আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

মুজিবের বাড়ি ও শেখ হাসিনার দায়

এম আবদুল্লাহ

মুজিবের বাড়ি ও শেখ হাসিনার দায়

এবারে লেখার ইচ্ছা ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছয় মাসের সফলতা-ব্যর্থতা, জনগণের চাওয়া-পাওয়া প্রভৃতি বিষয়ে। কিন্তু বাংলাদেশটা ইস্যুর দেশ। এখানের হররোজ নতুন নতুন ইস্যু পয়দা হয়। আম পাবলিক সেই ইস্যুতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মাতামাতি করে। ভার্চুয়াল জগতে উত্তাপ ছড়ায়। আবার নিমিষেই নতুন ইস্যুর নিচে চাপা পড়ে আগের ইস্যু। তবে এই ইস্যু দিয়ে ইস্যু চাপা দেওয়ার খেলায় পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার ছিল খুব পারঙ্গম। নিজেদের নানা অপকর্ম চাপা দিতে পরিকল্পনা করে ইস্যুর পিঠে ইস্যু সামনে আনা হতো।

বিজ্ঞাপন

গত সপ্তাহটি শুরু হয় জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের একাংশের রাজধানীর আগারগাঁও ও মিরপুর রোডে অবরোধ করার মধ্য দিয়ে। দিনভর লাখো মানুষকে কষ্ট দিয়ে তারা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। রাত গভীরে সেখানে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সংঘাতে জড়ায়। জুলাই বিপ্লবের অন্যতম নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ রাত ৪টার দিকে তাদের সামলিয়ে হাসপাতালে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হন।

শাহবাগ মোড় অবরোধ করে ও সংবাদ সম্মেলন করে শহীদ পরিবারের সদস্যদের আহাজারি এবং রাস্তা বন্ধ করে আহত ব্যক্তিদের বিক্ষোভ শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতদের প্রতি যে দায়িত্ব ছিল, সরকার তা যথাযথভাবে পালন করছে কি না, সে প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের জাতীয় স্বীকৃতি, প্রতিটি শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন এবং হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারকাজ শেষ করার দাবি জানানো হয়েছে। যদিও এর পেছনে পতিতদের ষড়যন্ত্র ও ইন্ধনের অভিযোগও রয়েছে।

কুমিল্লায় যৌথবাহিনীর হেফাজতে যুবদল নেতার মৃত্যু নিয়েও খানিকটা ক্ষোভ-বিক্ষোভ হয়। রাজধানীর উত্তর সিটিতে খাল খনন উদ্বোধনে সরকারের তিন উপদেষ্টার লাল কার্পেট মাড়িয়ে এক্সকাভেটরে ওঠা নিয়েও সামাজিক মাধ্যম সরব হয়। সরকারি তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবিতে সেখানকার শিক্ষার্থীদের একাংশের টানা আন্দোলনে সড়কের পাশাপাশি রেলপথ অবরোধও গত সপ্তাহে জনভোগান্তির কারণ হয়। পরে সাত দিনের জন্য আন্দোলন প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে স্বস্তি আসে। আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে তিমুমীর আন্দোলনেও স্থানীয় আওয়ামী লীগারদের পরিকল্পিত চক্রান্ত ও ইন্ধনের প্রমাণ মেলে।

রাজনৈতিক ইস্যুর মধ্যে ছিল পতিত আওয়ামী লীগের ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে কথিত আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা। লিফলেট বিতরণ, হরতাল ও অবরোধের মতো কর্মসূচি দেওয়া হয় আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজ থেকে। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যম ও টকশো সরগরম হয়ে ওঠে। লিফলেট বিতরণ করতে গিয়ে কয়েকটি স্থানে আওয়ামী লীগ কর্মীদের গণধোলাই খাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়। এক বিসিএস কর্মকর্তা লিফলেট বিতরণের জেরে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে স্থান পেয়েছেন।

এসব ইস্যু ছাপিয়ে সপ্তাহ শেষে আসে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে শেখ মুজিবের বাড়ি ইস্যু। এ ইস্যুরও হোতা সেই পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। পালিয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা কিছুদিন বিরতির পর হঠাৎ বক্তৃতার খায়েশ প্রকাশ করেন। খবর আসে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের একটি ভার্চুয়াল সভায় বক্তব্য দেবেন তিনি। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি ও হাসিনার বক্তব্যকে ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রত্যাবর্তনের হুমকি হিসেবে দেখেন তারা। প্রতিবাদে ‘লংমার্চ টু ধানমন্ডি ৩২’ কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তারা শেখ মুজিবের সেই বাড়িকে ‘ফ্যাসিবাদের আঁতুড়ঘর’ হিসেবে বর্ণনা করে তা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন।

বুধবার দুপুরের দিকে ৩২ নম্বরের উদ্দেশে লংমার্চের ঘোষণা আসে। রাজধানীর বাংলামোটরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনা ও ছাত্রলীগ চ্যাপ্টার ক্লোজড। তারা যদি প্রাসঙ্গিক থাকতই, তাহলে ৫ আগস্ট পালিয়ে যেতে হতো না।’

হাসনাত আবদুল্লাহর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া একটা পোস্টে বলা হয়, ‘আজ (বুধবার) রাতে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদের তীর্থভূমি-মুক্ত হবে।’ এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ঘোষণা দেন, ঠিক যে সময়ে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেওয়া শুরু করবেন, তখনই ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ভবনে ভাঙচুর চালানো হবে। হাসনাত আবদুল্লাহর পোস্টের কমেন্টে এক আইডি থেকে মন্তব্য করা হয়েছে, ‘আজ (বুধবার) রাত ৯টায় ৩২-এর বারোটা বাজাবে ৩৬-এর জনতা।’

তার পরের ঘটনাপ্রবাহ সবার জানা। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িটির অর্ধেকের বেশি অংশ এরই মধ্যে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। কয়েক দফায় আগুনও জ্বলে ওই বাড়িতে। বুধবার রাত ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত এক্সকাভেটর, ক্রেন ও বুলডোজার দিয়ে বাড়িটির অর্ধেকের বেশি অংশ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। বাড়িটি এরই মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এখন অবশ্য ভাঙার কাজ বন্ধ রয়েছে।

তবে ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বাড়িটি নিয়ে এখনো কৌতূহল রয়েছে এবং আলোচনা চলছে। মুজিবের বাড়ির নতুন ভবনের নিচে চার-পাঁচতলা কী কাজে ব্যবহার করা হতো সে প্রশ্ন উঠেছে। আলোচিত টর্চার সেল ‘আয়নাঘর’-এর আদলে ছোট ছোট কক্ষ রয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ডের কয়েকটি ফ্লোরে। পানিও জমাট রয়েছে। ভাঙা হেলমেট, অসংখ্য জুতা, ছেঁড়া প্যান্টসহ নানা জিনিস গভীর সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। অনেকে বলছেন, বিভিন্ন বাহিনীর নির্যাতন ও বন্দিশালার মতো মুজিবের বাড়িতেও বন্দিখানা ছিল। সেটি দলীয় না রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে ছিল, সে প্রশ্নও তুলছেন অনেকে।

ধানমন্ডির ৫ নম্বর সড়কে অবস্থিত শেখ হাসিনার বাসভবন সুধা সদনেও বুধবার রাতে আগুন দেয় ছাত্র-জনতা। আগুন জ্বলে বৃহস্পতিবারও। ছাত্র-জনতার ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরেও। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত অন্তত ৩৫ জেলায় আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘর ও স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। ভোলায় তোফায়েল আহমেদের বাড়ি, নোয়াখালীতে ওবায়দুল কাদেরের বাড়ি, বরিশালে সাদিক আবদুল্লাহ ও আমুর বাড়ি, কুষ্টিয়ায় হানিফের বাড়ি এবং কুমিল্লায় বাহাউদ্দিনের বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের অর্ধবার্ষিকী বা ছয় মাস উদ্‌যাপন এভাবে হওয়ার কথা ছিল কি? না। শেখ হাসিনার ব্যাপারে অনেক আগে থেকে একটি কথা চালু আছে তা হলো—‘হাসিনাকে মুখ খুলতে দিলে, তার আর শত্রুর প্রয়োজন পড়ে না।’ ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা মেধাবী নয়, শুধু কি রাজাকারের বাচ্চারা মেধাবী’—মুখে ভেংচি কেটে এই বেফাঁস বক্তব্যই তার পতন ও পলায়নের চূড়ান্ত পটভূমি রচনা করে। এরপর ভারতে বসে একবার ‘চট করে ঢুকে পড়া’র ঘোষণা দিয়ে নেতা-কর্মীদের বিপদে ফেলেন শেখ হাসিনা। এবারে তার বক্তব্যও ছিল পুরোনো ধাঁচের, কোনো পরিবর্তন নেই।

সত্যি কথা বলতে কি, বুধবার বিকালের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন ‘মার্চ টু ধানমন্ডি ৩২’ কর্মসূচির ঘোষণা দেখলাম, তখন মনে প্রশ্ন জাগলো—কাজটা কি ঠিক হবে? নানা শঙ্কাও উঁকিঝুঁকি দিতে থাকল। কিন্তু রাত ৯টার পর দিল্লিনিবাসী শেখ হাসিনার বক্তব্য শোনার পর অজান্তেই তার পরিবর্তন হতে থাকল। মনে হলো শেখ হাসিনা এখনো তার মৃত বাবা-মা ও ভাই-ভাবিদের বেচে সহানুভূতি কেনার অভ্যাস ত্যাগ করেননি। হাজারো ছাত্র-জনতার জীবন ও রক্তের প্রতি তার এতটুকু মায়া জাগেনি। অনুশোচনার লেশমাত্র নেই। ফিরে এসে প্রতিশোধের হুমকিটা দিতেও দ্বিধা করেননি। তার বক্তব্যের বস্তাপচা উন্নয়ন-গীত চরম বিরক্তির সঙ্গে হজম করতে হয়েছে। বুধবারের বক্তব্যও যে আগের মতোই আত্মম্ভরিতা ও দম্ভের প্রচারে পূর্ণ—সেই পুরোনো আমিত্বে ভরা। জুলাই গণহত্যা ও ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের জন্য সামান্য অনুতাপ-অনুশোচনাও যে নেই, তা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তুলে ধরেছেন অনেক বিশ্লেষক।

মুজিবের বাড়ি ধ্বংসাভিযানের সময় টিভিতে এক তরুণের প্রতিক্রিয়া ছিল এমন—‘চব্বিশের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। সেই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। সেটার অংশ হিসেবে এই বাড়ি ভাঙতে এসেছি।’ আরেকজন বলেন, ‘এই মাটিতে স্বৈরাচারের কোনো চিহ্ন থাকবে না। আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এসেছি। আমরা আওয়ামী লীগের জন্য কোনো কিবলা অবশিষ্ট রাখব না।’ দেয়ালের ইট খুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন সৈয়দ রিফাত নামের এক তরুণ। এ সময় তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের ধ্বংসস্তূপের প্রমাণ রেখে দেওয়ার জন্য এই ইট রাখলাম। এর পরও যদি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের কেউ ফিরে আসার কথা বলে, এই ইট তার কপালে যাবে।’

শেখ হাসিনার ভাষণ নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া ছিল এমন—“শেখ হাসিনার শাসন বঙ্গবন্ধুকে ফ্যাসিবাদের আইকনে পরিণত করেছিল। ‘বাংলাদেশ মানেই মুজিব, মুজিব মানে বাংলাদেশ’ এ বয়ানে অন্য সব জাতীয় নেতা ও বীরকে অস্বীকার করে বঙ্গবন্ধুকে ঈশ্বরে পরিণত করা হয়েছিল, যা মানুষের ওপর চাপিয়ে মন বিষিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার সমালোচনা, আলোচনা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ গণ্য হতো। এর মাধ্যমে শেখ মুজিবকে দ্বিতীয়বারের মতো হত্যা করেন শেখ হাসিনা। কিন্তু এ অপরাধ তো শেখ মুজিবের নয়, বত্রিশের নয়। ভবন ভেঙে কি আমাদের প্রত্যাশিত নির্মোহ ইতিহাস দাঁড়াবে?” তাৎক্ষণিক এ প্রতিক্রিয়া সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট রাজিব মাহমুদের।

দৈনিক আমার দেশ-এর ২০১৩ সালের একটি শীর্ষ সংবাদের ক্লিপ শেয়ার করে তিনি আরেক পোস্টে যথার্থই লিখেছেন—ফারসি প্রবাদ বলে, “নিজে সইতে পারবে না, এমন জুলুম কারো ওপর করো না। আজ আওয়ামী লীগের জন্য তা প্রযোজ্য। ধানমন্ডি বত্রিশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ায় দলটির নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ, স্তব্ধ। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে পরের দুই মাসে সাতক্ষীরায় বিএনপি-জামায়াতের প্রচুর নেতাকর্মীর বাড়িঘর র‌্যাব ও বিজিবি দিয়ে ঘেরাও করে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। যে জুলুম নিজে সইতে পারবে না, তা অপরের ওপর কেন করেছিলেন শেখ হাসিনা?”

মুজিব ও হাসিনার বাড়ি থেকে শুরু করে সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতাদের বাড়িঘরে হামলা ও জ্বালিয়ে দেওয়া সাধারণভাবে কোনো বিবেকবান মানুষ সমর্থন করতে পারে না। অস্বীকার করার উপায় নেই, তারা নিপীড়ক ও লুটেরা ছিলেন। তাদের অনেকেই জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতাকে হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। নীতিগতভাবে এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিক হিসেবে ১৫ বছরের খুন, গুম, নিপীড়ন, দুঃশাসন এবং চব্বিশের জুলাই গণহত্যা যেমন সমর্থন করিনি, তেমনি আইন হাতে তুলে নেওয়া বা নৈরাজ্যবাদী কর্মকাণ্ড এখনো সমর্থন করি না। এর প্রতিবাদ জানানো নৈতিক দায়িত্ব মনে করি।

কিন্তু যখন শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি থেকে এ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রনায়ক ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি গুঁড়িয়ে দিয়ে বিকৃত উল্লাসে মেতে ওঠার দৃশ্য সামনে আসে, তখন প্রতিবাদ করার শক্তি হারিয়ে যায়। চরম দুর্ব্যবহারের শিকার খালেদা জিয়ার সেদিনের শিশুর মতো কান্নার ভিডিওটি কয়েক দিন ধরে ঘুরেফিরে সামনে আসছে। পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনামাফিক ক্যান্টনমেন্ট থেকে তাকে বের করে দেওয়ার বিষয়ে শেখ হাসিনার দম্ভোক্তির ভিডিও ক্লিপটিও নতুন করে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে ভাসছে।

শেখ হাসিনা একটি প্রজন্মের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছিলেন, তাও উঠে আসছে প্রতিক্রিয়ায়। বছরের পর বছর গুম, বিচারবিহর্ভূত হত্যা, ভোট ডাকাতি, ভয়াবহ দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় মদতে লুটপাট, বিরোধীদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে ভাঙা, নিশ্চিহ্ন করা, সাংবিধানিক-নাগরিক-রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া, শাহবাগের নামে জাতিকে বিভক্ত করা থেকে সবশেষ গণহত্যা—একজন স্বৈরাচারের পক্ষে সম্ভব সব অপরাধ তিনি করেছেন। সেগুলো এখন ৩২ নম্বর থেকে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া আগুনের বিপরীতে যুক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

গত কয়েক দিনে দেশজুড়ে সংঘটিত ভাঙচুর ও আগুনের দায় শেখ হাসিনাকেই নিতে হবে। তিনি গণহত্যার দায় স্বীকার না করে, ক্ষমা না চেয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য ও তৎপরতা অব্যাহত রাখলে দেশের প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আরও মাশুল গুনতে হবে। আবার অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী খুনি-লুটেরাদের বিচার ত্বরান্বিত করতে ব্যর্থ হলে নতুন প্রজন্ম এভাবে আইন হাতে তুলে উৎসাহিত হবে। এতে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। শেখ হাসিনাকে থামানোর জন্যে দিল্লির প্রতি ঢাকার অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া মেলার সম্ভাবনা কম। সেটি মাথায় রেখেই কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। জুলাই বিপ্লবের ছাত্রনেতাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক করতে প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা কাম্য। খেই না হারিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ায় মনোনিবেশ করাই সময়ের দাবি।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সাবেক সভাপতি, বিএফইউজে

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন