আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা

ড. মো. আমিরুল ইসলাম

বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা

আত্মহত্যা বা আত্মহনন হচ্ছে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়াবিশেষ। ল্যাটিন ভাষায় সুই সেইডেয়ার থেকে আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে নিজেকে হত্যা করা। চিকিৎসকগণ আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে মানসিক অবসাদজনিত গুরুতর উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।

ইতোমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশেই আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে এক ধরনের অপরাধরূপে ঘোষণা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশগুলিতে আত্মহত্যা আর অপরাধ নয়। তবে, অধিকাংশ মুসলমান-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলিতে এটি একটি মারাত্মক অপরাধ।

ইউরোপের কোনও দেশ আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে অপরাধ বলে মনে করা হয় না। ইংল্যান্ড ও ওয়েলস আত্মহত্যার আইন ১৯৬১ এবং রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ডের মাধ্যমে ১৯৯৩ সালে আত্মঘাতী হত্যাকাণ্ডকে অপরাধ থাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল।

দেশে আত্মহত্যার নীরব মহামারি চলছে। তবে বিষয়টি নিয়ে সরকারি–বেসরকারি স্তরে আশ্চর্য নীরবতা দেখা যায়। আত্মহত্যা এবং এর চেষ্টাকে এখনো অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। একে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে। আর সেই অনুযায়ী এর প্রতিরোধে কাজ করতে হবে আমাদের সকলের।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়,স্কুল কলেজ তথা বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০২১ সালে প্রায় ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। দেখা গেছে, আত্মহত্যাকারীদের ৬০ শতাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আর আত্মহত্যার প্রবণতা নারী শিক্ষার্থীদের চেয়ে পুরুষদের মধ্যে অনেক বেশি।

অনেক দেশে আত্মহত্যার হার মধ্যবয়স্ক বা বয়স্কদের মধ্যে সর্বোচ্চ। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৮০ বছরের চেয়ে বেশি বয়স্ক ককেশিয়ান পুরুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, যদিও যুবক যুবতীরা প্রায়ই আত্মহত্যার চেষ্টা করে। এটি কিশোর কিশোরীদের মধ্যে মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাধারণ কারণ এবং অল্পবয়সী ছেলেদের মধ্যে দ্বিতীয়টি দুর্ঘটনা জনিত মৃত্যুর কারণ বলে ধারণা করা হয়। উন্নত বিশ্বের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে এটা প্রায় ৩০% মৃত্যুর কারণ। উন্নয়নশীল বিশ্বে এর হার অনুরূপ। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, আত্মহত্যা থেকে মৃত্যুর হার বয়স্ক মহিলাদের তুলনায় অল্পবয়সী নারীদের মধ্যে বেশি হারে দেখা যায়।

উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রায় ৭৫% আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। আত্মহত্যার সবচেয়ে বড় সংখ্যক দেশ চীন এবং ভারত, মোট অর্ধেকেরও বেশি। চীনে আত্মহত্যা জনিত মৃত্যু হল ৫ম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আত্মহত্যা প্রবণতার ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। বাংলাদেশে প্রতি বছর কমপক্ষে ১৩ হাজার থেকে ৬৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। দেশে আত্মহত্যায় মৃত্যুহার প্রতি লাখ মানুষে কমপক্ষে ৭ দশমিক ৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৬ জন। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। ওই আট মাসে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৯৪ শতাংশ স্কুলগামী শিক্ষার্থী।

ধর্মীয় দৃষ্টিকন থেকে আত্মহত্যা :

খ্রিস্টধর্মের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আত্মহত্যা একটি পাপ বলে মনে করা হয়, ক্যাথলিক মতবাদে আর্গুমেন্টটি "তুমি নিজেকে হত্যা করোনা" (ম্যাথু ১৯:১৮ যিশুর নতুন চুক্তির অধীন প্রযোজ্য),সেইসাথে ধারণা করা হয় যে জীবন ঈশ্বরের দ্বারা প্রদত্ত একটি উপহার, যা নষ্ট হওয়ার নয়।

ইসলামী ধর্মীয় মতামত আত্মহত্যার বিরুদ্ধে। কুরআন "নিজেকে খুন করো না বা ধ্বংস করো না" বলে এটা নিষেধ করেছে।হাদিসগুলি স্বতন্ত্রভাবে বলেছে আত্মহত্যা করা বেআইনি এবং মহাপাপ। হিন্দুধর্মে আত্মহত্যাকে ঘৃণা করা হয় এবং সমসাময়িক হিন্দু সমাজে আত্মহত্যাকে অন্যকে হত্যা করার সমান পাপ বলে মনে করা হয়।

বিভিন্ন গবেষণায় আত্মহত্যার বেশিরভাগ কারণ দেখা যায় যে, প্রায় ২৭% থেকে ৯০% এরও বেশি সময় আত্মহত্যার সাথে মানসিক অসুখের সম্পর্ক থাকে ।এশিয়াতে, মানসিক রোগের হার পশ্চিমা দেশের চেয়ে অনেক কম।যাদেরকে সাইকিয়াট্রিক ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে তাদের পূর্ণ আত্মহত্যার ঝুঁকি রয়েছে ৮.৬%। আত্মহত্যার মাধ্যমে মারা যায় তাদের প্রায় অর্ধেকের মধ্যে জটিল ডিপ্রেশন থাকতে পারে, বা অন্য কোনও মানসিক রোগ যেমন বাইপোলার ডিসঅর্ডার আত্মহত্যার জন্য ২০ গুণের বেশি ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যান্য অবস্থার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত সিজোফ্রেনিয়া (১৪%)، ব্যক্তিত্বের রোগ (৮%)،এবং ট্রোমাউত্তর স্ট্রেস ডিসঅর্ডার।

মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায় যেমন-হতাশা, জীবনের আনন্দ হারিয়ে ফেলা, বিষণ্ণতা এবং উদ্বিগ্নতা। সমস্যা সমাধান করার ক্ষমতা কমে যাওয়া, ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া যা আগে ছিল এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা।

নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে দেখা যায় যে, মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে ৮৭% থেকে ৯৮% আত্মহত্যাকর্ম সংঘটিত হয়। এছাড়াও, আত্মহত্যাজনিত ঝুঁকির মধ্যে অন্যান্য বিষয়াদিও আন্তঃসম্পৃক্ত। তন্মধ্যে - নেশায় আসক্তি, জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে না পাওয়া।

সাম্প্রতিক জীবনের চাপ যেমন-পরিবারের সদস্য বা বন্ধুকে হারানো , চাকরির ক্ষতি বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা (যেমন একা বেঁচে থাকা) আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। যারা বিয়ে করেনি তারাও আরও ঝুঁকিপূর্ণ। ধার্মিক হওয়ার ফলে আত্মহত্যার ঝুঁকি কমে যায়। এটি ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে হয়েছে যা অনেক ধর্ম আত্মহত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং অধিকতর যৌক্তিকতা ধর্ম দিতে পারে। মুসলমানদের মধ্যে যারা ধার্মিক তাদের মধ্যে আত্মহত্যার নিম্ন হার আছে বলে মনে হয়, তবে এই সমর্থনকারী তথ্য শক্তিশালী নয়। আত্মহত্যার চেষ্টার হারের মধ্যে কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না।

প্রহসন বা কুসংস্কার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কেউ কেউ নিজের জীবন নিতে পারে। শৈশবের যৌন নির্যাতন এবং সৎ পিতামাতার যত্নে লালিত পালিত হওয়ার ফলেও আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যৌন নিপীড়ন সামগ্রিক ঝুঁকির মধ্যে প্রায় ২০% অবদান রাখে বলে বিশ্বাস করা হয়।

আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব, দরিদ্রতা, গৃহহীনতা এবং বৈষম্যতাজনিত উপাদানগুলো আত্মহত্যায় উৎসাহিত করে থাকে। দারিদ্র্য সরাসরি আত্মহত্যার সাথে জড়িত নয়। কিন্তু, এটি বৃদ্ধির ফলে আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং উদ্বেগজনিত কারণে আত্মহত্যার উচ্চস্তরে ব্যক্তি অবস্থান করে।বর্তমানে প্রেমে ব্যর্থতা বা প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়ে চলেছে। পরিবার বা সমাজ স্বীকৃতি না দেওয়ায় প্রেমিক যুগলের সম্মিলিত আত্মহত্যার ঘটনাও প্রায়ই ঘটছে।

এসব কিছু বাবা মা কে তার সন্তানদের যথেষ্ঠ নজর রাখতে হবে সেইসাথে সন্তানদের নানাবিধ ব্যাক্তিগত,সামাজিক ও মানসিক সমস্যা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ও সহজ করে সমাধান করতে হবে।

লেখক: ড.মো.আমিরুল ইসলাম, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ভাইস চেয়ারম্যান, নূর ই সামাদ নার্সিং কলেজ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন