নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের নাম এরই মধ্যে অনুমোদন করেছে দিল্লি। তিনি অক্টোবরের শেষদিকে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন। এমন একসময়ে তিনি দায়িত্ব নিচ্ছেন, যখন ঢাকা ও দিল্লি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারতে সম্ভাব্য সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা, যার নেতৃত্ব নতুন রাষ্ট্রদূতই দেবেন।
নতুন দূতের আগমনের মধ্য দিয়ে ভারতে বাংলাদেশের বর্তমান হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহর মেয়াদ শেষ হবে। তিনি ১৮ মাস ধরে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার এই মেয়াদকাল সংক্ষিপ্ত হলেও এটি ছিল সম্ভবত তার কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারণ, ২০২৪ সালের ‘জুলাই অভ্যুত্থান’-পরবর্তী উত্তেজনাকর পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
নয়াদিল্লিতে বড় ধরনের কূটনৈতিক, নীতিনির্ধারণী ও গণমাধ্যমকেন্দ্রিক আয়োজনে কিংবা ভারত-বাংলাদেশবিষয়ক প্রকাশ্য আলোচনায় সব ক্ষেত্রেই তাকে সামনের সারিতে দেখা যেত। প্যানেলিস্টদের মধ্যে যখন উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলত, তখন তাকে প্রায়ই গভীর মনোযোগ দিয়ে নোট নিতে দেখা যেত। একজন বাংলাদেশি কূটনীতিকের ভারতে কাটানো ১৮ মাসের সময়কে তার রেখে যাওয়া বিভিন্ন নথিপত্র ও কর্মকাণ্ডের, যেমন বক্তৃতা, রেকর্ড করা উপস্থিতি, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট এবং বিভিন্ন আয়োজনের ফাঁকে হওয়া কথোপকথনের আলোকে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
কূটনীতির এক আপাত-বৈপরীত্য
হাইকমিশনারকে, বিশেষ করে যখন তিনি কোনো বিষয়ে মুখ খুলতেন বা দিল্লিতে কোনো প্রকাশ্য কর্মসূচিতে অংশ নিতেন, তখন যে প্রশ্নটি না করে পারা যেত না, তা হলো—পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন ক্ষেত্র কোনটি ছিল—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নাকি নিরাপত্তাসংক্রান্ত? প্রায়শই তিনি ‘কূটনীতির আপাত-বৈপরীত্য’ (প্যারাডক্স অব ডিপ্লোমেসি)-এর কথা বলতেন। তিনি এমন একটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করতেন, যা হয়তো সবচেয়ে কঠিন হওয়ার কথা ছিল, অথচ তা বাস্তবায়ন করা ছিল সহজ, আর সেটি হলো নিরাপত্তা।
ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, নিরাপত্তাবিষয়ক আস্থা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করে। নেপালে মাওবাদী বিদ্রোহের (১৯৯৬-২০০৬) সময় বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। তখন রাজনৈতিক পর্যায়ে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সম্পর্ক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করেছিল। ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও হয়তো একই চিত্র দেখা গেছে, তবে নিরাপত্তার বিশাল পরিসরে, বিশেষ করে সীমান্ত অবকাঠামো নিয়ে কিছু বিষয় এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
সম্প্রতি নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে আয়োজিত ‘বিল্ডিং রেজিলিয়েন্ট রিলেশনস : পিপল অ্যাজ স্টেকহোল্ডারস’ (দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলা : অংশীজন হিসেবে জনগণ) শীর্ষক এক বক্তৃতায় হামিদুল্লাহ ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে জনগণের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করেন। এ সময় তিনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিজের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এবং পথে দেখা হওয়া মানুষদের কথা তুলে ধরেন।
তার সংক্ষিপ্ত কর্মকালে তিনি চারবার উত্তর-পূর্ব ভারত ভ্রমণ করেছেন, যার মধ্যে সর্বশেষটি ছিল সম্ভবত গৌহাটি থেকে আগরতলা পর্যন্ত ট্রেন ভ্রমণ। এই ভ্রমণের বিবরণ তিনি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ‘এক্স’-এ শেয়ার করেছিলেন। বিমানে মাত্র ৫০ মিনিটের যাত্রাপথের পরিবর্তে ১৫ ঘণ্টার দীর্ঘ ট্রেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘দীর্ঘ এই যাত্রা ছিল যেন সময়ের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ। আমি জানালার দিকে তাকিয়েই ছিলাম, চোখে পড়ছিল ছোট-বড় নদী-নালা, চা-বাগান আর প্রকৃতির বিচিত্র সব রূপ। মাইলের পর মাইল এলাকা জুড়ে মানুষের কোনো পদচিহ্ন নেই, এক অনন্য ও অক্ষত জীববৈচিত্র্য।’
পাশ্চাত্যের ভ্রমণকারীরা তাদের স্মৃতিকথায় প্রায়ই এমন অভিজ্ঞতার কথা লিখে থাকেন, তবে প্রতিবেশী কোনো দেশের প্রতিনিধির কাছ থেকে পাওয়া এমন বিবরণ বিষয়টিকে আরো ব্যক্তিগত ও আন্তরিক করে তোলে। তবে ভ্রমণও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে কার্যকর কূটনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা অনেক বদ্ধমূল ধারণা বা ‘ধ্রুব সত্য’ নিয়ে আলোচনার সুযোগ করে দেয় এবং সময়ের সঙ্গে উভয় পক্ষের মধ্যে গড়ে ওঠা দ্বিধা বা জড়তা কমাতে সাহায্য করে। ‘ভারত-কাহিনি’র (ইন্ডিয়া স্টোরি) সঙ্গে জড়িয়ে আছেন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ভারতে আসা অনেক কূটনীতিক, যাদের ভারত-ভ্রমণ হয়তো ছিল স্বল্পস্থায়ী, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার রেশ রয়ে গেছে দীর্ঘকাল।
সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরেও হামিদুল্লাহর ভারত-কাহিনিতে সংগীতশিল্পী জুবিন গার্গের প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে উঠে আসে। গত মার্চে বাংলাদেশের জাতীয় দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় তিনি এই শিল্পীর কথা স্মরণ করে বলেন, ‘আমি একজন ভারতীয় বন্ধুর কথা খুব অনুভব করছি, যার সঙ্গে গত জুলাই মাসে গৌহাটিতে আমার দেখা হয়েছিল, তিনি হলেন জুবিন গার্গ। জুবিন আমাকে কথা দিয়েছিলেন, তিনি এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করবেন। দুটি জাতীয় সংগীতের রচয়িতাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’
গার্গ ছিলেন আসামের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও সুরকার, যিনি গত বছরের সেপ্টেম্বরে সিঙ্গাপুরে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর মারা যান। হামিদুল্লাহ জুবিনের মতোই ভারতীয় সংগীতের কিংবদন্তি ও আসামের মানুষ ভূপেন হাজারিকার কথাও স্মরণ করেন। তার সংগীত দুই দেশেই সমাদৃত।
সাহিত্য ও সংগীত জগতের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বরা যদি ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে থাকেন, তবে জুবিনের মতো সমসাময়িক শিল্পীরাও সীমান্ত পেরিয়ে একই ধরনের বন্ধন গড়ে তোলার ধারা অব্যাহত রেখেছেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যকার রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে উভয় পক্ষের যে ধারণা বা উপসংহার তৈরি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এই যৌথ ঐতিহ্যের ধারা কি অব্যাহত থাকবে?
প্রজন্মগত পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক মূলত জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, কিন্তু তা রাজনৈতিক বোঝাপড়ায় পরিবর্তনের কারণে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক সরকার বা শাসনব্যবস্থা যা-ই হোক না কেন, এই সম্পর্কের মূলে থাকেন সাধারণ মানুষ। তবে এর অর্থ এই নয় যে, জনমানসে গড়ে ওঠা ধারণায় যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা উপেক্ষা করা যাবে। দীর্ঘ মেয়াদে ধীরে ও নীরবে ঘটলেও গত দুই বছরে আলোচনার মোড় বা বয়ানের এই পরিবর্তনটি অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এরই মধ্যে এ অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহে নতুন প্রজন্মের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে, যা নিঃসন্দেহে পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশ থেকে নেপাল—সর্বত্রই ইতিহাস কিছুটা আড়ালে চলে যাচ্ছে এবং অতীত-ভারমুক্ত, বর্তমান-কেন্দ্রিক নতুন অংশীদারত্ব প্রাধান্য পাচ্ছে। বিশেষ করে জনমিতিক পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে বর্তমান পরিস্থিতি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর একটি উদাহরণ হলো—বাংলাদেশের জনসংখ্যার মধ্যম বয়স (মেডিয়ান এজ) ২৬ বছর। এই বয়সসীমার মানুষের প্রভাব এ বছরের সাধারণ নির্বাচনে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল, যা অনেকটা নেপালের পরিস্থিতির মতোই।
কৌতূহল জাগানিয়া বিষয় হলো, নেপাল বা বাংলাদেশ—দুদেশেরই নতুন প্রজন্মের তরুণদের সঙ্গে আলাপচারিতায় মনে হয়, তারা ‘ইতিহাসের বোঝা’ বয়ে বেড়ানোর চেয়ে বর্তমানকে গুরুত্ব দিতেই বেশি আগ্রহী। পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক আলোচনায় এ বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। তবে এ কথাও সত্য, সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিহাস এখনো কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে এবং বর্তমান সময় নতুন সুযোগ তৈরি করে দেয়। তাই উভয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, পরিবর্তনের ধারায় পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক পর্যবেক্ষকদের এমন একটি নতুন প্রজন্মের প্রয়োজন হতে পারে, যারা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে পরিবর্তনকামী তরুণদের প্রত্যাশা ও ভাবনাগুলো অনুধাবন করতে সক্ষম। এদিকে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন আলোচনা, মতপার্থক্য ও কূটনৈতিক মতবিরোধের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে, তখন একজন কূটনীতিকের বক্তব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শুধু কূটনৈতিক চ্যানেলের ওপর নির্ভর করে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়।
দ্য প্রিন্ট অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

