‘আদিবাসী’ শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে লক্ষ করা যাচ্ছে। একদিকে শব্দটির ভুল প্রয়োগ করা হচ্ছে, অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি জনগোষ্ঠীকে ‘সেটেলার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। বিভিন্ন সভা-সেমিনার, পোস্টার ও দেয়াললিখনে আদিবাসী স্বীকৃতির দাবি উঠছে। দেশের কিছু বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছেন। একই সঙ্গে পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবিও জোরালোভাবে তোলা হচ্ছে।
পাহাড়ে সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ নির্যাতিত হচ্ছেন—এমন চিত্র অনলাইনে তুলে ধরা হচ্ছে। ২৭ বছর আগের কল্পনা চাকমার নিখোঁজের ঘটনা সামনে এনে শান্তিবাহিনীর হাতে পাহাড়ে ৩০ হাজার বাঙালি হত্যার বিষয়টি আড়াল করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে কল্পনা চাকমার নামে দেয়ালচিত্রও দেখা যায়। অন্যদিকে, শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য হয়েও মুসলিম হওয়ার কারণে সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হওয়ার পর তার হত্যার বিচার দাবিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের তেমন সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কথিত আদিবাসীদের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চলছে।
১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির আওতায় ২৩৮টি সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। অথচ পাহাড়ে এখনো বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয়। তারা প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে। পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করে তুলেছে। পাহাড়ের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি হলেও শান্তিচুক্তিতে তাদের স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচিত হয়নি। চুক্তির প্রায় তিন দশক পরও পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
পাশাপাশি পাহাড়ে খ্রিষ্টান মিশনারিদের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন উপায়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ উঠছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে পূর্ব তিমুরের মতো নতুন খ্রিষ্টান রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা চলছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। মিশনারিদের কার্যক্রম পাহাড়ের সমস্যাকে আরো উসকে দিচ্ছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মিশনারিদের সহযোগিতায় আদিবাসী স্বীকৃতির দাবিতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। এ প্রচারণায় দেশের কিছু বামপন্থি রাজনৈতিক শক্তির সমর্থনও দেখা যাচ্ছে। ফলে অনেক নাগরিক অজ্ঞতাবশত পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে সম্বোধন করছেন। অথচ এ শব্দের ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। ‘আদিবাসী’ শব্দটি নিছক একটি পরিচয়বাচক শব্দ নয়; এর পেছনে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। তাই এর যথেচ্ছ ব্যবহার এবং স্বীকৃতির দাবির সম্ভাব্য প্রভাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আদিবাসী কারা
ইংরেজি Aboriginal শব্দের বাংলা অর্থ আদিবাসী। উত্তর আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং নিউজিল্যান্ডের মাওরিরা ঐতিহাসিকভাবে সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের আদি অধিবাসী হিসেবে পরিচিত। রেড ইন্ডিয়ানরা এশীয় বংশোদ্ভূত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তারা প্রায় ১০ হাজার বছর আগে উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিল। প্রায় ৫০০ বছর আগে ইউরোপীয়রা সেখানে গিয়ে তাদের ভূমি দখল করে। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বসবাসের ইতিহাস এক লাখ বছরেরও বেশি পুরোনো বলে জানা যায়। একইভাবে ইউরোপীয়দের আগমনের আগে থেকেই নিউজিল্যান্ডে মাওরিদের বসবাস ছিল।
ঐতিহাসিকভাবে কোনো ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা জনগোষ্ঠীকে সে অঞ্চলের আদিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচয় নির্ধারণে শুধু বসবাসের সময়কাল নয়, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, আত্মপরিচয় ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অবস্থানও বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর পূর্বপুরুষেরা তিব্বত, লুসাই পাহাড়, চীন, কাচিন, রাখাইন ও বার্মাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন সময়ে এ দেশে এসেছেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। যুদ্ধ-বিগ্রহসহ নানা কারণে তারা এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন। কয়েকশ বছর ধরে কোনো অঞ্চলে বসবাস করলেই একটি জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় কি না, তা বিবেচনার বিষয়। যেমন : আজকের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ২০০ বছর পর কক্সবাজারের কোনো অঞ্চলের আদিবাসী হওয়ার দাবি করলে সেটি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবেÑসে প্রশ্নও সামনে আসে।
ঐতিহাসিক, নৃ-তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পরিচয় নির্ধারণে আরো গবেষণা প্রয়োজন। কোনো জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।
আদিবাসী স্বীকৃতির তাৎপর্য
জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণ, ভূমি ও সম্পদের অধিকার, নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি সামরিক কার্যক্রম ও উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং সম্মতির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
এসব অধিকার ও তার প্রয়োগ নিয়ে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদিবাসী স্বীকৃতির দাবিকে তাই আবেগের পরিবর্তে ঐতিহাসিক, সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয়। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার, ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যাবে না।
আমাদের করণীয়
পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় বৈষম্যহীন আইন ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী—উভয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত না করে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন, সীমাবদ্ধতা ও প্রভাব নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। চুক্তিতে আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্বের ভারসাম্য নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
পাহাড়ে ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস থাকলেও শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে। ফলে চুক্তির আওতার বাইরে থাকা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ও স্বার্থের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। চুক্তির সময় আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন ও ভূমিকা নিয়েও নতুন করে পর্যালোচনা প্রয়োজন।
অনেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিকে বেলফোর ঘোষণার সঙ্গে তুলনা করেন। তাদের মতে, বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছিল। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পরিণতি নিয়েও কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তবে এ ধরনের আশঙ্কার পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ থাকা জরুরি।
চুক্তির প্রায় তিন দশক পরও পাহাড়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। তাই বর্তমান বাস্তবতায় চুক্তির প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং সব জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় নতুন উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে বৈষম্য দূর করে পারস্পরিক আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাহাড়ের সব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বরদাশত করা যাবে না।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। রাষ্ট্রের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব এবং সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করেই পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

