হংকং, লাইব্রেরিয়া এবং পানামার একাধিক জাহাজকে অতিরিক্ত ড্রাফট সুবিধা দেওয়া এবং অবৈধভাবে অর্থ আয়ের প্রমাণ পাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের "সহকারী হারবার মাস্টার" ক্যাপ্টেন মো. ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বর্তমানে মো.ফরিদুল আলম চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (উপ-সংরক্ষক) পদে দায়িত্বে আছেন।
সম্প্রতি দুদক প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। দুদকের ওই তদন্ত প্রতিবেদনে সই করেছেন উপসহকারী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান।
আমার দেশকে তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আমি কিছুদিন তদন্ত করে ফাইল প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি।
এই বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উপ সংরক্ষক মো. ফরিদুল আলম আমার দেশকে বলেন, আমি কোন দুর্নীতি বা কোন অপরাধ করিনি। আমি সততার সাথে কাজ করছি।
এদিকে গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মো. ফরিদুল আলম হারবার মাস্টার অত্যন্ত একরোখা স্বভাবের। তার মতাদর্শী লোক ছাড়া তার সহকর্মী বা জুনিয়রদের কথা তিনি তোয়াক্কা করেন না। এ কারণেই বন্দর চেয়ারম্যান মেম্বার হারবার এন্ড মেরিন এবং ডিসি এর অনুপস্থিতিতে তার (ফরিদুল আলম) ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে অন্য কর্মকর্তারা কেউ এ বিষয়ে বাঁধা দেয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে এম ভি গ্লাডিন জাহাজের উন্ডিং এর ঘটনার সাথে জড়িত দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে বন্দর চ্যানেলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ভবিষ্যতেও হতে পারে; যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বন্দরের সুনাম ব্যাহত করবে।
তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়- তদন্ত পর্ষদ গঠনপূর্বক ঘটনা সংক্রান্ত সঠিক উদঘাটন এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
এ ছাড়া হারবার মাস্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট যিনি বন্দরে সকল প্রকার জাহাজ চলাচলে নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পনা করে থাকেন। এ ধরনের একটি দায়িত্বপূর্ণ পদে একজন দুর্নীতিবাজ এবং খামখেয়ালীপূর্ণ কর্মকর্তাকে রাখা সমীচীন হবে না। এমতাবস্থায় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলমকে উক্ত পদ থেকে দ্রুত অপসারণ করা যেতে পারে।
অন্য দিকে, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে সই এক চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক লিখেছেন, ক্যাপ্টেন মো. ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে চট্টগ্রাম বন্দরের শত শত কোটি টাকার বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তিনি (চবক)-এ কর্মকালীন সময়ে তার বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলা ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করেন, সম্প্রতি পাইলট পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের আবেদন যাচাই বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে আবেদনকারীর আবেদন করার যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও আবেদন যাচাই বাছাই না করে প্রতিবেদন দাখিল করে। এই কারণে মো. ফরিদুল আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়।
সচিব চিঠিতে আরো উল্লেখ করেন, ফরিদুল আলম নানা রকম অনৈতিক কাজ এবং অবৈধ সুবিধার জন্য বাইরের লোকজনদের দিয়ে কর্তৃপক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে সদস্য (অর্থ) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য নানা মহল দ্বারা কর্তৃপক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি ইতোপূর্বে সদস্য (হারবার ও মেরিন) পদে পদোন্নতির জন্য নানা মহল থেকে চাপ সৃষ্টি করছে। তার এ রকম কর্মকাণ্ডের জন্য সংস্থাটিতে সাধারণ কার্যক্রমে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি (ফরিদুল আলম) চবক নিয়োজিত একজন কর্মকর্তা এবং পেশাদার নাবিক। তিনি বিধিবিধান এবং সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী তার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। সংস্থাটির আইন-২০২২ এর ৭(২) অনুযায়ী "চেয়ারম্যান কর্তৃপক্ষেরও চেয়ারম্যান এবং সদস্যরা কর্তৃপক্ষেরও সদস্য হবে নির্ধারিত মেয়াদে ও শর্তাধীনে কর্তৃপক্ষের সার্বক্ষণিক কর্মকর্তা হিসাবে নিযুক্ত হবে উল্লেখ রয়েছে। এই পদটি চবক এর কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে পদোন্নতি যোগ্য না।
তা ছাড়া তিনি সরকারের সিলেকশন বোর্ডের মাধ্যমে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তা না। চবক আইন-২০২২ এর ৪৯(২) ধারার বিধান অনুযায়ী "কর্তৃপক্ষের কর্মচারীদের নিয়োগ পদ্ধতি ও চাকরির শর্তাবলী বিধি দ্বারা নির্ধারিত হইবে" উল্লেখ আছে।
তাছাড়া সংস্থাটির আইনের ৫০ ধারা অনুযায়ী সরকার, জনস্বার্থে, কর্তৃপক্ষের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ যে কোন সংস্থায় কর্মকর্তাকে কর্তৃপক্ষের যে কোন উপযুক্ত পদে প্রেষণে নিয়োগ করতে পারে।
এ জন্য সংস্থাটির কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে চবক আইন ধারা অনুযায়ী ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলমকে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ যে কোন দপ্তর/সংস্থায় যেকোনো উপযুক্ত পদে প্রেষণে নিয়োগ/বদলির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল।
সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক আমার দেশকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন এই বিষয়ে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

