায় দাম বাড়ার প্রভাবও সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ে পড়ছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, একটি মানসম্মত ফিড উৎপাদনের মোট ব্যয়ের ৮০-৮৫ শতাংশই কাঁচামাল কেনায় ব্যয় হয়। ফলে কাঁচামালের বাজারে সামান্য পরিবর্তন হলেও ফিড উৎপাদন ব্যয়ে তার প্রভাব পড়ে। কাঁচামালের দাম বাড়ার সঙ্গে পরিবহন, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে উৎপাদকদের ওপর চাপ আরো বাড়ে।

প্রতি বস্তায় বেড়েছে খামারির খরচ

বগুড়া সদরের পোলট্রি খামারি নাদিম হোসেন জানান, গত এক সপ্তাহেই বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ খাবারের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে ব্রান ও ভুট্টার ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি বলে জানান তিনি।

তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা ব্রানের দাম ১,৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ১,৮০০ টাকা হয়েছে। ভুট্টার দাম কেজিতে ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৭ টাকা হয়েছে। এ অবস্থায় ৫০ কেজির এক বস্তা পোলট্রি ফিডের দাম ৩,৬৭৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।

নাদিমের মতো অনেকেই বলছেন, খামারিদের উৎপাদন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশই মুরগির খাবারে চলে যায়। কোনো কোনো খামারির হিসাবে মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ফিডের পেছনে ব্যয় হয়। এতে উৎপাদন খরচ নিয়ে বড় চাপের মধ্যে পড়েছেন খামারিরা।

কাঁচামালের বাজারে সংকটই বড় প্রশ্ন

পোলট্রি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ফিড মিল পর্যায়ে দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কারণ, ফিডের দামের মূল চাপ তৈরি হচ্ছে কাঁচামালের বাজারে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামালের সরবরাহ কমে গেলে কিংবা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে দাম বেড়ে যায়। আবার আমদানিনির্ভর উপাদানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারদর, ডলারের বিনিময়হার, আমদানি ব্যয় ও শুল্ক-কর যুক্ত হয়।

বাংলাদেশ প্রান্তিক পোলট্রি খামারি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাসেল প্রধান বলেন, দেশের ফিডের কাঁচামালের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিওআরবি ও রাইস ব্রানের সরবরাহ আগে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনুযায়ী নিশ্চিত করা দরকার। প্রয়োজন হলে এসব পণ্য রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, আমদানি করা কাঁচামালের ওপর ভ্যাট, কর ও শুল্ক কমানো এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো দরকার। তার মতে, ফিডের দাম কমাতে পারলে খামারিদের উৎপাদন ব্যয়ও কমবে। এতে ডিম ও মুরগির বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল নিউট্রিশন বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. শফিকুর রহমান শিশির বলেন, ডিওআরবি ও রাইস ব্রানের মতো স্থানীয় কাঁচামালের ক্ষেত্রে আগে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করা উচিত। তবে রপ্তানির সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ না করে উৎপাদক ও স্থানীয় শিল্পের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়লে আমদানি পর্যায়ের কর ও শুল্ক সাময়িকভাবে সমন্বয় করা যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ভুট্টাসহ দেশে উৎপাদনযোগ্য কাঁচামালের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশের ফিডশিল্প তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে থাকবে।

ফিডের মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় নিয়ে ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। গত চার মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খামারিরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ডিম ভেঙে প্রতিবাদ ও স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি পালন করেছেন। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজশাহী, গাজীপুর, পাবনা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, নরসিংদী, ঢাকা, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে এসব কর্মসূচি হয়েছে। খামারিদের দাবির মধ্যে ছিল ফিডের দাম কমানো, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর কমানো এবং ডিম ও মুরগির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) শাহজামান খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ফিডের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি খরচ বেড়ে গেলে দেশীয় শিল্প মালিকদের পক্ষে লোকসান দিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব নয়।

তবে মুরগির খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি হওয়ায় বিকল্প ফিড ব্যবহারের চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। মাঠপর্যায়ের খামারিদের ফিডের দামের বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরো বলেন, ফিডের মান ও পুষ্টি বজায় রেখে কীভাবে কম খরচে বিকল্প খাদ্য বা ফিড ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউট্রিশন (পুষ্টি) বিভাগ এবং অ্যানিমেল সায়েন্স বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে একটি সেমিনারের আয়োজন করে কৌশল নির্ধারণ করা হবে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিডের বাজারকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ভুট্টা, সয়াবিন মিল, রাইস ব্রান ও ডিওআরবির মতো কাঁচামালের উৎপাদন, আমদানি, মজুত ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে ফিডের দাম সরাসরি যুক্ত। ফলে কাঁচামালের বাজার স্থিতিশীল না হলে ফিডের দাম কমানো কঠিন হবে। আর ফিডের ব্যয় না কমলে পোলট্রি খামারিদের উৎপাদন ব্যয়ও কমবে না। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়বে ডিম-মুরগির উৎপাদন, সরবরাহ এবং ভোক্তাপর্যায়ের দামে।

এমই

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন