স্বাধীনতার পর থেকে ইন্দো-সেন্টিক পররাষ্ট্র নীতিতে গুরুত্ব দেওয়ায় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার কোন সংস্কার কমিশন গঠন না করলেও এ ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে এক ধরনের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে, যা পতিত শেখ হাসিনার সময় ছিল ভারত নির্ভর। এটা ভালোভাবে দেখছে না দিল্লি। দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সাথে মিয়ানমারের সাথেও মানবিক করিডর নিয়ে আলোচনা করা দরকার। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে, এটি উপেক্ষা করে নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না।
শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির (সিপিএএ) ‘বাংলাদেশ ২.০ রিইমেজিং পার্টনারশিপ সাউথ অ্যান্ড সাউথিস্ট এশিয়া’ শীর্ষক এক গোলটেবিল সংলাপে এসব কথা বলেন বিশিষ্টজনরা।
সিপিএএ’র প্রেসিডেন্ট এবং সাবেক সচিব ড. মো. শরীফুল আলমের সভাপতিত্বে সংলাপে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর এম শাহীদুজ্জামান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক প্রফেসর দিলারা চৌধুরী, পটুয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর আব্দুল লতিফ মাসুম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (সার্ক ও বিমসটেক) রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোতালেব সরকার, নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের প্রেসিডেন্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) মোহাম্মাদ হাসান নাসির, নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইন্সটিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গর্ভান্যান্সের (এসআইপিজি) পরিচালক প্রফেসর তৌফিক এম হক, দৈনিক প্রথম আলোর যুগ্মসম্পাদক সোহরাব হাসান, দৈনিক নয়াদিগন্ত’র নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, বিশিষ্ট ক্লাইমেট-চেঞ্জ বিশেষজ্ঞ ড. ফজলে রাব্বি সাদেক আহমদ, সাওয়াব ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এস এম রাশেদুজ্জামান, তরুণ সমাজ চিন্তক আলী আহসান জুনায়েদ এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি।
দিলারা চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে ইন্দো-সেন্টিক পররাষ্ট্রনীতির উপর গুরুত্বারোপ করে বাংলাদেশ। এর ফলে আমরা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছি। তাই এ প্যারাডাইম থেকে বের হয়ে আমাদের নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের একটা বৃহৎ অংশ সবসময় আমাদের একটা বিশেষ সম্পর্কে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছি তারা বিভিন্নভাবে হেনস্তা হয়েছি। আমাদের অ্যাকাডেমিক কমিউনিটি ও সিভিল সোসাইটি নতজানু নীতির প্রতি আমাদের প্রভাবিত করেছে।
তিনি বলেন, অন্য দেশকে দোষ দেয়ার সাথে সাথে দেশের ডিপ স্টেট নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। গত তিনটা নির্বাচন ডিপ স্টেট, আমলাতন্ত্র এবং রাজনীতিবিদরা নষ্ট করেছে। অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমি মনে করি লুক ইস্ট পলিসি নতুন করে ভাবতে হবে। বিগত সময়ে আমরা এ বিষয়ে অতীতে মনোযোগ দেইনি।
দিলারা চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে এটা গুরুত্বপূর্ণ। এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে আমাদের নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজতে হবে। আসিয়ান দেশসমূহ এ ক্ষেত্রে বড় সুযোগ হবে। বৈশ্বিক পর্যায়ে একটা বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নিরাপত্তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সম্পর্ককে বিস্তৃত করতে হবে।
এম শাহীদুজ্জামান বলেন, দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সাথে সাথে আমাদের মিয়ানমারের সাথে মানবিক করিডর নিয়ে আলোচনা করতে হবে। মানবিক করিডর নিয়ে সিভিল সোসাইটিতে বেশ বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্মা অ্যাক্ট বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন সম্মিলিতভাবে ১৯৯০ এর শেষ দিকে বার্মা অ্যাক্ট নতুন করে প্রণয়ন করেছে। মার্কিন প্রশাসন বার্মা অ্যাক্ট বাস্তবায়নের জন্য এশিয়া-প্যাসিফিকে বেশ বরাদ্দ রেখেছে।
তিনি বলেন, মার্কিন প্রশাসন চায় বাংলাদেশ বার্মা অ্যাক্ট এর গুরুত্বপূর্ণ অ্যাক্টর হয়ে উঠুক। বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে বার্মা অ্যাক্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই এ বিষয়টিকে আমাদের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমানে আরাকান আর্মি এমন অবস্থা সৃষ্টি করেছে তাতে মার্কিন প্রশাসন মনে করে বর্তমান সময়ে বার্মা অ্যাক্ট বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে ভালো সময়।
এম শাহীদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আমাদের আরাকান আর্মির সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে এক ধরনের সম্পর্ক আছে। তাই সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বার্মা অ্যাক্ট বাস্তবায়ন করতে হলে এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সততার সাথে ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, আরাকান আর্মি খুব বেশি ডিসিপ্লিন্ড নয়। তাই তাদের উপর নির্ভর করা সম্ভব নয়। আরাকানে স্থিতিশীলতার জন্য রোহিঙ্গা ও আরাকানের নাগরিকদের মধ্যে একসাথে থাকতে হবে। এজন্য আরাকানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার জন্য মার্কিন প্রশাসনের স্পষ্ট ভূমিকা পালন করতে হবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সম্পর্ক নতুন করে ভাবতে হলে আমাদের আরাকানের বিষয়টা বুঝা ছাড়া উপায় নেই।
আব্দুল মোতালেব সরকার বলেন, বিশ্বের ২৫ শতাংশ মানুষ দক্ষিণ এশিয়ায় বাস করে। আর যদি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে একীভূত করি তাহলে বিশ্বের ৩৪% মানুষ এ অঞ্চলে বাস করে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে অসংহত অঞ্চল। আমাদের তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা অনেক বেশি। বঙ্গোপসাগর আমাদের একটি বড় শক্তি। কিন্তু এটাকে আমরা এখনো কাজে লাগাতে পারিনি। জনগণের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এ অঞ্চলের দেশসমূহের সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। ব্লু-ইকনোমি সহযোগিতার আর একটি খাত হতে পারে।
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর আমরা যাতে টিকে থাকতে পারি তাহলে আমাদেরকে বাজার তৈরি করতে হবে। আসিয়ান, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড আমাদের জন্য বড় বাজার হতে পারে। মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা আসলে মিয়ানমার আমাদের জন্য বড় সম্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিয়ে আমাদের সংস্কার কমিশন করতে হবে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের উপর আমাদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
মাসুমুর রহমান খলিলি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের নীতি কাঠামো বিগত দিনে নষ্ট হয়েছিল। এ আমাদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি শক্তিশালী নীতি কাঠামো তৈরি করতে হবে। আমাদের আসিয়ানের সাথে সংযুক্ত হওয়ার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। সার্ক ইতোমধ্যে অকার্যকর হয়েছে। তাই নতুন আসিয়ান আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে।
তৌফিক এম হক বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে কোন সংস্কার কমিশন না হলেও বিগত কয়েক মাসে এক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে আমরা এক ধরনের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির আভাস পাচ্ছি। বিগত দিনে আমরা খুব ভারত নির্ভরশীল ছিলাম। বর্তমানে ভারত এটা ভালোভাবে দেখছে না। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি আরএসএস দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। তাই ভারতের পররাষ্ট্রনীতি স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশ বিরোধী ও মুসলিম বিরোধী। ভারত সরকার নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ফায়দা মুসলিম বিরোধিতার মাধ্যমে অর্জন করতে চায়। ভারত বর্তমানে পানি-কে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে। পাকিস্তানের সাথে দ্বন্দ্বে আমরা এটা দেখতে পাচ্ছি।
মোহাম্মদ হাসান নাসির বলেন, বিগত সময়ে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব নষ্ট করা হয়েছে। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয়ে আমরা যদি ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত না নেই তাহলে এগুলো আমাদের জন্য বিপর্যয়কর হবে। ভবিষ্যতের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় পাকিস্তান ও চীনের সাথে আমাদের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হবে।
আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, আমাদের জাতীয় স্বার্থ সবসময় চিরন্তন। ফলে এ আলোকে আমাদের বন্ধু ও নীতি নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। ভবিষ্যতের সরকার যাতে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে পররাষ্ট্র নীতি তৈরি করে সেজন্য জাতীয় চাহিদা তৈরি করতে হবে।
শরীফ ওসমান হাদি বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথাগত শিক্ষাবিদরা ভূ-রাজনীতিতে আমাদের দাস বানানোর চেষ্টা করেছে। আমাদের হীনম্মন্য করছে। এ ধারার পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। ভূ-রাজনীতিতে আমাদের শক্তিশালী উপাদানগুলো উল্লেখ করতে হবে, যাতে করে আমরা হীনম্মন্য না থাকি। আমাদেরকে সাগরের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়ার সাথে সংযুক্ত করতে হবে। মায়ানমারকে করিডোর দিতে হলে রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে তা করতে হবে।
এস এম রাশেদুজ্জমান বলেন, জুলাই বিপ্লবের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা হতাশার সাথে দেখছি যে এ বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই ম্রিয়মাণ হচ্ছে। বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে আমরা নতুন বাংলাদেশ করতে পারবো না। পুরানা খেলোয়াররা এখনো ক্রিয়াশীল। ভারতের রাজনীতিবিদগণ কখনোই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের নীতি স্বাধীনতাকে মেনে নেয়নি। তাই আমাদের কৌশলগত বিষয়ে আরো বেশি চিন্তা করতে হবে।
বোরহানউদ্দিন বলেন, আমাদের আলোচনা ভূ-রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে হচ্ছে। কিন্তু আমরা তরুণরা ভিন্নভাবে দেখতে চাই। বাংলাদেশে বিশাল তরুণ আছে। যারা আসিয়ানের বিভিন্ন দেশে যেতে পারে। এটা আমাদের জন্য বেশ কার্যকর হবে। তাই তরুণদেরতে দক্ষ করে তুলতে হবে। তরুণদের কর্মসংস্থান আমাদের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া প্রয়োজন। লুক ইস্ট এশিয়া মডেলকে আবার নতুন করে এগিয়ে নিতে হবে বলে তিনি বলেন।
শরীফুল আলম বলেন, সিপিএএ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্লাটফর্ম হিসাবে কাজ করছে। ফলে আমরা সকলের মতামত ও প্রেক্ষিতকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তবে আমরা জাতীয় স্বার্থকে সবসময় গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আমাদের কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

