বাংলাদেশে ‘কিছুই বদলায়নি’Ñএকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর এমন আক্ষেপ জুলাই ২০২৪ ‘গণঅভ্যুত্থান’-এর অর্জন নিয়ে হতাশারই প্রতিফলন। ‘পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ’ দাবি করা আরেক গোষ্ঠী যে বয়ান ছড়াচ্ছে এখানে-সেখানে, তা-ই বলে দিচ্ছে তারা কী হারিয়েছে এবং কেন।
পরাজিত পক্ষ ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পালাবদলকে কলঙ্কিত করে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে এক ‘বিপরীত তত্ত্ব’Ñশেখ হাসিনাবিহীন সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক উত্তরণ ছিল এক ভুল পদক্ষেপ। অন্যদিকে, কিছুটা হতাশ হলেও পরিবর্তনপ্রত্যাশীরা লালন করে চলেছেন সেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, সম্ভবত যে পরিবর্তন দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন অবসানের দুবছর পরও দেখতে পাচ্ছেন না স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন আন্দোলনের পক্ষে-বিপক্ষে থাকা দুই বিপরীতমুখী শক্তি প্রমাণ করে একই সত্যকে : ২০২৪ সালের ঘটনাটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না।
তাই দুবছর পরও অতীতের বিভাজিত রাজনীতির উভয় প্রান্তের অনেকেই এখনো ঠাহর করতে পারে না ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) এবং তার আগের কয়েক সপ্তাহে কী ঘটেছিল, কীভাবে ঘটেছিল। কে-ই বা বিশ্বাস করত যে একসময়কার অপরাজেয় শাসক, হাজার হাজার নেতাকর্মী, অলিগার্ক ও পদাধিকারীরা দিনের আলোয় দৃশ্যপট থেকে উধাও হয়ে যাবেন আর রাতারাতি ভেঙে পড়বে ক্ষমতার কাঠামো ও কৃত্রিম বৈধতার সব প্রতীক!
নিজের চোখ ও কানকে অবিশ্বাস করার মতো সেই ঘটনা ঘটেছিলÑনিপীড়ন, অন্যায় ও নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে কোটি জনতার প্রতিবাদ এবং স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মুখে। সেটি ছিল এক বিপ্লবÑনতুন শতাব্দীর বিপ্লব; এমন এক অনন্য বিপ্লব, যা বাংলাদেশ দেখিয়েছে বিশ্বকে।
প্রযুক্তিনির্ভর তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীল কৌশল নৃশংস শাসনের মোকাবিলা করে আন্দোলনকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে। সেটি সফল হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যান্য বিপ্লবের মতো কোনো একক রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব বা সর্বময় কোনো নেতার উপস্থিতি ছাড়াই।
একবিংশ শতাব্দীর আরব বসন্ত থেকেও এই বিপ্লব ছিল আলাদা। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে মাহিন্দা রাজাপক্ষের পলায়নের ঘটনা থেকে কিছুটা অনুপ্রেরণা নিয়েছিল এই বিপ্লব। কিন্তু পরে তা আগের সব বিপ্লবকে ছাড়িয়ে এক অনন্য রূপ ধারণ করে; এটি কল্পনাও করতে পারেননি বাংলাদেশের অভিজাত শ্রেণি, এমনকি প্রচলিত ধারার কিছু রাজনীতিবিদও। এই বিপ্লবের মডেল পরে আমরা দেখি নেপালে। সাম্প্রতিক ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন শুরু করার সময় ভারতের তরুণরাও হয়তো বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু শিক্ষা নিয়েছে।
বাংলাদেশে যাদের প্রকাশ্যে একে ‘বিপ্লব’ বলতে অনীহা, তারা পরাজিত শক্তি বাদেও একটি বিশেষ মতাদর্শিক মানসিকতার মানুষ অথবা চিন্তাশক্তিহীন বইপড়া বুদ্ধিজীবী। তারা বুঝতে পারেন না কেন মানুষ শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ভেঙে ফেলতে রক্ত ও জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিল। জনগণ তৈরি ছিল একটি প্রভাবশালী প্রতিবেশীর পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত দুর্নীতি, দমন-পীড়ন ও ভোটাধিকারসহ সব নাগরিক অধিকার হরণের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে।
জুলাইয়ের চূড়ান্ত আন্দোলনের সময় মানুষ যে বিপ্লবী পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল, তা আগের বিপ্লবগুলোর মতো কোনো লিখিত ঘোষণাপত্রে লিপিবদ্ধ ছিল না। পরে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করা হয়। সেখানেই তুলে ধরা হয়Ñগণতান্ত্রিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের রূপরেখা।
গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রত্যাশা এবং স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে শক্তি সঞ্চয় করে ২০২৪ সালের আন্দোলন। সুতরাং এটি রাজনৈতিক সমর্থন নিয়েই বিকশিত হয়েছিল।
প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বছরের পর বছর গণতন্ত্রের আশা জাগিয়ে রেখেছিল। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের শেষপর্যায়ে অদৃশ্য যোদ্ধার মতো কাজ করে। আর দীর্ঘ এক দশকের আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে নেতৃত্ব দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, যার শুরু সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন দিয়ে এবং পরে রূপান্তরিত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি)।
আজ সংসদের সরকারি ও বিরোধী আসনে থাকা এসব রাজনৈতিক দলই জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী। এই সনদে সবকিছু না হোক বিপ্লবের প্রধান কর্মসূচিগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে জুলাইয়ের এজেন্ডা বাস্তবায়নে এ শক্তিগুলোরই পরীক্ষা হবে আগামীতে।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তাদের সম্মিলিত অবস্থানই স্বীকৃতি দেয় এই বিপ্লবকে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতন্ত্রীকরণ, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনকে জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং কল্যাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার তাগিদও।
তবে বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি এবং বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বৈষম্য, দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। ১৯৭১ সালে জনগণ দেশ স্বাধীন করেছিল। ১৯৯০ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান স্বৈরশাসক এরশাদকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু সেই গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা দুই দশকের মধ্যেই বিপর্যস্ত হয় শেখ হাসিনার তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের ওপর ভর করে গড়ে ওঠা মাফিয়াতান্ত্রিক শাসনের কারণে।
জুলাই বিপ্লবের কর্মসূচি এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকলেও বাংলাদেশ আবার শেখ হাসিনা আমলের মতো অতীতে ফিরে যাবেÑএমন কোনো সুযোগ আপাতত নেই। ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও ইরানের বিপ্লবের পর কোথাও পুরোনো ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা তাদের বিপ্লবকে বলেন ‘অসমাপ্ত’, কারণ নতুন রাষ্ট্রের সামনে তখনো বহু কাজ এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা বাকি ছিল।
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের গণভোটের রায়সহ নির্বাচনের ফল এবং ৫ আগস্ট ২০২৪-এর লাখো জনতার পদযাত্রা নিশ্চিত করে যে ভোটারদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি জুলাইয়ের এজেন্ডাকে সমর্থন করে। কিন্তু এখনো সাধারণ মানুষ পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি দেশ কোন পথে এগোচ্ছে।
জুলাইয়ের স্বপ্ন অনুযায়ী নতুন বাংলাদেশ গড়ে না উঠলে, বিপ্লবের অপূর্ণ প্রশ্নগুলো অনিবার্যভাবেই আবার ফিরে আসবে, অন্য কোনো রূপে।
লেখক : সাংবাদিক
khawaza@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


