ঠুনকো অজুহাতে আইন হাতে তুলে নিচ্ছে আমজনতা বা মব। কেউ ক্ষুব্ধ হয়ে আবার কেউ দেশের পরিবেশকে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল করার জন্য মব সৃষ্টি করছে।
নিজে হাতে আইন তুলে নিয়ে বিচারবহির্ভূত কমর্কাণ্ড করছে। মবের নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিপক্ষকে হত্যা, ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন, বিভিন্ন অভিযোগে মারধর, ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় ও অপদস্ত করছে।
শুধু গণপিটুনি দিয়ে হত্যা নয়, হত্যার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাছে বা ওভার ব্রিজের ওপর লাশ ঝুলিয়ে রাখছে বিক্ষুব্ধ জনতা। সাধারণ মানুষ বাদেও পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনীর ওপরও চলছে এ ধরনের হামলা। এতে সমাজে এক প্রকার ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে।
মবের ভয়ে অনেকেই মুখ খুলে কেউ কথা বলতে পারছে না। দুর্বৃত্তরা মব সৃষ্টি করে বিরোধীপক্ষ বলে বাড়িতে হামলা ও জমিদখলের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি যাতে ভিকটিম কাউকে কিছু না বলে এজন্য পিটিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, মব সৃষ্টি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পদত্যাগে বাধ্যকরণ, জোর করে পদোন্নতি আদায়, অফিসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা ও প্রকাশে জুতা পরিয়ে সড়কে ঘোরানোর ঘটনা ঘটেছে। এমন সব কর্মকাণ্ডে ৫ আগস্টের পর বেশি ঘটেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে কম ঘটলেও সেটি আবার শুরু হয়েছে। সরকার এর লাগাম টানতে পারছে না। মবের কারণে আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কমে যাচ্ছে।
এর নেপথ্যে কারা রয়েছে এর জন্য মাঠ পর্যায়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। পুলিশ সদর দপ্তরের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, যারা মব তৈরি করছে, তারা অতিউৎসাহী হয়ে করছে। কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তারা পুলিশকে জানিয়েছে, পেছন থেকে তাদের উসকানি দেওয়া হয়েছে।
এসব কুচক্রীকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, গাজীপুর সিটির সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরের হুমকি তদন্ত করছে পুলিশ। তার একটি অডিও ভাইরাল হয়েছে। সেই অডিও তদন্ত করছে পুলিশ। অডিওতে তিনি বলছেন, যে শহরে আমাদের ঘুমাতে দেওয়া হবে না, সেই শহরে কাউকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না।
ওই অডিও পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে মব তৈরির উসকানি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও মঙ্গলবার রাতে ঢাকার গুলশানে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি তানভীরের বাসায় মবের ঘটনায় তার কেয়ারটেকার জড়িত বলে জানা গেছে। এসব ঘটনা পরিকল্পিত করে রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্টে সরকার পতনের পর মব সৃষ্টি করে অন্তত ৪০ জন গণপিটুনিতে মারা গেছে।
আর আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসাব অনুযায়ী, শুধু গত জানুয়ারি মাসে সারাদেশে গণপিটুনিতে ১৬ জন নিহত হয়েছে। পুলিশ বলছে, দেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর মবের ঘটনা ঘটছে। আগেও দেশে আইন হাতে তুলে জনতা গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি বেড়ে গেছে। পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে। আর গত মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, কোথাও কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে যেন সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী থানাকে জানানো হয়। সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সচেষ্ট রয়েছে এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে বদ্ধপরিকর।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘মব সৃষ্টিকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিপূর্ণ সক্রিয়তার অভাব, আইনের প্রতি অনস্থা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ব্যক্তির ওপর সৃষ্ট অপরাধের প্রতিশোধ নিজে নেওয়াসহ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মব সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, বিষয়টির গভীর বিশ্লেষণে লক্ষ করা যায়, সমাজের মধ্যে সর্বক্ষেত্রে আইন মানার সংস্কৃতি না থাকা, পরস্পর সহনশীল ও সম্মানজনক অবস্থানের ঘাটতি, মানুষের সঙ্গে মানুষের সৃষ্ট বিভেদের যৌক্তিক সমাধান যে সমাজে অপেক্ষাকৃত কম সেই সমাজে আইনবহির্ভূত উপায়, তথা মব সৃষ্টি করে উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিদের সহিংসতা ও প্রতিশোধ স্পৃহা বেড়ে যায়।
জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের আস্থার প্রতীক হিসাবে তৈরি করতে হবে। নইলে মব থামবে না।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশে আশঙ্কাজনকহারে মব সৃষ্টি হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করার কারণে সমালোচিত হয়েছে। ৫ থেকে ১২ আগস্ট কার্যত থানায় ছেড়ে পুলিশ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। তখন থেকে মব সৃষ্টি হয়। কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষ মব তৈরি করছে।
গত ২ মার্চ শরীয়তপুরে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনায় পাঁচজন নিহত হন। ডাকাতরা শরীয়তপুরের তেঁতুলিয়া এলাকায় গেলে স্থানীয়রা নদীতে বাল্কহেড দিয়ে তাদের গতিপথ রোধ করে।
গত ২ মার্চ রাজধানীর মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় সিগারেট সেবন করার কারণে দুই নারীকে হেনস্তা করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে।
গত ৩০ জানুয়ারি ফেসবুক লাইভে এসে চট্টগ্রাম বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আরিফ হোসেনকে পেটানোর হুমকি দিয়েছেন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। পুলিশ সাজ্জাদকে খুঁজছে।
গত ৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এক ওসিকে তার শিশুসন্তানের সামনে ব্যাপক মারধর ও লাঞ্ছিত করেছেন বিক্ষুদ্ধ জনতা। প্রকাশ্যে ফেসবুক লাইভে গিয়ে তাকে মারধর করার এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
সূত্র জানায়, মবের ঘটনা ঘটনায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মামলা হয়েছে। এই সব মামলার তদন্তে ধীরগতি লক্ষ করা গেছে। আসামিরাও তেমন গ্রেপ্তার হচ্ছে না। গত ৩০ জানুয়ারি ফেসবুক লাইভে এসে চট্টগ্রাম বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আরিফ হোসেনকে পেটানোর হুমকি দিয়েছেন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেনকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


