আমার ‘দ্য রোহিঙ্গা: ইনসাইড মিয়ানমারস হিডেন জেনোসাইড’ বইটি ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয়। বইটিতে আমিই প্রথম যুক্তি তুলে ধরেছিলাম কেন রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নিপীড়নকে ‘গণহত্যা’ হিসেবেই দেখা উচিত। সেই সময়ে ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করাও ছিল কঠিন একটি কাজ। আমি বছরের পর বছর ধরে নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক এবং বিশ্লেষকদের বোঝানোর চেষ্টা করে আসছি যে, রাখাইন রাজ্যে যা ঘটেছে, তা শুধু বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক সংঘাত কিংবা জাতিগত নির্মূল অভিযান নয়, বরং তা ছিল নিজ মাতৃভূমিতে একটি জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার সক্ষমতাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া। এ বিষয়টির তাৎপর্য ও গুরুত্ব বুঝতে পারাটা জরুরি।
বইটি প্রকাশের এক বছর পর ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শুরু করা অভিযানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করার ফলে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। তখন ‘গণহত্যা’ শব্দটির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব ছিল না। এখন সেই আইনি প্রশ্নটি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক মুহূর্তের দিকে এগিয়ে চলেছে।
আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া ২০১৯ সালে ‘গণহত্যা সনদ’-এর আওতায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে। আদালত ২০২২ সালে মিয়ানমারের প্রাথমিক আপত্তিগুলো খারিজ করে দেয় এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে মামলার মূল বিষয়বস্তুর ওপর শুনানি গ্রহণ করে। গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী জানিয়েছেন, তারা অক্টোবরে রায় প্রত্যাশা করছেন, যদিও আদালত এখনো রায় দেওয়ার তারিখ ঘোষণা করেনি।
আদালত যদি রায় দেয়, মিয়ানমার গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করেছে, তবে তা হবে এক অসাধারণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। কিন্তু রায়ের পরবর্তী সময়ে একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আসবেÑগণহত্যার জন্য রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বিষয়টি আসলে কী দাবি করে? এই প্রশ্নটি অত্যন্ত জটিল, কারণ মিয়ানমার রাষ্ট্রটি নিজেই এখন খণ্ডিত হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনী এখনো রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করছে ঠিকই, কিন্তু দেশের বিশাল অংশে তাদের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করা হয়েছে এবং এর অধিকাংশ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে, বিরোধীদের গঠিত ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট’ নিজেদের গণতান্ত্রিক বৈধতার দাবিদার হিসেবে তুলে ধরছে এবং ভবিষ্যতে একটি ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় মিয়ানমার গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
তবে আন্তর্জাতিক আইন কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের বিচার করে না, এই আইন শুধু রাষ্ট্রকে নিয়ে কাজ করে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান মামলাটি ‘জেনারেল মিন অং হ্লাইং বনাম গাম্বিয়া’ নয়, বরং এটি ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলা নামে পরিচিত। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, সরকার বদলায়, শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে, কিন্তু রাষ্ট্র টিকে থাকে।
মিয়ানমার যদি গণহত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে সেনাবাহিনী ভবিষ্যতে ক্ষমতা হারালেও তাদের দায়ভার মুছে যাবে না। ভবিষ্যতে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার এমন একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করবে, যে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম গুরুতর একটি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে বলে প্রমাণিত হয়েছে। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক শাসনপন্থি বিরোধী শিবিরের অনেকেই সামরিক শাসনের বিরোধিতা করেছেন এবং ২০১৭ সালে সেনাবাহিনীর নৃশংসতায় তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। তাহলে যেসব জেনারেলের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করেছেন, তাদের করা অপরাধের দায় কেন তাদের বহন করতে হবে? এর কারণ হচ্ছে, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা আর ব্যক্তিগত অপরাধবোধÑএ দুটি বিষয় এক নয়।
ভবিষ্যতের কোনো গণতান্ত্রিক নেতাকে এমন অপরাধের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা উচিত নয়, যা তিনি নিজে করেননি। কিন্তু সরকারি পদে আসীন ব্যক্তিদের পরিবর্তনের মাধ্যমেই কোনো রাষ্ট্র তার দায়বদ্ধতা মুছে ফেলতে পারে না। যদি তা সম্ভব হতো, তবে আন্তর্জাতিক জবাবদিহির বিষয়টি প্রায় অর্থহীন হয়ে পড়ত। কোনো শাসকগোষ্ঠী নৃশংসতা চালানোর পর ক্ষমতাচ্যুত হলে তাদের উত্তরসূরিরা ‘নতুন করে শুরু’র দাবি তুলে ভুক্তভোগীদের কোনো প্রতিকার ছাড়াই ফেলে রাখতে পারত। মিয়ানমারের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, গণহত্যাবিষয়ক কোনো চূড়ান্ত রায়কে শুধু নিন্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না, একে আরো জোরালো ও কার্যকর কিছুতে রূপ দিতে হবে। এই রায়কে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমঝোতার কাঠামো নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে হবে।
রোহিঙ্গা ইস্যুকে শুধু একটি মানবিক সংকট বা বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। যদি মিয়ানমার রাষ্ট্রকে গণহত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তবে সেই অপরাধের পরিণাম বা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়াটা খোদ ওই রাষ্ট্রেরই প্রধান দায়বদ্ধতা হয়ে দাঁড়াবে। এই দায়বদ্ধতার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে, সমান ভিত্তিতে নাগরিকত্ব পুনর্বহাল, সম্পত্তির অধিকার রক্ষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রদান এবং স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ বজায় রাখা। এই দায়বদ্ধতাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গণহত্যা মানেই শুধু মানুষ হত্যা নয়, এর মাধ্যমে সমাজের কোনো একটি গোষ্ঠীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সক্ষমতাকেও ধ্বংস করার চেষ্টা করা হতে পারে।
রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে দশকের পর দশক ধরে চলা বঞ্চনা ও প্রান্তিকীকরণের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল তাদের গণ-উচ্ছেদ। ২০১৭ সালের সেই গণ-উচ্ছেদের ৯ বছর পরও ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। মিয়ানমার থেকে তাদের অনুপস্থিতি রাখাইনের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি স্থায়ী অংশে পরিণত হতে চলেছে। তাই এমন কোনো আইনি রায়, যা গণহত্যাকে চিহ্নিত করল কিন্তু সেই বাস্তবতাকে অপরিবর্তিত রেখে দিল, তা হবে এক অসম্পূর্ণ বিচার। এ কারণেই মিয়ানমারের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গণহত্যা সনদের বিশ্বাসযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত শুধু আদালতের ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহারের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না, বরং শব্দটি ব্যবহারের পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর ওপরই তা নির্ভর করে। আমি জানি, সেই প্রথম পদক্ষেপটি নেওয়া কতটা কঠিন হতে পারে। ২০১৬ সালে যখন আমি রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে লিখেছিলাম, তখন এই পরিভাষাটির প্রতি তীব্র আপত্তি লক্ষ করেছিলাম। গণহত্যা শব্দটিকে প্রায়ই ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত রাখা হতো, এমন অপরাধ যার হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন হয়েছে এবং যার সপক্ষে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু গণহত্যা সনদের উদ্দেশ্য কখনোই এমন ছিল না যে, কোনো বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর তা বর্ণনা করার জন্য ইতিহাসবিদদের শুধু একটি শব্দভান্ডার বা পরিভাষা সরবরাহ করা হবে।
কোনো ঘটনার স্বীকৃতি বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থেকে সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। আদালত যদি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, মিয়ানমার গণহত্যা চালিয়েছে, তবে সেই রায় যেন শুধু আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ না থেকে যায়, বিশেষ করে যখন ভুক্তভোগীরা এখনো স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে আছে। এই রায় মিয়ানমারের ভবিষ্যতের জন্য এমন একটি নীতি প্রতিষ্ঠা করবে। এই নীতিতে কোনো সরকার তা সামরিক বা গণতান্ত্রিক যাই হোক, তারা সেই রাষ্ট্রের বিতাড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা স্বীকার করে না নিলে রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ও প্রতিষ্ঠানের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না।
ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক মিয়ানমারের উচিত হবে না বিষয়টিকে সামরিক বাহিনীর অপরাধের জন্য ‘সামষ্টিক শাস্তি’ হিসেবে দেখা, বরং তাদের উচিত হবে দায় স্বীকার করাকে সামরিক বাহিনীর অতীত কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। নতুন মিয়ানমার যে প্রকৃত অর্থেই পুরোনো মিয়ানমার থেকে আলাদা, নতুন সংবিধান প্রণয়ন বা নতুন সরকার গঠন তার বড় প্রমাণ নয়, বরং সেই প্রমাণ পাওয়া যাবে এমন একটি রাষ্ট্রের মাধ্যমে, যা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক অধিকার ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছুক, যেগুলো পুরোনো রাষ্ট্রটি ধ্বংসের চেষ্টা করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বকে এটা বোঝানোর জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ওপর যা ঘটেছে তা প্রকৃতই গণহত্যা। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত যদি সেই স্বীকৃতি দেয়, তবে পরবর্তী লড়াইটি হবে সেই রায়কে কার্যকর করার।
আরব নিউজ অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

