বাংলাদেশে অন্যতম ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো টোটেম সংস্কৃতি। এর অর্থ হলো, কোনো প্রভাবশালী মৃত ব্যক্তি বা বস্তুকে টোটেম বা ‘পূজার আসনে’ বসানো এবং তাকে ঘিরেই সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নির্ধারণ করা।
সমাজবিজ্ঞানের জনক ইমিল ডুরখেইম অস্ট্রেলিয়ার অরুন্টাস সম্প্রদায়ের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে এই টোটেম সংস্কৃতি খুঁজে পান।
এই টোটেমকে কেন্দ্র করেই নির্ধারণ করা হয় সমাজের পবিত্র বা করণীয় (sacred) ও অপবিত্র বা বর্জনীয় (profane) বিষয়াদি। বিকশিত টোটেম সংস্কৃতি নিজেই একসময় এক ধরনের ধর্মের রূপ পরিগ্রহ করে এবং অন্যান্য ধর্মীয় চর্চাকে এই টোটেমের অধীনস্থ করে ফেলে। যেমন, মুসলিম হিসেবে আপনি হয়তো ইব্রাহিম (আ.)-কে জাতির পিতা হিসেবে ভাববেন, কিন্তু বাংলাদেশের টোটেম সংস্কৃতি আপনাকে জোর করে শেখ মুজিবকেই জাতির পিতা হিসেবে গিলাবে।
১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনা তার মৃত পিতাকে টোটেম হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সব ব্যবস্থা করেছেন, খরচ করেছেন জনগণের ট্যাক্সের হাজার হাজার কোটি টাকা, আদালত থেকে বাগিয়েছেন ‘জাতির পিতা’ হিসেবে রায়, আইন করেছেন তাকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখার। এসব করতে গিয়ে তিনি দানব ফ্যাসিস্ট বনে গেছেন। মুজিবায়ন ও টোটেম সংস্কৃতিকে সর্বত্র দৃশ্যমান করতে শিল্পকলার নাম দিয়ে সারা দেশে স্থাপন করেছেন মুজিবের শত শত মূর্তি, প্রতিষ্ঠা করেছেন মুজিব কর্নার, বানিয়েছেন হাজার হাজার ম্যুরাল। তিনি মুজিব নামের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন শত শত স্থাপনায়! কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো—১. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা; ২. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ, ফরিদপুর; ৩. বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ, সুনামগঞ্জ; ৪. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর; ৫. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ; ৬. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পিরোজপুর; ৭. বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জ; ৮. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়; ৯. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এভিয়েশন ও এরোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, লালমনিরহাট; ১০. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর; ১১. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নারায়ণগঞ্জ (প্রস্তাবিত); ১২. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার, ঢাকা; ১৩. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার, রাজশাহী (নির্মাণাধীন); ১৪. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর নভোথিয়েটার, খুলনা (অনুমোদিত); ১৫. বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার, রংপুর ( প্রস্তাবিত); ১৬. বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার, বরিশাল (প্রস্তাবিত); ১৭. বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার, সিলেট (প্রস্তাবিত); ১৮. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক, গাজীপুর; ১৯. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক, ডুলহাজরা; ২০. বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘর, ঢাকা; ২১. বঙ্গবন্ধু সেনানিবাস, টাঙ্গাইল; ২২. বানৌজা বঙ্গবন্ধু, ক্ষেপণাস্ত্র ফ্রিগেট; ২৩. বঙ্গবন্ধু সেতু; ২৪. বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, ঢাকা; ২৫. বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, ঢাকা; ২৬. বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি, গাজীপুর; ২৭. বঙ্গবন্ধু দ্বীপ; ২৮. বঙ্গবন্ধু অ্যারোনটিক্যাল সেন্টার, কুর্মিটোলা; ২৯. বঙ্গবন্ধু ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, খুলনা; ৩০. বঙ্গবন্ধু উপগ্রহ; ৩১. বঙ্গবন্ধু স্কয়ার, ফরিদপুর; ৩২. বঙ্গবন্ধু উদ্যান, বরিশাল; ৩৩. বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চীন প্রদর্শনী কেন্দ্র, পূর্বাচল; ৩৪. বঙ্গবন্ধু টাওয়ার, ঢাকা; ৩৫. বঙ্গবন্ধু টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, টাঙ্গাইল জেলা; ৩৬. জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারি কলেজ, ঢাকা; ৩৭. জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কলেজ, গাজীপুর জেলা; ৩৮. ফরিদগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ, ফরিদগঞ্জ উপজেলা, চাঁদপুর জেলা; ৩৯. বঙ্গবন্ধু কলেজ, কুমিল্লা জেলা; ৪০. বঙ্গবন্ধু কলেজ, খুলনা; ৪১. বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্ক, (রাজশাহী, সিলেট); ৪২. বঙ্গবন্ধু কলেজ, ঢাকা; ৪৩. বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ, কলারোয়া; ৪৪. বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী জেলা; ৪৫. শিমুলবাড়ী বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ, নীলফামারী জেলা; ৪৬. সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ, গোপালগঞ্জ, বাংলাদেশ; ৪৭. সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ, জামালপুর; ৪৮. বঙ্গবন্ধু ল কলেজ, মাদারীপুর জেলা; ৪৯. সরকারি শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ; ৫০. বঙ্গবন্ধু ডিজিটাল লাইব্রেরি, পটুয়াখালী টাকায় মুজিবের ছবি, গায়ে মুজিব কোট, স্লোগানে ‘আমরা সবাই মুজিবসেনা, ভয় করি না বুলেট-বোমা’, কিংবা ‘এক মুজিব লোকান্তরে, লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে’, বক্তৃতায় মুজিবের প্রশংসার ফুলঝুরি, ইতিহাসে ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’, সিনেমায় ‘Mujib: The Making of a Nation’, গানে ‘তুমি বাংলার ধ্রুবতারা’, আকাশে মুজিব স্যাটেলাইট, বাতাসে মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ, বাইরে তাকালেই মুজিবের মূর্তি, কোনো অফিসে গেলেই মুজিব কর্নার, বিমান থেকে এয়ারপোর্টে নামলেই ‘মুজিব ল্যান্ড’... সব জায়গায় কেবল মুজিব আর মুজিব। মুজিবায়ন থেকে আর কোনো কিছুই বাদ নেই।
এই টোটেম সংস্কৃতি এখন হাজার মানুষের ডিএনএ’তে ঢুকে গেছে। তাদের চিন্তার সবটুকুজুড়ে এই টোটেম। টোটেমের সম্মান রক্ষার্থে অনেকে আবার দানব হয়ে টোটেমবিরোধীদের খুন, জখম, লুণ্ঠন ও গুম করে ফেলে; অনেকে হয়ে ওঠে চরম ফ্যাসিস্ট। তখন এই টোটেমের বাইরে তারা চিন্তা করতে পারে না। লজিক্যাল থিংকিং তখন পরিবর্তিত হয়ে একরোখা যুক্তিবুদ্ধিহীন মাতালে পরিণত হয়। চক্ষু থেকেও তারা অন্ধ হয়ে পড়ে, কারণ তারা নিজেদের অসারতা দেখার ক্ষমতা হারায়। নিজেদের খুন, গুম ও দুর্নীতিকে সমালোচনার পরিবর্তে সেগুলো জাস্টিফাই করে আরো মহোৎসবে চালিয়ে যেতে থাকে। ধর্ষণের মতো মহাপাপকে তারা গ্লোরিফাই করে ‘ধর্ষণের সেঞ্চুরি’ উৎসব পালন করে। চরম মিথ্যাচারকে তারা ধ্রুব সত্যের মতো করে প্রচার চালিয়ে যেতে থাকে। সমাজে এটা তখন ক্যানসারের রূপ পরিগ্রহ করে এবং তার ভয়াল থাবায় আক্রান্ত হয় সমাজের সব প্রতিষ্ঠান ও অঙ্গন। বাকি মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে নিমজ্জিত হয় চরম হতাশা, অমানিশা আর আতঙ্কের মহাসাগরে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ‘চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়াও করিতে পারে না চিৎকার!’
যেহেতু টোটেম সংস্কৃতি অনেকটা পৌত্তলিকতার কাছাকাছি, সেহেতু বড় পৌত্তলিকদের সঙ্গেই তাদের বন্ধুত্ব হয় বেশি। দেশি ও প্রতিবেশী পৌত্তলিকরাই হয় তাদের জানের জান, প্রাণের প্রাণ। এই প্রেমে অন্ধ হয়ে ক্ষমতায় গিয়ে পৌত্তলিকদেরই বসায় নানা গুরুত্বপুর্ণ বিভিন্ন পদে। পৌত্তলিক রাষ্ট্রের বশ্যতা মেনে নেয় অনায়াসে। তখন সম্পর্কটা হয়ে যায় ‘স্বামী-স্ত্রী’র, যেটা তারা নিজেরাই গর্বসহ স্বীকার করে। বড় পৌত্তলিক দাদাদের সংস্পর্শে এলে এদের আদেখলাপনার শেষ থাকে না। তাদের খুশি করতে বিনা পয়সায় দেশের করিডর দিয়ে দেয়, স্থলবন্দর হস্তান্তর করে, ট্রাক ট্রাক ইলিশ পাঠায়, তাদের জন্য দেশের বুক চিরে রেলপথ বানায়। এমনকি এই স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কে এশকে দেওয়ানা হয়ে পুরো দেশকে বিক্রি করে দিতেও এরা কুণ্ঠাবোধ করে না।
সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স হলো, এই মানসিকতা নিয়ে তারা নিজেদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সোল এজেন্ট মনে করে। আর নিজের বাইরের সবাইকে দেশদ্রোহী, জঙ্গি, শিবির, রাজাকার কিংবা রাজাকারের নাতিপুতি ভাবে। এগুলো আবার বক্তৃতা, নাটক, সিনেমা, পার্লামেন্ট, আদালতসহ সব জায়গায় দেদার বলতে থাকে এবং জোর করে প্রতিষ্ঠা করে। কৌটা বানিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করে এবং শুধু নিজেরাই চাকরি, প্রোমোশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নেয়। পুরো দেশ তখন ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’-এর খপ্পরে পড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়।
শুধু আলাদাকরণ (otherizing) করেই ক্ষান্ত হয় না, বরং এই চাপিয়ে দেওয়া নতুন পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেয় নানা নেতিবাচক অর্থ ও অপরাধের ট্যাগ। এরপর চলে চরম ঘৃণার চাষ, যা উপস্থাপন করা হয় ‘চেতনার’ নাম দিয়ে। এ পর্যায়ে শিবির ধরা, শিবিরকে সব ধরনের অপকর্মের জন্য দায়ী করা, শিবিরকে টর্চার করা, এমনকি শিবিরকে মেরে ফেলা শুধু জায়েজ নয়, বরং অনেক প্রশংসনীয় কাজ (sacred) হিসেবে টোটেম সংস্কৃতিতে স্বীকৃতি পায়। আর এই ‘প্রশংসনীয় কাজে’ যারা লিপ্ত হয়, টোটেম সংস্কৃতি তাদের চাকরি, প্রোমোশনসহ নানা পুরস্কারে ভূষিত করে। শিবির ধরা ও মারা তখন ধীরে ধীরে এক অপ্রতিরোধ্য মার্কেট কারেন্সি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সাধারণ ছাত্ররাও তখন ‘শিবির সন্দেহে’ চরম নির্যাতনের শিকার হয়।
এসব নিয়ে একটু উচ্চবাচ্য করলেই টোটেমের অনুসারীদের পক্ষ থেকে আসে দৈহিক ও সাংস্কৃতিক আঘাত। কখনো এরা টর্চার সেল গঠন করে সারা রাত পেটাতে থাকে ভিন্নমতের ছাত্রদের, কখনো অন্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করে গর্বে ফুলেফেঁপে ওঠে। ‘এই টোটেম সংস্কৃতির ছোবলে বলি হয় কখনো আবরার, কখনো আবু বকর, আবার কখনো অবুঝ শিশু!
১৫ বছর ধরে আমরা দেখেছি, এই টোটেম সংস্কৃতির জয়জয়কার, প্যারাডক্স ও নৃশংসতা। অবশেষে দেয়ালে যখন একেবারেই পিঠ ঠেকে গেছে, তখন জেগে উঠেছে বাংলার দামালেরা। ‘আগ্নেয়গিরির লাভার মতো উদ্গীরিত’ হয়ে এরা এক ধাক্কায় এই টোটেম সংস্কৃতির রানিকে স্বামীরবাড়ি দিল্লিতে পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতির বিষাক্ত ডালপালা, শেকড়বাকড় ও অগণিত পত্রপল্লব ছেয়ে আছে বাংলাদেশের সবখানে। সত্যিকার দ্বিতীয় স্বাধীনতার জন্য এগুলোর মূলোৎপাটন একান্ত জরুরি।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই টোটেম সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে বাংলাদেশের ‘জাতির পিতা’ প্রশ্ন!
কয়েক মাস আগে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, তিনি বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির পিতা’ মনে করেন না। এটা নিয়ে কোমল ফ্যাসিস্টরা বেশ লাফালাফি শুরু করেছেন। ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর ডেইলি স্টারে প্রকাশিত হয়েছে মাহফুজ আনামের ‘Hasina’s misrule should not affect our judgement of Bangabandhu’ শীর্ষক কলাম। এখানে তিনি শেখ মুজিবকে ‘giant of history and the supreme leader of our independence movement’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং জুলাই বিপ্লবের ‘ছোকরাদের’ তিনি শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের আয়না দিয়ে শেখ মুজিবকে না দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে উপদেষ্টা নাহিদের উদ্দেশে চিত্রনায়ক সোহেল রানা বলেছেন, ‘আপনাকে অজ্ঞ বলতে বাধ্য করবেন না।’ যাই হোক, জাতির পিতা প্রশ্নের একটা সমাধান প্রয়োজন। এটা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তর আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার। আমি আমার কিছু চিন্তাধারা শেয়ার করছি।
এক.
শেখ মুজিব বাঙালি জাতির পিতা, নাকি বাংলাদেশি জাতির পিতা, সেটা নিয়েই রয়েছে বড় বিতর্ক। যদি বাঙালি জাতির পিতা ধরা হয়, তাহলে সেটা হবে বাস্তবতা এবং ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক দিক দিয়ে অবান্তর। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ফ্রেমে ফেলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতির পিতা হিসেবে শেখ মুজিবকে যতই উপস্থাপন করুক না কেন, তা একদিকে যেমন পশ্চিম বাংলার হিন্দু বাঙালির কাছে অগ্রহণযোগ্য, অন্যদিকে বাংলাদেশে বসবাসরত অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীর কাছেও পরিত্যাজ্য। এটা গেল বাস্তবতা ও ভৌগোলিক সমস্যা।
এবার আসি ঐতিহাসিক সমস্যা নিয়ে। ঐতিহাসিকভাবে যদি কাউকে ‘বাঙালি জাতির পিতা’ হিসেবে অনুসন্ধান করি, তাহলে তিনি হবেন ‘সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ’। বাঙালি একটা স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে রূপ পেয়েছে সুলতানি আমলে, ১৯৭১ সালে নয়। ১৩৫২ সালের দিকে দিল্লির কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের প্রয়োজনীয়তা থেকেই সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলা ভাষাভাষীদের সমন্বয়ে গৌড় ও বঙ্গ রাজ্য একত্রিত করে অখণ্ড স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তার রাজত্বকালেই বাঙালিরা একটি জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ সময় থেকেই বাংলার সব অঞ্চলের অধিবাসী বাঙালি বলে পরিচিত হয় এবং বাংলার বাইরের দেশগুলোও তাদের বাঙালি বলে অভিহিত করে। ইলিয়াস শাহের উপাধি ছিল ‘শাহ ই বাঙ্গালাহ’ / ‘শাহ ই বাঙ্গালী’। হিন্দু রাজাদের আচরণ থেকে একটা ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী একটি কাজ। বাংলার বৃহদাংশ এসব রাজার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজারা নিজেদের গৌড়েশ্বর বা গৌড়রাজ বলতে গর্ববোধ করতেন। কাজেই বাঙালি জাতি ও জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা বা পিতা হিসেবে যদি কাউকে উল্লেখ করতে হয়, তবে তিনি অবশ্যই ‘সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ’, শেখ মুজিব নন।
সুলতান ইলিয়াস শাহ এখানেই থেমে থাকেননি। তিনিই প্রথম ফার্সির পাশাপাশি বাংলা ভাষাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ করেন এবং বাঙালিদের বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। তার আগে হিন্দুরা সংস্কৃত ভাষার চর্চা করত এবং বাংলা ভাষাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও চরম অবহেলা করত। এমনকি হেঁদু ব্রাহ্মণরা ফতোয়া দিয়েছিল, ‘বাংলা ভাষার চর্চা করলে রৌরব নামক নরকে গমন করতে হবে।’ অন্যদিকে এভাবেই একজন মুসলিম শাসকের হাত ধরে ‘বাঙালি জাতি’ ও ‘বাংলা ভাষা’ বিকশিত হওয়া শুরু করে; যদিও এই যুগে দাদারা এই ক্রেডিট নিজেদের বলে দাবি করেন, আর নিজেদের বাঙালি পরিচয় নিয়ে বড় বড় কথা বলেন!
দুই.
একাত্তরে বাঙালি জাতির সৃষ্টি হয়নি, হয়েছে বাংলাদেশি জাতির। বাংলাদেশি জাতির পিতা যদি বলতে হয়, তাহলে শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, যোগেন মণ্ডল, মুজিব, জিয়া, তাজউদ্দীনদের নাম আসতে পারে। ১৯৭১ সালে শেখ মুজিব সর্বপ্রথম পাকিস্তানের কাছে আত্মসমর্পণ করলেও মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের বিষয়ে ইতিহাসে একটা জায়গা আছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের শাসক হিসেবে তিনি হয়ে ওঠেন এক ফ্যাসিবাদের আইকন। তিনিই বাংলাদেশে প্রথম গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সূচনাকারী, আর্টিফিশিয়াল দুর্ভিক্ষ তৈরিকারী, এবং প্রায় ৩০ হাজার জাসদকর্মীর হত্যাকারী। এমনকি তিনি নিজ হাতেও একজনকে চেয়ার দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছেন বলে শ্রুতি আছে।
শেখ মুজিব ছাড়া দুনিয়ায় আর মাত্র ১০টা দেশে ‘জাতির পিতা’ আছে, তবে তাদের কারোরই জীবদ্দশায় কোনো ফ্যাসিবাদের গন্ধ নেই, বরং তারা দেশগঠন ও জাতি বিনির্মাণে অসাধারণ ভূমিকা রেখে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে ইতিহাসে জাজ্বল্যমান হয়ে আছেন। ঐতিহাসিকভাবে একজন ফ্যাসিবাদের আইকন কোনো জাতির পিতা হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না যেমন হিটলার, মুসোলিনি। তাহলে সে হিসেবে শেখ মুজিবের নাম এখান থেকে বাদ যাওয়াটাই ঐতিহাসিক ও যৌক্তিক দাবি। আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবকে পুজনিয় হিসেবে চাপিয়ে দিয়েছে জাতির ঘাড়ে । শেখ মুজিবকে পূজার বেদিতে রেখে বাংলাদেশ থেকে ফ্যাসিবাদ দূর করা যাবে না।
তিন.
বেশ কয়েক বছর আগে বিবিসির বাংলা বিভাগ তার শ্রোতাদের ভোটে শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্বাচিত করেছিল বাংলাদেশের এযাবৎ কালের ‘শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ হিসেবে। বিবিসির এ মতামত যাচাইয়ে (opinion survey) বেশ কিছু পদ্ধতিগত ভুল (methodological error) ছিল। যেকোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য দুটো শর্ত অবশ্য পূরণীয়—নির্ভরযোগ্যতা (reliability) ও বৈধতা (validity) । বিবিসির গবেষণায় পদ্ধতিগত ভুল থাকার কারণে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সব পণ্ডিত যেসব নির্ভরযোগ্যতা এবং বৈধতা-সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন তুলতে বাধ্য, সেগুলো হলো:
১. এ মতামত যাচাইটা ছিল শুধুমাত্র বিবিসির শ্রোতাদের মাঝে সীমাবদ্ধ, যাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ ছিল। ফলে দেশের আপামর জনসাধারণের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না। এটা গবেষণা পদ্ধতির (research methodology) এক মারাত্মক ত্রুটি। এই ত্রুটিকে বলা হয় পরিসংখ্যাগত ত্রুটি (sampling error)। এ ত্রুটি থাকলে গবেষণার ফলটা সাধারণীকরণ (generalize) করা যায় না। অর্থাৎ বিবিসির ওই মতামত যাচাই অনুসারে আমরা বলতে পারি না শেখ মুজিব বাংলার জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত এযাবৎ কালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি; বরং শুধু এতটুকুই বলা যায় শেখ মুজিব শুধু বিবিসির শ্রোতাদের দৃষ্টিতে (যারা মতামত যাচাইয়ে অংশ নিয়েছিলেন) সেরা বাঙালি। মজার ব্যাপার হলো, এ মতামত যাচাইয়ে অধ্যাপক গোলাম আযমের অবস্থান ছিল শেখ মুজিবের কাছাকাছি এবং শেখ হাসিনার অনেক অগ্রে!
২. বিবিসিতে শ্রেষ্ঠ বাঙালি যাচাই হবে, এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছিল প্রচার ও প্রপাগান্ডা। সে সময় আওয়ামী লীগের কর্মীরা খুব সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে শেখ মুজিবকে প্রথম স্তানে রাখার জন্য। এ সক্রিয়তার মধ্যে ছিল—(ক) সব আওয়ামীমনা ও ধর্ম-নিরপেক্ষমনাদের দিয়ে ভোট দেওয়ানো; (খ) একই ব্যক্তি বিভিন্ন নামে বিভিন্ন ইমেইল অ্যাকাউন্ট দিয়ে একাধিক ভোট দেওয়া, যেটা ধরার ক্ষমতা বিবিসির ছিল না; এবং (গ) বিদেশে আওয়ামীমনা পত্রপত্রিকা দিয়ে জনগণের মতামতকে প্রভাবিত করা প্রভৃতি।
এসব কারণে এ মতামত যাচাই (opinion survey) যে বৈজ্ঞানিক বিচারে কোনো নির্ভরযোগ্য এবং বৈধ পদ্ধতি (method) ছিল না, তা গবেষণা পদ্ধতিতে (research methodology) যাদের ন্যূনতম জ্ঞান আছে, তারা স্বীকার করতে বাধ্য। কাজেই বিবিসির ওপর ভর করে শেখ মুজিবকে ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ বলাটা হাস্যকর বিষয় ছাড়া কিছুই নয়।
লেখক : অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি, সিঙ্গাপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

