ইউনিসেফ-ডব্লিউএইচওর যৌথ বিবৃতি

মাতৃদুগ্ধ পানে পিছিয়েছে বাংলাদেশ, দ্রুত পদক্ষেপের তাগিদ

মাতৃদুগ্ধ পানে পিছিয়েছে বাংলাদেশ, দ্রুত পদক্ষেপের তাগিদ

বাংলাদেশে মাতৃদুগ্ধ পান সুরক্ষা, উৎসাহিত ও সহায়তা দিতে কার্যকর পদক্ষেপ আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

সংস্থা দুটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মায়ের দুধ পান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অগ্রগতির গতি কমে গেছে। ২০১৯ সালে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে শুধু মায়ের দুধ পান করার হার ছিল ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো শুরুর হার ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপ এবং বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. জামশেদ মোহাম্মদের যৌথ বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

এতে বলা হয়, মায়ের দুধ পান প্রতিটি শিশুর জীবনের সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ শুরু নিশ্চিত করে। জন্মের পর প্রথম ছয় মাসে শিশুর প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি মায়ের দুধ থেকেই পাওয়া যায়। এটি শিশুকে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করে। একই সঙ্গে মায়েদের স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসার এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা রাখে।

ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচও বলছে, শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এটি সব সময় সহজ নয়। অনেক মা গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের সময় এবং সন্তান জন্মের পর প্রয়োজনীয় পরামর্শ, উৎসাহ ও সহায়তা পান না। অনেক মাকে পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন সুবিধা কিংবা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর উপযোগী কর্মপরিবেশ ছাড়াই কাজে ফিরতে হয়। পাশাপাশি, পরিবারগুলোর সামনে মায়ের দুধের বিকল্প শিশুখাদ্যের প্রচার-প্রচারণাও চলছে। জরুরি ও মানবিক সংকটের পরিস্থিতিতে এসব বাধা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

বিবৃতিতে বলা হয়, এ বছরের বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ‘জীবনের সূচনায় মাতৃদুগ্ধ পান: টেকসই উদ্যোগ করি বেগবান’ বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে সময়োপযোগী। মাতৃদুগ্ধ পানের হার বাড়াতে শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, কার্যকর পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তা, শিশু-বান্ধব হাসপাতাল কর্মসূচি, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, স্তন্যদানের উপযোগী কর্মপরিবেশ এবং মাতৃদুগ্ধের বিকল্প ও শিশুখাদ্য বিপণন নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইন পুরোপুরি বাস্তবায়ন কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

সংস্থা দুটি জানায়, মায়ের দুধ পান সহায়ক কার্যক্রমে প্রতি এক মার্কিন ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় ৫৯ মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় কমা, শিশুদের মেধার বিকাশ, শিক্ষায় ভালো ফল এবং ভবিষ্যতে বেশি আয় করার সক্ষমতা তৈরির মধ্য দিয়ে এ সুফল আসে।

এ অবস্থায় নতুন সমাধান খোঁজার পরিবর্তে ইতোমধ্যে কার্যকর উদ্যোগগুলো আরও বিস্তৃত ও টেকসইভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচও, যাতে প্রতিটি মা প্রয়োজনীয় সহায়তা পান এবং প্রতিটি শিশু মায়ের দুধ পানের পূর্ণ উপকার পেতে পারে।

বিবৃতিতে সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সব অংশীজনের প্রতি কার্যকর উদ্যোগগুলো আরও জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, প্রত্যেক স্বাস্থ্যকর্মীর মাতৃদুগ্ধ পান সুরক্ষা, উৎসাহিত করা এবং এ বিষয়ে সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা উচিত। সরকারি ও বেসরকারি সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে শিশু-বান্ধব হাসপাতাল কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি, এর কার্যকর বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

কর্মজীবী মায়েদের জন্য বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি, মায়ের দুধ খাওয়ানোর জন্য বিরতি এবং উপযোগী কর্মপরিবেশসহ মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থা দুটি।

একই সঙ্গে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প ও শিশুখাদ্য বিপণন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৩ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পণ্যের অনুপযুক্ত প্রচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে মায়ের দুধ পান সংক্রান্ত সহায়তা যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে, যাতে বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মায়েরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পান। পাশাপাশি অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য শক্তিশালী উপাত্ত, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচওর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, শিশুদের জন্য বাংলাদেশ যে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর বিনিয়োগগুলো করতে পারে—মাতৃদুগ্ধ পান সুরক্ষা ও উৎসাহিত করা এবং মায়েদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা তার অন্যতম। এটি শিশুর জীবন রক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নতি, শেখার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জীবনের শুরুটা সবচেয়ে ভালো হওয়ার অধিকার প্রতিটি শিশুর রয়েছে। একইভাবে, প্রতিটি মা সফলভাবে সন্তানকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার অধিকার রাখেন।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচও। স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, পরিবারগুলোকে সক্ষম করে তোলা এবং এমন সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে কাজ করার কথা জানিয়েছে সংস্থা দুটি, যেখানে প্রত্যেক মা সফলভাবে সন্তানকে মায়ের দুধ খাওয়াতে পারবেন এবং প্রতিটি শিশু বেঁচে থাকা, সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা ও পূর্ণ বিকাশের সুযোগ পাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন