আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সিএসআর ব্যয়ের নীতিমালা জরুরি

মো. মোত্তাসিম বিল্লাহ

সিএসআর ব্যয়ের নীতিমালা জরুরি

করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) হলো একটি প্রতিষ্ঠানের এমন নীতি ও প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোম্পানি বা সংস্থা সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে। এটি এমন একটি আধুনিক ধারণা, যেখানে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড শুধু লাভ অর্জনে সীমাবদ্ধ না থেকে, সমাজ ও পরিবেশের কল্যাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, যুব উন্নয়ন এবং নারী ক্ষমতায়নে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগে অর্থায়ন করছে। তবে দেশের বাস্তবতায় করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা এখনো সমন্বিত উন্নয়নের মূলধারায় সম্পূর্ণরূপে অন্তর্ভুক্ত হয়নি এবং সিএসআরকে সফলভাবে মূলধারায় নিয়ে আসতে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সিএসআর খাতে প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর বার্ষিক ব্যয়ের কোনো কেন্দ্রীয়, স্বচ্ছ ও যাচাই করা তথ্য নেই। বিভিন্ন গবেষণা ও মিডিয়া সূত্রে অনুমান করা যায়, বাংলাদেশের প্রাইভেট সেক্টরে (ব্যাংক ও আর্থিক খাত বাদে) বার্ষিক সিএসআর ব্যয় প্রায় ৪০০-৭০০ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। বড় প্রাইভেট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সিএসআর ব্যয়ের পরিমাণ, খাতভিত্তিক ব্যয় এবং কার্যক্রমের বিস্তার সাধারণত প্রকাশ করে না বা তা তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করে না। ফলে, বাংলাদেশের সিএসআর ব্যয়ের পরিমাণ নির্ভরযোগ্যভাবে জানা সম্ভব হয় না। তবে তুলনামূলক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে সিএসআর-সংক্রান্ত তথ্য আরো স্বচ্ছভাবে প্রকাশিত হয়, যার ফলে এ খাতে সিএসআর ব্যয় সম্পর্কে পরিষ্কার ও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে প্রতিবছর বেসরকারি খাতের করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক খাত মিলে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা সিএসআর খাতে ব্যয় করে। যদি পরিকল্পিতভাবে সিএসআর কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে এই পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

দেশে সিএসআর ব্যয়-সংক্রান্ত কোনো কার্যকর ও নিয়মিত সরকারি মনিটরিং বা রিপোর্টিং কাঠামো নেই। এই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতির কারণে এ ব্যয়ের প্রকৃত সামাজিক প্রভাব সর্বত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান সিএসআর কার্যক্রমকে প্রকৃত সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে নয়, বরং ব্র্যান্ডিং ও করপোরেট ইমেজ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় বাদে অন্য নন-ফাইন্যান্সিয়াল প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর ৪০০-৭০০ কোটির কোনো বিস্তারিত খাতভিত্তিক বিভাজনের বর্ণনা পাওয়া যায় না। এত বড় অঙ্কের অর্থব্যয়ের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না থাকা নীতিগতভাবে উদ্বেগজনক। কারণ, সিএসআর ব্যয় একটি প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ, যা জনসাধারণের উপকারে আসা উচিত। অথচ যখন অর্ধেকের মতো অর্থব্যয়ের বিস্তারিত খাতের তথ্য অনুপস্থিত থাকে, তখন এ অর্থ প্রকৃতপক্ষে কোনো সমাজ-উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে ব্যয় হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এটি শুধু জবাবদিহির ঘাটতির ইঙ্গিত দেয় না, বরং সিএসআর কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতার ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তোলে। তাই নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি অগ্রাধিকারযোগ্য বিষয় হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে সিএসআর ব্যয়ের প্রতিটি খাত নির্দিষ্টভাবে প্রকাশ করা হয় এবং সামাজিক প্রভাব নিরূপণের ব্যবস্থা জোরদার করা যায়।

সুতরাং, একটি জাতীয় সিএসআর কর্তৃপক্ষ বা কাউন্সিল গঠন করে এনজিও ও করপোরেট সিএসআর খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং বিশ্বাসযোগ্য অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এর ফলে তহবিল ব্যবহারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, দ্বৈত ব্যয় কমবে, বেশিসংখ্যক সুবিধাবঞ্চিত মানুষ সেবার আওতায় আসবে এবং প্রকৃত সামাজিক প্রভাব বৃদ্ধি পাবে, যা জাতীয় সামষ্টিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে সিএসআরের কোনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতি বা ফ্রেমওয়ার্ক এখনো গৃহীত হয়নি। ফলে নীতিমালার আলোকে মুনাফার কত শতাংশ সিএসআর বাবদ ব্যয় হবে, কোন খাতে তা ব্যয় হবে, কীভাবে তা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং হবে, কার কাছে জবাবদিহি করতে হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। বর্তমানে করপোরেট সিএসআর কার্যক্রম অনেকাংশেই ব্যক্তি বা সম্পর্কনির্ভর, যা পরিকল্পিত ও অংশীদারত্বভিত্তিক নয়। অধিকাংশ করপোরেট হাউস নিজেদের পরিচালিত ট্রাস্টের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে সিএসআর কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু এই ট্রাস্টের অনেকগুলোরই উচ্চমানের কার্যক্রম বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই।

এই বাস্তবতায় সিএসআর কার্যক্রমকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনায় এনে একটি জাতীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও বাধ্যতামূলক নীতিমালা প্রণয়ন সময়ের দাবি।

লেখক : প্রোগ্রাম ম্যানেজার, লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক চ্যারিটি সংস্থা, ঢাকা, বাংলাদেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন