একসময় কোনো খবর জানতে মানুষকে অপেক্ষা করতে হতো সংবাদপত্র, রেডিও কিংবা টেলিভিশনের জন্য। এখন সেই অপেক্ষার দিন শেষ। একটি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের খবর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাই আধুনিক মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু তথ্যের এই অবাধপ্রবাহ আমাদের সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিভ্রান্তির এক নতুন জগতেও ঠেলে দিতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সহজলভ্যতা ও গতি। যেকোনো ঘটনা ঘটার মুহূর্তেই তার ছবি, ভিডিও কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ছড়িয়ে পড়তে পারে। দুর্যোগের সময় মানুষের কাছে জরুরি তথ্য পৌঁছে দেওয়া, হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি কিংবা সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি—এসব ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে সমাজে ইতিবাচক অনেক প্রভাব পড়েছে। এছাড়া অনেক সময় প্রচলিত গণমাধ্যমে জায়গা না পাওয়া মানুষের কথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
তবে এই শক্তির বিপরীত দিকও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য প্রকাশের জন্য সাংবাদিকতা, সম্পাদনা কিংবা তথ্য যাচাইয়ের বাধ্যতামূলক কোনো প্রক্রিয়া নেই। ফলে সত্য তথ্যের পাশাপাশি গুজব, মিথ্যা খবর, বিভ্রান্তিকর ছবি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্যও একই গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। একটি মিথ্যা তথ্যের নিচে যদি হাজার হাজার মানুষ মন্তব্য করে বা সেটি শেয়ার করে, তাহলে অনেকের কাছে সেটিই সত্য বলে মনে হতে পারে। এছাড়া অপসাংবাদিকতার কারণেও ভুয়া তথ্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—মানুষ সাধারণত এমন তথ্যই সহজে গ্রহণ করে, যা তার পূর্বধারণা বা বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী একই ধরনের কনটেন্ট বারবার সামনে নিয়ে আসে। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে এমন একটি তথ্যবলয়ের মধ্যে আটকে যেতে পারে, যেখানে ভিন্নমত বা ভিন্ন তথ্য তার চোখেই পড়ে না। এতে সমাজে মতপার্থক্য শুধু বাড়েই না, পারস্পরিক সহনশীলতাও কমে যেতে পারে।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে বিভ্রান্তির এই ঝুঁকি আরো জটিল হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এখন এমন ছবি, ভিডিও কিংবা অডিও তৈরি করা সম্ভব, যা দেখে বা শুনে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল-নকল বোঝা কঠিন। বিভিন্ন ভুয়া কনটেন্ট, পণ্যের বিজ্ঞাপন এবং জুয়ার ওয়েবসাইটেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবাধ ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তি রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক ঘটনা কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয়কে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি করেছে। কনটেন্ট ভাইরাল করার জন্য অনেক অপসাংবাদিক চাঞ্চল্যকর হেডলাইন দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ভুয়া নিউজ ছড়িয়ে থাকে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার জনমতকে প্রভাবিত করার একটি বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দ্রুত ডিজিটালাইজেশনের পথে থাকা দেশে বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। বিপুলসংখ্যক তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন। তাদের কাছে এটি যেমন শিক্ষা, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি যাচাইহীন তথ্যের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। কোনো গুজবকে কেন্দ্র করে সামাজিক উত্তেজনা তৈরি হওয়া কিংবা পুরোনো ছবি-ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা—এসব ঘটনা আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বিভ্রান্তির কারখানা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ নেই। কারণ সমস্যাটি মাধ্যমের অস্তিত্বে নয়, বরং আমরা কীভাবে সেটি ব্যবহার করছি, তার মধ্যে। একটি ছুরি যেমন রান্নার কাজে প্রয়োজনীয়, আবার ভুল ব্যবহারে ক্ষতিকর হতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও তেমনই একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এছাড়া বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়া জীবনযাপন করা প্রায় অসম্ভব।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রয়োজন ‘মিডিয়া লিটারেসি’ বা গণমাধ্যম-সচেতনতা। কোনো খবর দেখেই শেয়ার করার আগে তার উৎস যাচাই করা, প্রকাশের তারিখ দেখা, একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে একই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করা এবং সন্দেহজনক ছবি বা ভিডিও সম্পর্কে সতর্ক থাকা—এসব অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শুধু ব্যবহারকারীর সচেতনতাই নয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের হাতে তথ্যের দরজা খুলে দিয়েছে। এখন সেই দরজা দিয়ে আমরা জ্ঞান গ্রহণ করব, নাকি বিভ্রান্তির শিকার হব—তা অনেকটাই নির্ভর করছে আমাদের সচেতনতার ওপর। তথ্যের অবাধ প্রবাহ তখনই আশীর্বাদ হয়ে উঠবে, যখন তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতিও সমানভাবে শক্তিশালী হবে। নইলে যে মাধ্যম মানুষকে সত্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা, সেটিই একদিন সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা মুছে দিতে পারে।
ইডেন মহিলা কলেজ
rifatjahanrifa123@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

