একটি ঐতিহাসিক বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান কখনো কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সুনির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের একক কৃতিত্বে সফল হওয়া কঠিন। চব্বিশের জুলাইয়ে আমরা যা কিছু দেখেছি, যা কিছুর মধ্য দিয়ে গিয়েছি—তার পেছনে রয়েছে কোটি মানুষের দোয়া, হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগ আর লাখো তরুণের রাজপথ কাঁপানো অবিনাশী প্রত্যয়। এই আন্দোলনের প্রথম কৃতিত্ব মহান আল্লাহর, যিনি মজলুমের সহায় হয়েছেন এবং আমাদের হৃদয়ে জালিমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ইমানি সাহস জুগিয়েছেন। যারা রক্ত দিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এবং যারা আন্দোলনের প্রতিটি বাঁকে নিজেদের অবস্থান থেকে বুক পেতে দিয়েছেন, তাদের সবার অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সবার এই সম্মিলিত কোলাহলের ভিড়ে নেপথ্যে থেকে লজিস্টিক ও কৌশলগত কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক মহান আল্লাহ আমাকে দিয়েছিলেন। একজন নগন্য সংগঠক হিসেবে সেই উত্তাল দিনগুলোর কিছু রণকৌশল, ভয় ভাঙার নেপথ্য গল্প এবং ঢাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গণবিস্ফোরণকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে রূপ দেওয়ার পেছনের কিছ স্মৃতি আজ বিনয়ের সাথে তুলে ধরছি। কোনো আত্মপ্রচারের প্রয়াস নয়, বরং ইতিহাসের সত্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করার একটি ক্ষুদ্র দায়িত্ববোধ থেকে এই লেখা।
জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাস পরিবর্তনকারী একটি ঘটনা। শুধু বাংলাদেশ বললে ভুল হবে, এই বিপ্লব পৃথিবীর স্বৈরশাসন কাঠামোতে এক বিরাট ধাক্কা দিয়েছে। বাংলাদেশের এই জাগরণে উদ্ভুদ্ধ হয়ে আরও অনেক দেশেই পরিবর্তন এসেছে। নেপাল, ভুটান থেকে শুরু করে ইন্ডিয়ার 'ককরোচ আন্দোলন' পর্যন্ত, এশিয়া জুড়ে তৈরি হয়েছে আজাদির নতুন লড়াই। স্বৈরাচারদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
জুলাই বিপ্লব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে সংঘটিত নানা অবিচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে এক যুগান্তকারী ও অবিনাশী বিজয়।
আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নানান নির্যাতন-নিপীড়ন খুব কাছ থেকে দেখেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ এ দেশের সকল ক্যাম্পাস ছিল তৎকালীন ছাত্রলীগের একেকটি কারাগার। হলের গেস্টরুমকে রূপান্তরিত করা হয়েছিল একেকটি 'কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে'। যেখানে শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।
আমার প্রথম বর্ষের একটি ঘটনা খুব মনে পড়ে। আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে চঞ্চল ও প্রাণবন্ত ছেলেটা সিআর (Class Representative) নির্বাচিত হয়েছিল। দিনগুলো বেশ ভালোই যাচ্ছিল। কিন্তু কয়েকদিন পরেই হঠাৎ খবর আসে, সিআর আলাউদ্দিনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে থানায় দেওয়া হয়েছে। আমরা বন্ধুরা মিলে যখন থানায় যাই, তখন জানতে পারি আলাউদ্দিনকে কেবল কোনো একটি ফেসবুক পেজে লাইক দেওয়ার অপরাধে এমন পৈশাচিক নির্যাতন করা হয়েছিল!
অনেক ভালো ভালো ছাত্রকে, বিশেষ করে যারা নিয়মিত নামাজ পড়ত, তাদেরকে টার্গেট করে নির্যাতন করা হতো। এই ফ্যাসিবাদের অন্ধকারের মধ্যেও আমরা কিছু যুবক হাসিনার জুলুম থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখতাম, ভেতরে ভেতরে সেই লক্ষ্যে প্রস্তুতিও নিতাম। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশে জুলাই নেমে এলো। হাসিনার সেই অপরাজেয় ফ্যাসিবাদী শাসনকাঠামো ভেঙে খানখান হয়ে গেলো। কিন্তু এতো সহজেই কি সব হয়ে গিয়েছে? অবশ্যই না, এর জন্য আমাদের সুদীর্ঘ ও সুপরিকল্পিত লড়াই করতে হয়েছিল। আন্দোলনের প্রথম থেকেই ছাত্রজনতার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত আশা জাগানিয়া।
হাসিনা প্রথমে ছাত্র সমাজের এই প্রতিরোধকে তুচ্ছ ভেবেছিল, আন্দোলন দেখে একপ্রকার মজাই নিচ্ছিল। কিন্তু ১৪ তারিখ রাতে যখন আন্দোলনরত ছাত্রদের ‘রাজাকার’ তকমা দেওয়া হলো, তখনই ঘটলো বিস্ফোরণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ডিফেন্সিভ থেকে অফেনসিভ হলো এবং বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে শুরু হলো ঐতিহাসিক সেই মিছিল মিছিল। ধ্বনিত হতে লাগলো 'তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার' স্লোগান।
হাসিনার সাইকোলজি আমরা খুব ভালো করেই জানি, তাই এই স্লোগানের প্রভাব কী হতে পারে, তা আমাদের বুঝতে বাকি ছিল না। পরদিনই, অর্থাৎ ১৫ জুলাই ছাত্রছাত্রীদের ওপর অবর্ণনীয় কায়দায় পুলিশ ও ছাত্রলীগ লেলিয়ে দিয়ে হামলা চালানো হলো। বিশেষ করে আমাদের বোনদের রক্তাক্ত চেহারা পুরো জাতিকে আহত ও ক্ষুব্ধ করে তোলে। স্বৈরাচারের বর্বরতা এতটাই বেড়েছিল যে, তারা ছাত্রদের পিটিয়েই দমে যায়নি, বরং আহতরা যাতে চিকিৎসা না পায় সেজন্য হাসপাতালেও কাপুরুষোচিত হামলা চালাতে থাকে।
এরপর দেশের সব ক্যাম্পাসেই শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফুঁসে উঠল। আর তা দেখেই হাসিনা দ্রুত ক্যাম্পাস বন্ধের নির্দেশ দেয়। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীরা তখন ঐক্যবদ্ধ। তারা হলগুলো থেকে উল্টো ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করে। ১৭ তারিখ যখন ক্যাম্পাসে শহীদদের গায়েবানা জানাজা হচ্ছিল, তখন পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ারশেল ও সাউন্ড-গ্রেনেড নিক্ষেপ করে সবাইকে জোরপূর্বক ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য করে।
সেদিন সন্ধ্যা থেকেই ঢাকার অন্যতম প্রবেশপথ যাত্রাবাড়ী পুরো ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমাদের ভাইয়েরা সেখানে ব্যারিকেড দিয়ে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এরপর এলো ১৮ জুলাই। সেদিন দেশের মানুষ এক 'নতুন ঢাকা' আবিষ্কার করল। ১৬ বছরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দেশে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, কিন্তু ১৮ তারিখ মানুষ দেখেছে এক অভূতপূর্ব ও অপ্রতিরোধ্য প্রতিরোধ। আমি সার্বক্ষণিকভাবে ঢাকার প্রতিটি মহানগর এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পাসগুলোর দায়িত্বশীলদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখছিলাম, গ্রাউন্ডের প্রতি মুহূর্তের আপডেট নিচ্ছিলাম।
১৯ তারিখ আন্দোলনের এক চরম মুহূর্তে আমরা আব্দুল কাদেরের মাধ্যমে আমাদের 'মুক্তির ৯ দফা' ঘোষণা করি। যদিও সেই একই দিনে আন্দোলনের সামনের সারির কয়েকজন সমন্বয়ক ৮ দফা দাবি পেশ করেছিলেন। কিছু মূলধারার পত্রিকা সেই ৮ দফাকে খুব হাইলাইট করলেও, কয়েকটি সাহসী পত্রিকা আমাদের দেওয়া ৯ দফাকেই ব্যাপকভাবে প্রচার করে, যা পরবর্তীতে আন্দোলনের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। আন্দোলন তখন শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা দাবানলের মতো সারাদেশে বিস্তার লাভ করে।
আমি প্রতি মুহূর্তের খবরাখবর ও স্পটের খোঁজখবর রাখছিলাম। ১৮ থেকে ২১ তারিখ পর্যন্ত এই চার দিন আন্দোলনের ভেতর আমি এক সম্পূর্ণ নতুন এবং ভয়াবহ বাস্তবতা উপলব্ধি করলাম। আমাদের মুক্তিকামী সাধারণ জনতা ও ছাত্ররা স্রোতের মতো রাজপথে নামছে এবং একের পর এক দেশের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে। এর মাঝেই আমাদের ভাই আরাফাত আন্দোলনের ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক তালিকা আমাকে এনে দেখান, যেখানে ইতিমধ্যেই কয়েকশো মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বুকের ভেতর এক চরম হাহাকার তৈরি হলো—এতো এতো মানুষ শহীদ হচ্ছে, কিন্তু আমরা চূড়ান্তভাবে সফল হতে পারছি না! মাঠের অনেকেই তখন এই তীব্র দমন-পীড়ন দেখে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা হতাশ হচ্ছিলেন। কিন্তু যেহেতু আন্দোলনের কোর ডিসিশন মেকিংয়ে আমরা ছিলাম, আমাদের হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। আমরা আমাদের জীবনের সবকিছু বাজি রেখে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। আমাদের শহীদদের রক্তের বদলা নেওয়ার যে ইমানি প্রতিশ্রুতি আমরা নিজেদের কাছে করেছিলাম, সেখান থেকে পেছনে ফেরার কোনো পথ আমাদের সামনে ছিল না।
২১ জুলাইয়ের পর আমি নিভৃতে খাতা-কলম আর ঢাকার ম্যাপ নিয়ে বসলাম। পুরো ঢাকার আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি, মিছিলের রুট আর সংঘর্ষের স্পটগুলোর চিত্র মেলাতে শুরু করলাম। আর সেই ম্যাপ মেলাতে গিয়েই আমি এক ঐতিহাসিক ও চোখ খুলে দেওয়া সত্য আবিষ্কার করলাম। চব্বিশের এই ঢাকা আসলেই এক ভিন্ন ঢাকা, এই ঢাকাকে বুলেট দিয়ে দমানো অসম্ভব। পুরো ঢাকাজুড়ে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে, প্রতিটি স্পটে অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছে, আরো হাজার হাজার মানুষ বুলেটবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে, কিন্তু অদ্ভুত এক শক্তিতে কেউ রাজপথ ছেড়ে ঘরে ফিরে যায়নি।
আমি যখন ম্যাপের ডটগুলো মেলাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম—মহাখালী, তেজগাঁও, রামপুরা, বাড্ডা, বসুন্ধরা, ফার্মগেট, শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, মিরপুরসহ—ঢাকার এমন কোনো জায়গা বাকি নেই যেখানে মানুষ নামেনি। ওদিকে যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, সাভার অলরেডি ঢাকা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে দুর্ভেদ্য দুর্গ বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু এই স্থানগুলোকে যখন এক সুতোয় মিলিয়ে দেখলাম, তখন আমার মাথায় এক বিশাল ধাক্কা লাগল। আমি দেখলাম, সব জায়গায় অভূতপূর্ব লোকবল থাকলেও এই আন্দোলনের আসলে কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য বা ডেসটিনেশন (Destination) ছিল না।
আমার মনে হচ্ছিলো, আমরা নিরস্ত্র মানুষগুলো স্রেফ রাজপথে নামছি আর স্বৈরাচারের বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে মৃত্যুবরণ করছি। কিন্তু এভাবে রেন্ডমলি রাস্তায় নেমে লাখ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ কেবল প্রাণের সংখ্যাই বাড়াবে, স্বৈরাচারের মূল ভিত উপড়ে ফেলতে পারবে না। তখনই আল্লাহর ওপর ভরসা করে একটি চূড়ান্ত মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করলাম। আমাদের শুধু রাস্তায় নেমে প্রাণ দিলে হবে না, বরং আমাদের এই পুরো জনস্রোতকে একটি সুনির্দিষ্ট ডেসটিনেশনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
যখন লোকেশনগুলো মেলাতে গিয়ে আমার খাতার পাতায় ৩টি খসড়া নকশা আঁকলাম, তখন দেখলাম—আমরা যেখানে যেখানে নেমেছি এবং মৃত্যুবরণ করেছি, এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে রাস্তায় জীবন দেওয়ার পরিবর্তে আমরা যদি বুক চিতিয়ে সোজা একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টের দিকে এগিয়ে যেতাম, তবে এই মুক্তি অনেক আগেই আসত। আর সেই পয়েন্টটি হলো— খুনি হাসিনার মসনদ, 'গণভবন'!
হাসিনা ঠিক ওই গণভবনে বসে দেশের মানুষকে পাখির মতো গুলির নির্দেশনা দিয়েছে। তার নির্দেশেই পেটোয়া পুলিশ ও কুলাঙ্গার ছাত্রলীগ আমাদের ভাইদের বুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। তাই আমাদের কৌশল পরিবর্তন করা জরুরি ছিল। আমরা শুধু রাস্তায় জীবন না দিয়ে, আমাদের যেখান থেকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, ঠিক সেদিকেই ধেয়ে যাব। কেবল রাস্তায় মরে লাশের সংখ্যা না বাড়িয়ে, আমরা প্রয়োজনে গণভবন দখল করতে শাহাদাত বরণ করব! আমাদের এই মৃত্যুর বিনিময়ে যদি হাসিনার ১৭ বছরের জুলুমের অবসান হয়, তবে আল্লাহর দরবারে তা হবে আমাদের জন্য সবচেয়ে মর্যাদার।
আমি গণভবনকে কেন্দ্রবিন্দু (Central Destination) বানিয়ে আন্দোলনের স্পট পর্যবেক্ষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যাপ তৈরি করলাম এবং তা নিয়ে আমাদের কোর টিমের ভেতর কাজ করা শুরু করলাম। একে একে খুব সতর্কতার সাথে সবার মাথায় এই ম্যাপ ও গণভবন দখলের প্ল্যানটা ঢুকিয়ে দিলাম। আমাদের পুরো টিম বিষয়টার গুরুত্ব ও রণকৌশল অনুধাবন করল। এরপর আমরা কেবল চাতক পাখির মতো অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলাম—কখন সেই চূড়ান্ত সুযোগটা আসবে এবং কখন আমরা এই ম্যাপ অনুযায়ী কাজ শুরু করব। সেই লক্ষ্যে ৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত কি কি হয়েছে, কি কি করতে হয়েছে সে আরেক মহাকাব্য। আমাদের প্ল্যান ছিল, যেদিন সারা দেশের মানুষ আবার একযোগে রাজপথে নামবে, সেদিনই আমরা এই জনস্রোতকে সরাসরি গণভবনের দিকে নিয়ে যাব।
অবশেষে ৩ আগস্ট শহীদ মিনারের বিশাল জনসমুদ্র থেকে যখন 'এক দফা' ঘোষণা করা হলো, আমাদের সেই ঐতিহাসিক ও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ তৈরি হলো। সেদিন রাতেই আমাদের নিকট বিভিন্ন মাধ্যমে খবর এলো যে, আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসররা আরও বেশি হিংস্র ও পৈশাচিক হয়ে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নীল নকশা করেছে। আমরাও তখন কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে নেমেছি, কাউকে এক চুল ছাড় দেওয়ার পক্ষপাতি আমরা ছিলাম না। আমাদের শত শত নিষ্পাপ ভাই ইতোমধ্যেই শাহাদাতের সুধা পান করেছেন; এই রক্তখেকো হাসিনার পতন না ঘটিয়ে আমাদের ঘরে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহর ওপর ভরসা করে আমাদের সেই সুপ্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সময় এলো। আমরা একসাথে বসে ঢাকা মহানগরী, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার চারপাশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পাসগুলোর শক্তিকে এক সুতোয় সন্নিবেশিত করে আমরা এক ঐতিহাসিক মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের চূড়ান্ত ছক আঁকলাম। কয়েকজনকে বলা হলো, ‘আমাদের মূল স্পটের আশপাশের যতগুলো ক্যাম্পাস আছে, সবগুলোকে এই ম্যাপের সাথে যুক্ত করুন।’
আমাদের এই নিখুঁত প্ল্যানিংয়ের সাথে যখন সাধারণ ছাত্ররা যুক্ত হলো, তখন আন্দোলনের কৌশলই বদলে গেল। এতে একদিকে শিক্ষার্থীরা যেমন বিশাল জমায়েতের কারণে নিরাপত্তা পেল, অন্যদিকে স্বৈরাচারের পিছু হটা ছাড়া কোনো উপায় থাকল না। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনে আমরা বুক পেতে ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হব, কিন্তু এক কদমও পেছাব না। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল সেন্ট্রাল ডেসটিনেশন—অর্থাৎ গণভবন।
৪ ও ৫ আগস্টের জন্য যখন আমরা পরবর্তী কর্মসূচির লোকেশন ঘোষণা করলাম এবং সর্বস্তরের জনতাকে যে যে পয়েন্টে অংশগ্রহণের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হলো, সেই লোকেশনগুলোর ম্যাপ দেখলেই আজ যেকোনো সচেতন পাঠক বুঝতে পারবেন—আমাদের চূড়ান্ত এবং একমাত্র টার্গেট ছিল খুনি হাসিনার গণভবন ঘেরাও করা এবং এই ফ্যাসিবাদের শেষ দেখে ছাড়া। ৫ আগস্ট সকালে যখন লাখ লাখ মানুষ সব ব্যারিকেড ভেঙে গণভবনের দিকে মার্চ করা শুরু করল, তখনই স্বৈরাচার বুঝতে পেরেছিল তার পায়ের তলার মাটি আর অবশিষ্ট নেই।
ইতিহাসের চাকা যখন ঘোরে, তখন তা কোনো ব্যক্তি বা নেতার ইচ্ছায় ঘোরে না; বরং তা ঘোরে আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনা এবং মজলুমের সম্মিলিত আর্তনাদে। চব্বিশের জুলাই আমাদের এই শিক্ষাই দিয়ে গেল যে—নেপথ্যের কৌশল যতই নিখুঁত হোক না কেন, ইমানি চেতনা আর জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্য ছাড়া কোনো জালিমের তখত তাউস উল্টে দেওয়া সম্ভব নয়। সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের গৌরব কেবলই আল্লাহর এবং এই দেশের আপামর জনতার; আমরা কেবল ইতিহাসের সেই মহাকাব্যের পাতায় নিজেদের দায়টুকু শোধ করার চেষ্টা করেছি। ৫ আগস্ট আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত 'ফতেহ গণভবন' (গণভবন বিজয়) সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে ঠিক, কিন্তু আমাদের লড়াই শেষ হয়ে যায়নি। দেশ ও জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে আমাদের।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

