আজ শনিবার আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হবে। এ বছর নারী দিবসের স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘অধিকার,সমতা, ক্ষমতায়ন: নারী ও কন্যার উন্নয়ন’।
নারী দিবস উপলক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তিনি বলেন, নারীদের সম্ভাবনা ও কর্মদক্ষতাকে উৎপাদনমুখী কাজে সম্পৃক্ত করে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের নারীরা- এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের নারী সমাজের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
দিবসটি উপলক্ষ্যে বাণী দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এতে গত ১৫ বছরে হাজার হাজার পুরুষ, নারী গুম, খুন, অত্যাচারিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে অমানবিক সংগ্রাম করেছে ওই পরিবারগুলোর নারীরা। জুলাইতেও আন্দোলনের শুরু এই বাংলাদেশের নারীদের হাতেই। শহীদ হয়েছে আমাদের সন্তানরা, ছোট শিশু কন্যাও। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, সকলেই এই আন্দোলনের শরিক।
প্রতি বছর মার্চ মাসের ৮ তারিখে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিবসটি উদ্যাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরি বৈষম্য, কর্ম ঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধরা। বাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে চলে সরকার লেঠেল বাহিনীর দমন-পীড়ন। ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হলো। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ; জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয়, ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগল। বাংলাদেশেও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতার লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। অতঃপর ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি নারীর সম-অধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার অভীপ্সা নিয়ে। সারা বিশ্বের সকল দেশে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী মহিলা দল নয়াপল্টন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সকালে এক র্যালির আয়োজন করেছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের উদ্যোগে সকালে ক্লাব কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। সম্মিলিত নারীর প্রয়াসের উদ্যোগে ধানমন্ডি-২৭ এর ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে সকাল ১১টায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণে গুরুত্ব সংস্কার কমিশনের
রাষ্ট্র সমাজের প্রতিটি স্তরে নারী বৈষম্যের শিকার বলে মনে করে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন। এজন্য সংস্কার কমিশন তার সুপারিশে নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণের বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অংশ কমিশন সংবিধান ও আইনে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ করবে।
নারী বিষয়ক সংস্থার কমিশনের একাধিক সদস্যের সাথে আলাপ করে তথ্য পাওয়া গেছে। নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা ও মানবাধিকারকর্মী শিরীন পারভীন হকের নেতৃত্বাধীন নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশমালা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসছে। জানা গেছে, কমিশনের আজ নারী দিবসে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিছু কাজ অসম্পন্ন থাকায় তা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে। তবে কমিশন তার বেঁধে দেওয়ার সময় ৩১ মার্চের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানিয়েছে।
কমিশনের একাধিক সদস্যের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, দেশের সংবিধান ও আইনে নারীদের নানা সুরক্ষার বিধান থাকলেও তা যথেষ্ট নয়। এছাড়া সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আইনে যে সুরক্ষা দেয়া রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে তা থেকে বঞ্চিত হন এদেশের নারী সমাজ। উত্তরাধিকার, সন্তানের অভিভাবকত্ব, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীরা বৈষম্য শিকার বলে মনে করে কমিশন। কমিশনের সাথে সাক্ষাৎ করে নারীদের নিয়ে কাজ করে এমন একাধিক বেসরকারি সংস্থাও কমিশনের কাছে এমন বিষয়গুলো তুলে ধরেছে। তারা চায় আইনের মাধ্যমে সব ধর্মের নারীদের উত্তরাধিকার, সন্তানের অভিভাবকত্ব, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদে সমান অধিকার থাকবে। অতীতের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিলেও এসব বৈষম্য দূর করতে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে মনে করে তারা। এ কারণে সংবিধান ও আইনে এসব বৈষম্য দূর করতে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করবে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন।
জানা গেছে, সম্পত্তি, সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদে নারীকে সমান অধিকার দেওয়া, অপ্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছরের নিচে) মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার সুযোগ একেবারেই বন্ধ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানায় নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করার সুপারিশ করবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংবিধান সংস্কার এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ১০০ টি করা এবং সরাসরি ভোটের যে সুপারিশ করেছে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনেও একই আদলে সুপারিশ থাকবে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রতিটি স্তরে ৩০ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার কথা ছিল। তবে কোনো দলই সেই সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করেনি। পরে কমিশন তা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত করেছে। নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশে নারী প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং নারী নেতৃত্বের হার আরো বাড়ানোর সুপারিশ আসবে।
নারী সংস্কার কমিশনে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে আন্দোলনও করেছেন। তাঁরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেন কিছু হলেও পরিবর্তন করে যায়, সে চেষ্টা তাঁদের থাকবে।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক আমার দেশকে বলেন বলেন, আমরা নারীর রাষ্ট্র সমাজে যে অনেক বৈষম্য রয়েছে। আমাদের প্রতিবেদনে এই বৈষম্য দূরীকরণের উপর জোর দিয়েছি। সংবিধান, আইন ও সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নারীর প্রতি যত ধরনের বৈষম্য রয়েছে, আমাদের সুপারিশে তা নিরসনের কথা বলা হবে। এক্ষেত্রে আমরা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেবো।
গত বছরের ১৮ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার নারী বিষয়ক গঠন করে। শিরীন পারভীন হককে প্রধান করে গঠিত কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাহীন সুলতান, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ফৌজিয়া করিম ফিরোজ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি কল্পনা আক্তার, নারীর স্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞ হালিদা হানুম আখতার, বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরুপা দেওয়ান, নারীপক্ষের পরিচালক কামরুন নাহার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ সামাজিক উন্নয়ন উপদেষ্টা ফেরদৌসী সুলতানা ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নিশিতা জামান নিহা।
গঠনের সময় কমিশনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯০ দিন। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট তৈরি না হওয়ায় সময় বাড়িয়ে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত পুনঃ নির্ধারণ করা হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

