ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যগামী আটকে পড়া যাত্রীরা এখন অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেক যাত্রীর ভিসার মেয়াদ এবং সংযোগ ফ্লাইটের সময়সীমা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে যারা কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইতালিগামী ট্রানজিট যাত্রী তাদের মধ্যে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। গত তিনদিনে ইতোমধ্যে ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ৫৪টি ফ্লাইট গত শনিবার থেকে গতকাল রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধসহ নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে এসব ফ্লাইট বাতিল করা হয়। এ কারণে ভোগান্তির পাশাপাশি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন যাত্রীরা।
রেজাউল রহমান নামে সৌদি আরবগামী এক প্রবাসী বলেন, আমার ভিসার মাত্র তিনদিন বাকি। আজকের মধ্যে না গেলে হয়তো পুরো প্রসেসটাই নতুন করে করতে হবে। এতে লাখ লাখ টাকা ক্ষতি। আল্লাহই জানেন ভাগ্যে কী আছে।
বাংলাদেশ বিমানের যাত্রী হয়ে গতকাল রোববার বিকাল ৫টায় কাতারের উদ্দেশে যাওয়ার কথা ছিল নোয়াখালীর সেনবাগের জুয়েল মিয়ার। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় ফ্লাইট স্থগিত হওয়ার খবর শুনেও সকালেই আসেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা অনেক ভোগান্তির মধ্যে রয়েছি। ফ্লাইট স্থগিত হওয়ার কথা শুনে এজেন্সিতে যোগাযোগ করলে তারা জানিয়ে দিয়েছে সকাল থেকেই বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকার জন্য। এই কারণে আমি এখন এখানে এসেছি।
আমি হটলাইনে ফোন দিচ্ছি প্রায় এক ঘণ্টার ধরে কিন্তু যোগাযোগ করতে পারছি না। এজেন্সির সঙ্গে কথা বলছি, তারা একই কথা বলছেন যে, আপনি ওখানে উপস্থিত থাকুন। তারা যে ডিসিশন দেয় এয়ারপোর্টের থেকেই জানতে পারবেন। এখন কী আর করা, অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।
নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুর জেলার জুবায়ের নামের আরেক যাত্রী জানান, গতকাল রাতে বাংলাদেশ বিমানে কাতার যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় রাতে বিমান কর্তৃপক্ষ তাদের ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। এজন্য তিনি রাজধানীর উত্তরাতে একটি বেসরকারি হোটেলে রাতযাপন করেছিলেন। এখন পুনরায় খোঁজ নিতে বিমানবন্দরে এসেছেন। কিন্তু এখনো তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো তথ্য জানতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।
এই কারণে বিমানবন্দরে হাজার হাজার প্রবাসী দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকছেন। সঙ্গে আছেন তাদের পৌঁছে দিতে আসা স্বজনরাও। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত যাত্রীরা ঢাকায় থাকবেন নাকি ফিরে যাবেন সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী ৫৪টি ফ্লাইট গত শনিবার থেকে গতকাল রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ গতকাল রোববার দুপুরে আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, আকাশপথ নিরাপদ হলেই ধাপে ধাপে ফ্লাইট পরিচালনা পুনরায় শুরু করা হবে।
স্থগিত ফ্লাইটগুলো রিশিডিউল করা হবে : বিমান প্রতিমন্ত্রী
এদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, ইরান-ইসরাইল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে স্থগিত হওয়া ফ্লাইটগুলো রিশিডিউল করে যাত্রীদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হবে। একই সঙ্গে পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। গতকাল শাহজালাল বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ইরানের উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক রুটের প্রায় ৫৪টি ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছিল। এ কারণে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসেরও কিছু রুটের পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় রোবাবার থেকে পুনরায় ফ্লাইট কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, গতকাল স্থগিত ফ্লাইটগুলো রিসিডিউল করা হয়েছে। সিভিল অ্যাভিয়েশন চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, আজ সোমবারের মধ্যে স্থগিত ফ্লাইটের যাত্রীদের গন্তব্যে পাঠানোর ব্যবস্থা সম্পন্ন হবে।
রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, দেশের বাইরে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারা যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই সার্বক্ষণিক খোঁজ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি সরাসরি মনিটর করছেন। যাত্রীদের ইফতারসহ যাবতীয় দেখভালের বিষয়ে তিনি আমাদের নিয়মিত নির্দেশনা দিচ্ছেন। আমরা অত্যন্ত সফলভাবে যাত্রীদের সব সুবিধা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছি।
দোহা, দুবাই ও আবুধাবি ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশে বিমানের ফ্লাইট চালু
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস রোববার ঘোষণা দিয়েছে, দোহা, দুবাই ও আবুধাবি বাদে মধ্যপ্রাচ্যের সব গন্তব্যে বিমানের ফ্লাইট নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চলবে। নির্ধারিত সময়ের চার ঘণ্টা আগে যাত্রীদের বিমানবন্দরে উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
বিমানের জনসংযোগ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রোববার মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য গন্তব্যে ফ্লাইটগুলো সময়মতো ছেড়ে যাবে। তবে দোহা, দুবাই ও আবুধাবি গন্তব্যের সেবা নির্ধারিত সময়সূচির বাইরে রয়েছে।
এদিকে গতকাল রোববার থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দা এবং ওমানের মাস্কাটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ফ্লাইট পরিচালিত হবে। যাত্রীদের নির্ধারিত ফ্লাইট সূচির চার ঘণ্টা আগে বিমানবন্দরে উপস্থিত হওয়ার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসে চেক-ইন কাউন্টার থেকে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ ও কাতারের রাজধানী দোহায় ফ্লাইট চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। আরব আমিরাত ও কাতারে ফ্লাইট চলাচল উপযোগী হওয়া মাত্রই যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

