অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার দেশজুড়ে শীতের প্রকোপ বাড়বে এবং স্থায়িত্বকাল হতে পারে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় নাগাদ। আবহাওয়া অধিপ্তরের তথ্য ও বৈশ্বিক জলবায়ু বিষয়ক প্রতিবেদন থেকেও এমনই পূর্বাভাস মিলছে।
কেন এবার শীতের তীব্রতা বাড়বে এমন প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, দেশে এবছর বর্ষার শেষের দিকে বৃষ্টিপাত বেশি হয়েছে। যে বছর বর্ষার শেষের দিকে বৃষ্টিপাত বেশি হয় সে বছর ঠান্ডা বেশি অনুভব হয়। এছাড়া এ বছর লা নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশে তাপমাত্রা অনেক কম অনুভূত হতে পারে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ড. মো. রেদওয়ানুর রহমান বলেন, বৈশিক জলবায়ু পরিবর্তনে পরিবেশের উপর যে চাপ পড়েছে তার প্রভাবেও শীত বাড়ার অন্যতম কারণ। কেননা, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শীত বেশি অনুভূত হওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনেরও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। মূলত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বের জলবায়ুর ধরনে পরিবর্তন ঘটছে। পাশাপাশি মহাসাগরীয় আবহাওয়ার আচরণও বদলে যাচ্ছে, এর ফলে তাপমাত্রার চরম ওঠানামা ঘটছে। বদলে যাচ্ছে ঋতু এবং আবহাওয়ার সময়কালও।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য মতে, হিমালয় পেরিয়ে আসা শীতল হাওয়া, সেই সাথে কুয়াশা আর বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা জলীয় বাষ্প দেশে এসে একাকার হয়ে গেছে। দিনের কয়েক ঘণ্টা রোদ দেখা গেলেও কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকছে দেশের বেশির ভাগ এলাকা। ফলে দেশের বেশির ভাগ এলাকার তাপমাত্রা দ্রুত কমতে শুরু করেছে। এ তাপমাত্রা কমে জানুয়ারি শেষ নাগাদ ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে এসে তীব্র শৈত্যপ্রবাহে রূপ নিতে পারে।
শুক্রবার আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়, দক্ষিণপশ্চিম বঙ্গোপসাগরের শ্রীলংকা উপকূলে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি বর্তমানে মান্নার উপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় লঘুচাপ হিসেবে অবস্থান করছে এবং এটি গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে, এর বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়টি পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে, এর বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়টি পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।
পূর্বাভাসে আরো বলা হয়, দেশের পঞ্চগড়, রাজশাহী ও চুয়াডাঙ্গা জেলাসমূহের উপর দিয়ে মৃদু শৈত্য প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। তাপমাত্রা: সারাদেশে রাত এবং দিনের তাপমাত্র সামান্য হ্রাস পেতে পারে। সেইসাথে মধ্যরাত থেকে দুপুর পর্যন্ত দেশের কোথাও কোথাও মাঝারী থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে।
এরই মধ্যে চুয়াডাঙ্গার তাপমাত্রা শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে। শুক্রবার সকালে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৫ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়, ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুক্রবার থেকে সপ্তাহজুড়ে শীত ক্রমেই বাড়তে পারে। দুই দিনের মাথায় দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়তে পারে। চলতি সপ্তাহ ছাড়াও মাসজুড়ে হাড়কাঁপানো শীতের প্রকোপ থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ১২টি শৈত্যপ্রবাহ সঙ্গে শিলাবৃষ্টির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে অন্তত তিন থেকে আটটি মৃদু ও মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা করা হয়েছে। তবে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোর ওপর দিয়ে তিন থেকে চারটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার কথা বলেছে আবহাওয়া বিভাগ।
গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসেও দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যায় শৈত্যপ্রবাহ। ২০২৪-এর জানুয়ারিতে পঞ্চগড়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিলো ৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, অপরদিকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে উত্তরের এই জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এবারের শীতের তীব্রতা ছাড়িয়ে যেতে পারে আগের বছরকেও।
তাই অন্যবারের শীতের তুলনায় অনেক বেশি হবে। এর প্রধান কারণ হল প্রশান্ত মহাসাগরের পরিস্থিতি এবং বিশ্বজুড়ে সার্বিক তাপমাত্রার হেরফের। যেভাবে ২০২৩ সালের সঙ্গে তুলনা করে ২০২৪ সালের তাপমাত্রা বদল হয়েছে ঠিক তেমনিভাবে ২০২৫ সালেও একই ঘটনা ঘটবে। ইতিমধ্যেই ২০২৪ সাল গরমের দিক থেকে নতুন রেকর্ড তৈরি করে ফেলেছে। চলতি বছর প্রায় ১.৫ ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রা দেখেছে পৃথিবী।
আগামী দিনে এর প্রভাব আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। ডিসেম্বর মাস থেকে শুরু হয়ে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত থাকবে লা নিনার প্রভাব। বিশ্ব উষ্ণায়নের হাত ধরে এল নিনা তার খেল দেখিয়েছে। এবার লা নিনার পালা। শুধু বেশি বৃষ্টিপাত নয়, তীব্র গরম থেকে শুরু করে প্রচুর শীত সবই থাকছে এর মধ্যে। ডাব্লুএমও-র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেভাবে এল নিনা প্রভাব ফেলেছে তার সঙ্গে তাল রেখে লা নিনা তার প্রভাব বিস্তার করবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

