আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভারত থেকে কীভাবে মাদকদ্রব্য ঢোকে বাংলাদেশে

প্রফেসর ড. এম এ রাশিদ

ভারত থেকে কীভাবে মাদকদ্রব্য ঢোকে বাংলাদেশে

ভারত থেকে বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য প্রবেশ করার প্রক্রিয়া সাধারণত সীমান্ত এলাকায় অবৈধ কার্যকলাপের মাধ্যমে ঘটে। এর মধ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করে চোরাচালান চক্র এবং দুর্বল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। নিচে এর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো-

১. সীমান্ত চোরাচালান

বিজ্ঞাপন

অবৈধ পথে প্রবেশ : ভারত ও বাংলাদেশের ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা বিভিন্ন স্থানে অরক্ষিত বা অসম্পূর্ণ। চোরাচালানকারীরা এসব স্থানে নদীপথ, জঙ্গলের পথ এবং পাহাড়ি অঞ্চল ব্যবহার করে।

রাতের সময় পরিবহন : রাতে সীমান্ত পারাপারের ঝুঁকি কম থাকে বলে চোরাচালানকারীরা এ সময় মাদক পরিবহন করে।

গোপন চোরাচালানের উপায় : খাদ্যদ্রব্য, পণ্য পরিবহন বা গবাদিপশু ব্যবসার আড়ালে মাদক চোরাচালান করা হয়।

২. মাদকদ্রব্যের ধরন

ফেনসিডিল : ফেনসিডিল ভারতের কারখানাগুলো থেকে অবৈধভাবে তৈরি এবং বাংলাদেশে চোরাচালান হয়।

ইয়াবা : যদিও ইয়াবা মিয়ানমার থেকে আসে, তবে ভারতের মধ্য দিয়ে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে।

গাঁজা ও হেরোইন : ভারতে উৎপাদিত বা আফগানিস্তান থেকে আসা হেরোইন ভারতীয় চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশে পৌঁছে।

৩. কৌশল

স্থানীয় সহযোগিতা : সীমান্ত এলাকার কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত স্থানীয় ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ চোরাচালানকারীদের সহযোগিতা করে।

ঘুষ প্রদান : সীমান্তরক্ষী বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্য ঘুসের বিনিময়ে এসব কার্যক্রমে চোখ বন্ধ করে থাকে।

স্থানান্তর : মাদককে ছোট ছোট দলে ভাগ করে স্থানান্তর করা হয়, যাতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কমে।

৪. বাংলাদেশে প্রবেশের পর

০ মাদকগুলো স্থানীয় চোরাচালান চক্রের মাধ্যমে বড় শহরগুলোয় পৌঁছায়।

০ সড়ক, নদীপথ এবং ট্রেন ব্যবহার করে এসব মাদক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

৫. প্রতিরোধে করণীয়

০ সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো।

০ স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের সহযোগিতা নিশ্চিত করা।

০ সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা ও জবাবদিহি বাড়ানো।

০ মাদকদ্রব্যের উৎস দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ।

এই সীমান্তের বৈশিষ্ট্য এবং চোরাচালানের পদ্ধতি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো

সীমান্তের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য

১. নদীপথ

০ সীমান্ত এলাকায় বেশ কয়েকটি নদী প্রবাহিত হয়। যেমন : গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মা। এই নদীগুলো চোরাচালানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

০ নৌকাযোগে বা ভাসমান প্লাস্টিক বা কাঠের বাক্স ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য পরিবহন করা হয়।

২. জঙ্গলের পথ

০ পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং আসাম সীমান্তে ঘন জঙ্গল রয়েছে।

০ চোরাচালানকারীরা এই জঙ্গলকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে নিরাপদে মাদকদ্রব্য স্থানান্তর করে।

এমবি

৩. পাহাড়ি অঞ্চল

চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরা অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা চোরাচালানের জন্য সুবিধাজনক।

০ এই এলাকাগুলোয় প্রায়ই সীমান্ত রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকে না।

অরক্ষিত সীমান্ত এবং চোরাচালানের সুযোগ

৪. আনুষ্ঠানিক চেকপোস্টের অভাব

০ সীমান্তের অনেক জায়গায় আনুষ্ঠানিক চেকপোস্ট নেই।

০ সীমান্তরক্ষীদের টহল দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত, বিশেষ করে রাতের বেলায়।

৫. প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা

০ সীমান্তের কিছু এলাকায় নদী, জলাভূমি এবং দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থাকায় নিয়মিত টহল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

৬. স্থানীয় যোগাযোগ এবং নেটওয়ার্ক

০ সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা প্রায়ই চোরাচালানকারীদের সহায়তা করে, কারণ এতে তারা অর্থনৈতিক সুবিধা পায়।

নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ

০ দীর্ঘ সীমান্তে নজরদারি করা কঠিন।

০ সীমান্তের উভয় পাশেই কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা চোরাচালানকারীদের সহায়তা করে।

০ সীমান্ত অঞ্চলে উন্নত প্রযুক্তি এবং পর্যাপ্ত মানবসম্পদের অভাব।

প্রতিরোধের উপায়

০ সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর জন্য ড্রোন এবং থার্মাল ক্যামেরার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার।

০ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের চোরাচালানবিরোধী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

০ ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন।

এই অরক্ষিত সীমান্ত এলাকাগুলোকে সুরক্ষিত করা গেলে মাদকদ্রব্যের চোরাচালান কমানো সম্ভব।

ভারত থেকে বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য ঢুকতে ভারতের বিএসএফ জড়িত

ভারত থেকে বাংলাদেশে মাদক চোরাচালানে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) উভয়েই মাদক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীল। তবে, বিভিন্ন সময় ভারতের বিএসএফের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে চোরাচালানকারীদের সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছে। নিচে এর বিশদ আলোচনা দেওয়া হলো

বিএসএফের ভূমিকা এবং চোরাচালানের অভিযোগ

১. চোরাচালানকারীদের সহযোগিতা

০ কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে যে বিএসএফের সদস্যরা চোরাচালানকারীদের কাছ থেকে ঘুস গ্রহণ করে এবং তাদের চোরাচালান কার্যক্রমে সাহায্য করে।

০ সীমান্তে দুর্বল নজরদারি বা কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমে মাদকদ্রব্য প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়।

৩. অর্থনৈতিক লাভের প্রলোভন

০ মাদক চোরাচালান একটি উচ্চ মুনাফার ব্যবসা হওয়ায় কিছু সদস্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

প্রতিরোধের প্রস্তাবনা

১. দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

০ ভারতের সীমান্তরক্ষীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দ্রুত তদন্ত এবং বিচার করতে হবে।

০ দুর্নীতির জন্য শাস্তি আরো কঠোর করা উচিত।

২. প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধি

০ স্মার্ট সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করা।

০ সন্দেহভাজন কার্যক্রম শনাক্ত করতে আরো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার।

৩. সচেতনতা এবং প্রশিক্ষণ

০ ভারতের বিএসএফ সদস্যদের জন্য নৈতিক মূল্যবোধ এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রশিক্ষণ বাড়ানো।

০ সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করে তুলতে জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা।

বিএসএফের, কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার ঘটনায় এই সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলেছে। এ বিষয়ে আরো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন