আজ দেশে রয়েছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার। ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে বিগত বছরগুলোতে ছিল আওয়ামী স্বৈরতান্ত্রিক শাসন। এই পরিবর্তন ঘটে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। জুলাই এই জাতিকে দিয়েছে স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি। জুলাই আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে জালিম শাসকের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হয়, কীভাবে নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে হয়। এই অধিকার আদায়ে নিজেদের জীবন বাজি রেখে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে হয়।
জুলাইয়ের সূচনা একদিনে হয়নি; বরং এটি দীর্ঘ সময় ধরে দেশের আপামর জনসাধারণকে বঞ্চনা, নির্যাতন ও অধিকার হরণের মধ্য দিয়ে এসেছে। জুলাইয়ে অংশগ্রহণ ছিল শ্রমজীবী মানুষ, পেশাজীবী, কৃষক, প্রবাসী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গৃহিণী—এমন কোনো ক্ষেত্র ছিল না, যারা অংশ নেয়নি। তাই বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমান সর্বদাই বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন সবার।’ জুলাই সৃষ্টি হয়েছিল একটি সামাজিক আন্দোলন থেকে, যা আস্তে আস্তে বঞ্চিত ও নির্যাতিত দেশবাসীর মুক্তির পথে পরিণত হয়। আপামর জনগণ এটিকে গণঅভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে যায়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনের সূচনা হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়, যা পরে ছড়িয়ে পড়ে রাজপথে। শহীদ হন আবু সাইদ, ওয়াসিম আকরাম, মুগ্ধসহ অসংখ্য ছাত্র-জনতা এবং আহত হন লক্ষাধিক মানুষ। যাদের ত্যাগ এ জাতিকে গণঅভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে গেছে।
ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যমে মঈন-ফখরুদ্দীন ক্ষমতা নিলেও, পেছনে ছিল মূলত আওয়ামী দোসররা। ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনা হয়। ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মাথায় পিলখানা হত্যাকাণ্ড দিয়ে শুরু হয় তাদের নীলনকশার আনুষ্ঠানিক সূচনা। এরপর অসংখ্য গুম, শেয়ারবাজার লুট, সাংবাদিক হত্যা, পত্রিকাসহ অনলাইন মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়া, বাকস্বাধীনতা হরণ, ব্যাংক লুট, বিদেশে অর্থ পাচার, বিরোধী দলকে দমন, বিরোধী মতকে আইন করে চুপ করানো, সংসদে আত্মীয়স্বজন দিয়ে পরিচালনা করা, সরকারি চাকরিতে সর্বোচ্চ দলীয়করণ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ, মেগা প্রকল্পের টাকা লুট, বাজারে সিন্ডিকেট, অস্বাভাবিক কোটা চালুসহ অসংখ্য অনিয়মের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিচালিত হতে থাকে। ভেঙে পড়ে একটি রাষ্ট্রের ব্যবস্থা।
গণঅভ্যুত্থানের শুরুর দিকে এটি ছিল অস্বাভাবিক কোটার বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন। প্রায় প্রতিটি বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই সামাজিক আন্দোলনের সূচনা হয়। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। সব ভেদাভেদ ভুলে ছাত্রলীগ ছাড়া সব ছাত্রসংগঠন এক কাতারে এসে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায়। আন্দোলনের শুরু মে মাসের শেষের দিকে হলেও গতি পায় জুলাই মাসে। আন্দোলন ক্যাম্পাসভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়েই চলতে থাকে। কিন্তু জুলাইয়ের মাঝামাঝি তৎকালীন সরকার হস্তক্ষেপ করে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের সব জায়গায়। সামাজিক আন্দোলন রূপ নেয় রাজনৈতিক আন্দোলনে।
গণঅভ্যুত্থানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ঢাকা জেলার আন্দোলন। রাজধানী ঢাকার বাইরে জাহাঙ্গীরনগরকেন্দ্রিক আন্দোলন সে সময় দেশের আন্দোলনের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। আন্দোলন ছিল নিজ নিজ জায়গায় স্বাধীন এবং কেন্দ্রীয় কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় স্থানভেদে আন্দোলনের ভিন্ন ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। কেন্দ্রীয়ভাবে কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও আন্দোলন নিজস্ব পরিস্থিতি ও উপায়ে দেশব্যাপী পালিত হতো।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। হামলায় অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক আহত হন। আহত শিক্ষার্থীদের বিচার চেয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনে গেলে তাদের ওপর চলে নারকীয় হামলা। আহত ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ান বিবেকবান শিক্ষকরা। তারা ঢাল হয়ে শিক্ষার্থীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বহিরাগত সন্ত্রাসীদের আক্রমণের শিকার হন আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। সবাই নিরাপত্তার জন্য উপাচার্যের বাসভবনে আশ্রয় নেন। এ সময় চলে আরেক দফা সন্ত্রাসী হামলা। এসব হামলার খবর শুনে প্রতিটি হল থেকে শিক্ষার্থীরা এসে আন্দোলনরত সহপাঠী ও শিক্ষকদের উদ্ধার করেন। এর মধ্য দিয়েই বহিরাগত সন্ত্রাসী ও ছাত্রলীগমুক্ত প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের গতি বেগবান করে। যার ধারাবাহিকতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাত্রলীগমুক্ত হয়েছিল।
ভিসি ভবন থেকে ছাত্রলীগমুক্ত হলেও কিছু সময় পরে হামলা চালায় সে সময়ের পুলিশ বাহিনী। পুলিশের হামলা চলে রাত থেকে ভোর পর্যন্ত। সকালে পুলিশ এটিসিসহ ভারী অস্ত্র নিয়ে আসে। সারাদিন হামলা চালানো হয়। এতে আন্দোলনরত অসংখ্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা আহত হন। এই নির্মম ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছবি নামিয়ে ফেলেন বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানা। এটিও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা এবং আন্দোলনের গতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিবেকবান শিক্ষক ও জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের বলিষ্ঠ ভূমিকা আন্দোলনে প্রভাব রাখে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শুরু করেন এক ঐতিহাসিক আন্দোলন।
জাহাঙ্গীরনগরেই দেশের সর্বপ্রথম কারফিউ ভেঙে মিছিল করা হয়। ছাত্রদলসহ অসংখ্য ছাত্রনেতার নামে জারি হয়েছিল হুলিয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ ঘোষণা করে গণগ্রেপ্তার শুরু করা হলে এগিয়ে আসেন সাভারের আপামর জনগণ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণা করা হলে, ১৯ জুলাইয়ের পরে আন্দোলনের নেতৃত্ব মূলত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই দেন। আন্দোলনের গতি জোরালো করতে এগিয়ে আসে গণবিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল, সিটিসহ সাভারের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। সবাই মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে জড়ো হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতেন। আন্দোলন জাহাঙ্গীরনগর থেকে শুরু হলেও তা ছড়িয়ে পড়ে সাভারসহ আশপাশের এলাকায়। আন্দোলনের সময় প্রতিদিনই জাহাঙ্গীরনগরের ডেইরি গেট ছিল উত্তাল, ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ।
আন্দোলনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানিয়ে হলের তালা ভেঙে হলগুলো খুলে ফেলেন। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পালিয়ে যায়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে আসে এক দুর্বার সাহস।
‘মার্চ টু ঢাকা’ ঘোষিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার থেকে জড়ো হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয় সমাবেশটি। এই পদযাত্রায় হাজারো মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। পদযাত্রাটি সাভার বাসস্ট্যান্ড পার হলে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আব্দুল কাইয়ুম, আলিফ, শ্রাবণ গাজী, নাফিসাসহ অনেক তাজা প্রাণ। এরই মধ্যে খবর আসে আওয়ামী রেজিমের পালিয়ে যাওয়ার। যদিও সাভার মুক্ত হয় আরো পরে। এখানে আওয়ামী অতি-উৎসাহী পুলিশ কর্তৃক গুলি করে হত্যা এবং শহীদদের মরদেহ জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের মধ্যে শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক যে নতুন এক বার্তা এনে দিয়েছে। বর্তমান সরকারকে বুঝতে হবে, সুদিনের কর্মী দিয়ে দল ও সরকার পরিচালনা করলে বিগত আওয়ামী রেজিমে পরিণতি ভোগ করতে হবে। শাসিতের জন্য বার্তাটি হলো—শাসকগোষ্ঠী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, ঐক্যবদ্ধ হলে তাদেরই বিজয় নিশ্চিত।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


