নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের অনেকগুলো সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) স্বাধীন সত্তা সংকুচিত হবে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ কারণে প্রায় দেড় ডজন সুপারিশের সঙ্গে একমত নয় কমিশন।
সরকার ও সংশ্লিষ্টদের অবহিত করতে বেশকিছু যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে একমত না হওয়া সুপারিশ পুনর্বিবেচনায় সরকারের পাঁচ বিভাগে ব্যাখ্যামূলক প্রস্তাবনা পাঠাতে যাচ্ছে ইসি।
ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, তারা নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের উল্লেখযোগ্য সুপারিশের মধ্যে নিম্নোক্ত সুপারিশগুলোর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছে। সেগুলো হলোÑ নির্বাচন কমিশন ও কমিশনারদের কার্যক্রম সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে জবাবদিহি করা, জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন চার মাসে করা, স্বাধীন কমিশনের অধীনে সংসদীয় আসনের সীমানা বিন্যাস সম্পন্ন করা, ভোট সুষ্ঠু হয়েছে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সার্টিফাই করে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো, নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক সম্ভাব্য প্রার্থীর সশরীরে উপস্থিত হয়ে মনোনয়নপত্র জমা প্রদান, পদ ক্রমানুসারে ইসির সিনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ করা।
ইসি যে বিভাগসমূহে প্রস্তাবনা পাঠাচ্ছে সেগুলো হলো- জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব, আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। চলতি সপ্তাহের যে কোনোদিন সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কার্যালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হবে।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ আমার দেশকে বলেন, কমিশনের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়- এমন কিছু বিষয় নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশে রয়েছে বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ চার নির্বাচন কমিশনার সেটি দেখছেন। খসড়া প্রস্তাবনা চূড়ান্ত হলে তা সরকারের কাছে পাঠানো হবে। সুপারিশে উল্লেখযোগ্য কী আছে, তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে কমিশন পর্যায় থেকে সচিবালয়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলাপে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন ও কমিশনারদের আর্থিক বিষয়সহ কিছু কার্যক্রম সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে জবাবদিহিতার বিষয় রয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এই সুপারিশ যৌক্তিক মনে করছে না কমিশন। তাদের যুক্তি, এ ধরনের সুপারিশ গৃহীত হলে কমিশনের বর্তমান যে স্বাধীনতা রয়েছে তা সংকুচিত হবে।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদসহ যে কোনো নির্বাচনের ভোটগ্রহণের পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইসিকে সার্টিফাই করতে হবে নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে– সুপারিশটি গ্রহণযোগ্য মনে করছে না কমিশন। সংস্থাটি বলছে, নির্বাচন স্বচ্ছ হয়েছে বলেই গেজেট জারি করা হয়। এরপর সার্টিফাই করার দরকার নেই। বিধানটিকে আমলে নেওয়া হলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংক্ষুব্ধ যে কেউ অভিযোগ করতে পারবে অমুক কমিশন ও সচিব শর্ত ভঙ্গ করেছে। এই অপরাধে ২০ বছরের কারাদণ্ড। এই মিথ্যা অপবাদ ও সাজার শাস্তি মাথায় নিয়ে কে কমিশনের দায়িত্বে আসবে। এ সুপারিশটি বাস্তবসম্মত নয় বলে বিধান পুনর্বিবেচনার জন্য ঐকমত্য সংস্কার কমিশনকে প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে।
এদিকে জাতীয় সংসদ এবং স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো চার মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে– নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এ সুপারিশকেও বাস্তবসম্মত মনে করে না ইসি। কমিশন মনে করছে, শুধু স্থানীয় সরকার স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করতেই সময় লাগে ন্যূনতম এক বছর। সেখানে কীভাবে সংসদ ও স্থানীয় নির্বাচন স্বল্প সময়ে করা সম্ভব।
অন্যদিকে সংসদীয় আসনের সীমানা বিন্যাসে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ‘স্বাধীন কমিশন’ গঠনের সুপারিশ করেছে। অথচ সাংবিধানিকভাবে এ কাজটি কমিশনকে আইন দিয়ে নিষ্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। ইসি মনে করছে, এ কাজটি কমিশনের পরিবর্তে অন্যকে দেওয়া হলে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন থাকার দরকার কী?
এছাড়া সংসদসহ যে কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীকে হোক, তিনি ফেরারি আসামি কিংবা কারান্তরীণ; সশরীরে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে মনোনয়ন দাখিলের সুপারিশ করেছে সংস্কার কমিশন। এটাকেও যুক্তিসংগত মনে করছে না নির্বাচন কমিশন। কারণ সবার প্রার্থী হওয়ার অধিকার রয়েছে বলে মনে করছে ইসি। তাই কমিশন সশরীরে মনোনয়নপত্র জমার পাশাপাশি অনলাইনের বিধানটি রাখার পক্ষে ইসি। কমিশনের ব্যাখ্যা, ডিজিটালাইজেশনের যুগে প্রযুক্তি থেকে পিছিয়ে থাকা যৌক্তিক হবে না।
সর্বশেষ নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন রিটার্নিং অফিসার করার ক্ষেত্রে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের সিনিয়র অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করার সুপারিশ করেছে। কিন্তু কমিশন তাদের ব্যাখ্যায় বলছে, শুধু অগ্রাধিকারভিত্তিতে নয়, জ্যেষ্ঠতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। একজন কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠ। কিন্তু তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তা হওয়ার যোগ্য না। তাকে আপনি কীভাবে দায়িত্ব দেবেন। তাই আমরা জ্যেষ্ঠতার পাশাপাশি চৌকস ও দক্ষ কর্মকর্তার প্রস্তাব করছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


