তাহসিফের মৃত্যু

দীপকে সন্দেহ, সঙ্গের তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ

দীপকে সন্দেহ, সঙ্গের তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ
তাহসিফ সাউরি ও শাহরিয়ার দীপ। ছবি: সংগৃহীত

বিমান বাহিনীর বরখাস্ত হওয়া ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলার তদন্তে নেমে নানামুখী তথ্য পাচ্ছে পুলিশ। বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর একের পর এক নতুন তথ্য। তাহসিফের উত্তরার বাসা থেকে বের হয়ে যেসব স্থানে গিয়েছেন, সেগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। কথা বলেছেন কথিত ‘ধাওয়া দেওয়া’ সেই টহল পুলিশের দলের সঙ্গে।

তদন্তে দেখা যায়, টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তিতে যাওয়ার আগে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ রোডের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় অবস্থান করেন তাহসিফ ও তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার জামান দীপ। ওই সময় তাদের সঙ্গে ২৪-২৫ বছর বয়সি এক তরুণীও ছিল। তার নাম-পরিচয় শনাক্ত করা গেলেও পুলিশ তদন্তের স্বার্থে পরিচয় প্রকাশ করেনি। গত শুক্রবার রাতে গ্রেপ্তার দেখানো দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিমের করা মামলায় চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ছায়া তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, গত সোমবার রাতে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায় টহল পুলিশের একটি দলের সঙ্গে দীপের দেখা হয়। তার গায়ে নোংরা আবর্জনা লেগেছিল। টহল পুলিশের একজন সদস্য জানিয়েছে, দীপের গায়ে আবর্জনা লেগে থাকার বিষয়ে জানতে চায়। ওই সময় সে নিজেকে সেনাবাহিনীর ‘ক্যাপ্টেন’ পরিচয় দিয়েছিল। এরপর পুলিশ তাকে জেরা না করে সেই এলাকা থেকে চলে যেতে বলে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, তারা কয়েকটি স্থানের অনেক সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। তাহসিফ ও দীপের কললিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন অ্যাপে কার কার সঙ্গে যোগাযোগ হতো সেসব তথ্য নেওয়া হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এসব থেকে তারা মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগ পর্যন্ত তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব হবে না।

নেস্ট বারে একঘণ্টা

ঘটনার দিন নেস্ট বারে প্রায় একঘণ্টা অবস্থান করেন তাহসিফ। তার সঙ্গে থাকা তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার আগে বারে তাহসিফকে ওই নারীর সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। তারা সেখানে তিন বোতল মদ কিনেন ও পান করেন।

পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঘটনার রাতে মোটরসাইকেলে চড়ে নেস্ট বারে আসেন তাহসিফ। চলেও যান মোটর সাইকেলে চড়ে। এ সময় তার সঙ্গে এক তরুণী ছিলেন। তারা ওই বার থেকে তিন বোতল মদ কিনে পান করেন। পরে সেখান থেকে বেরিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তির দিকে যান।

দীপ জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেন, সেখানে টহল পুলিশের একটি দল মাদক সেবনের অভিযোগে তাদের ধাওয়া করেছিল। ওই সময় দীপ একদিকে ও তাহসিফ অন্যদিকে দৌড় দেন।

পুলিশের সংগ্রহ করা বারের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওই তরুণী গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস পরিহিত ছিলেন। বারে প্রবেশের সময় তার হাতে একটি সাদা রঙের পলিথিন ছিল। এ সময় হেলমেট পরিহিত তাহসিফের বন্ধু দীপও তার সঙ্গে ছিলেন।

পুলিশের ভাষ্য, ওই নারীকে আটক করা গেলে এ ঘটনার আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পাওয়া যাবে।

তদন্ত সংস্থা নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মাসুমা আক্তার আমার দেশকে বলেন, মামলার তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়েই তদন্ত চালানো হচ্ছে। গ্রেপ্তার দীপকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো মিলিয়ে দেখা হবে।

টহল দলকে জিজ্ঞাসাবাদ

তদন্ত সংস্থা তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ওই রাতে টহলে থাকা টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশের দলটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। টহল দলের সদস্যরা জানান, দীপের শরীরে নোংরা-আবর্জনা লাগা ছিল। তাকে দেখে সন্দেহ হলে টহল পুলিশের এক সদস্য দীপকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় সে নিজেকে সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পরিচয় দেন।

টহল দলের ওই সদস্য জিজ্ঞাসাবাদে জানান, দীপের প্যান্টের নিচের অংশ ও জুতায় কাদা, ময়লা পানি, এমনকি মলমূত্রও লেগে ছিল। কিন্তু দীপ নিজেকে সেনা বাহিনীর ক্যাপ্টেন পরিচয় দেওয়ায় টহল দলের সদস্যরা কথা না বাড়িয়ে তাকে ওই এলাকা থেকে চলে যেতে বলে।

পিবিআইয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার রাতের ঘটনা নিয়ে দীপ যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ, টহল পুলিশের সদস্যদের সাক্ষ্য এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে গরমিল দেখা যাচ্ছে। ঘটনার রাতে দীপ ও তাহসিফ দুজন টঙ্গীর হাজি মাজার বস্তির গেট এলাকায় প্রবেশ করেন এবং একাধিকবার ওই এলাকায় যাওয়া-আসা করেন।

প্রাথমিক তদন্তে সেখানে তাদের ইয়াবা অথবা হেরোইন সেবনের তথ্যও পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তারা জানান, টঙ্গীর ইজতেমা মাঠের বিদেশি মেহমানখানার পাশের ওই এলাকায় ভাসমান মাদক বিক্রেতারা মাদকদ্রব্য বিক্রি করে থাকে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা তাহসিফ ও দীপ সেখানে বসে মাদক সেবন করেন।

দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ তাদের মাদকসেবী ভেবে ধাওয়া করলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং দীপ ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পাশে লুকিয়ে থেকে পরে সেখান থেকে পালিয়ে যান।

পিবিআই সূত্রের দাবি, দীপের দেওয়া এমন বক্তব্যের সঙ্গেও বাস্তব ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন না। দীপকে যখন টহল পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে এ সময়ের আগের সময়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। ওই কাছাকাছি সময়ে তাহসিফের ফোন থেকে তার মাকে ভয়েস মেসেজ দিয়ে বলা হয় বাসায় আসছি। আবার দীপও তার মোহাম্মদপুরের বাসার দারোয়ানকে ফোন করে বলে, বাসায় ফিরতে একটু দেরি হবে। তাই গেট খোলা রাখার অনুরোধ করে সে।

ওই সময়গুলোর সমন্বয় ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের তথ্য পেতে দুজনেরই মোবাইল ফোনের ফরেনসিকে পাঠিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তাদের সন্দেহ দীপ একা কিংবা অন্য কারো সহযোগিতায় তাহসিফকে হত্যা করে থাকতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ধস্তাধস্তির সময় তার পোশাকে কাদা ও ময়লা পানি লাগতে পারে। অথবা অন্য কোনোভাবে তার শরীরে এসব ময়লা লেগেছে।

তবে এর প্রকৃত কারণ জানতে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। সব মিলিয়ে দীপের দেওয়া বক্তব্যকে এখনই বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন না তারা।

দীপ চার দিনের রিমান্ডে

তাহসিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করে হাজতখানায় রাখা হয়।

সংস্থাটির ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান জানান, তাহসিফের বাবা হত্যা মামলা করার পর দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

তাহসিফ সাউরি মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর উত্তরখান থানায় করা হত্যা মামলায় দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতে এ আদেশ দেন।

আদালত থেকে বেরিয়ে আইনজীবী আজিজুল হক দিদার সাংবাদিকদের জানান, ভিকটিম (তাহসিফ) যে হত্যা হয়েছে, তিনিই শেখ হাসিনা পালানোর ছবিটা তুলেছিলন, সেই ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। এসব কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে কি না, এর সঙ্গে কেউ সম্পৃক্ত আছে কি না এবং কারা কারা তাকে হত্যা করেছে, কি পরিকল্পনায় হত্যা হয়েছে, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য আসামির সাত দিনের রিমান্ড প্রয়োজন হয়।

তাহসিফের লাইফস্টাইল

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাহসিফের লাইফস্টাইল তারা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। প্রাথমিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে, তাহসিফ একেবারেই অনিয়ন্ত্রিত ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করতেন। মদপান, একাধিক তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক ও সমকামী তরুণদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্তে প্রাধান্য পাচ্ছে। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য মিলিয়ে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। নৌপুলিশকে সহযোগিতা করছে পিবিআই।

তাহসিফের বাসায় রাওয়া নেতারা

এদিকে শনিবার রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (রাওয়া) একটি প্রতিনিধিদল তাহসিফ সাউরির বাসায় যান। দলের নেতৃত্বে ছিলেন রাওয়ার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) আবু নাওয়াজ খুরশিদ আলম। আরো ছিলেন-রাওয়া সদস্য মেজর (অব.) আল-আমিনসহ কয়েকজন। রাওয়া নেতারা তাহসিফ সাউরির বাসার সঙ্গে কথা বলে তাকে সান্ত্বনা দেন। এছাড়াও ঘটনার সঠিক তদন্ত ও রহস্য উদঘাটনে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

গত মঙ্গলবার উত্তরার রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের বাসা থেকে বের হন বিমান বাহিনীর বরখাস্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ। পরদিন বিকালে টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে তার ভাসমান লাশ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। এ সময় তার পকেটে থাকা আই ফোনের সূত্র ধরে তাহসিফের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

গত শুক্রবার রাতে তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে উত্তরখান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে থাকা দীপকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে নৌপুলিশ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন