গণঅভ্যুত্থান ও বৈশ্বিক অভিঘাত

গণঅভ্যুত্থান ও বৈশ্বিক অভিঘাত
ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো শুধু একটি সরকারের উত্থান-পতনকে হিসাব না করে বরং একটি জাতির রাজনৈতিক চেতনা, রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের গতিপথকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ‘জুলাই ৩৬’ তেমনই এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এটি ছিল একটি প্রজন্মের আত্মপ্রকাশ, রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা পুনর্ব্যক্ত এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির দাবিতে গড়ে ওঠা এক বিস্তৃত গণআন্দোলন, যা শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

‘জুলাই ৩৬’ নামটির মধ্যেই রয়েছে প্রতীকী তাৎপর্য। ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই বলে কোনো দিন নেই; কিন্তু আন্দোলনকারীদের কাছে এটি ছিল দীর্ঘ প্রতিরোধের ধারাবাহিকতার প্রতীক। এটি এমন একটি সময়কে নির্দেশ করে, যখন ক্যালেন্ডারের প্রচলিত হিসাবকে অতিক্রম করে আন্দোলনের স্মৃতি ও আত্মত্যাগের একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণ করে। এই প্রতীকী ভাষা দেখিয়ে দেয় যে, ইতিহাস কেবল তারিখ দিয়ে নয়; বরং মানুষের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম এবং স্মৃতির মাধ্যমেও রচিত হয়।

বিজ্ঞাপন

আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অধিকাংশ গণঅভ্যুত্থানের পেছনে একটি দৃশ্যমান ইস্যুর পাশাপাশি বহুদিনের জমে থাকা অসন্তোষও কাজ করে। কর্মসংস্থানের সংকট, প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন, রাজনৈতিক মেরূকরণ, নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ-অনিশ্চয়তা; এসব বিষয় আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিকে প্রসারিত করে। ফলে কোটা প্রশ্ন ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রশ্নের প্রতীকে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে গণঅভ্যুত্থান ও গণআন্দোলনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একটি আন্দোলন তখনই গণঅভ্যুত্থানের পর্যায়ে পৌঁছে, যখন তা কেবল নীতিগত পরিবর্তনের দাবি না জানিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বৈধতা, শাসনব্যবস্থার চরিত্র এবং জনগণের অংশগ্রহণের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। ‘জুলাই ৩৬’-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, শ্রমজীবী মানুষ থেকে সব পর্যায়ের সাধারণ জনগণ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরাও বিভিন্নভাবে সংহতি প্রকাশ করেন। এতে আন্দোলনটি একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মসূচি না থেকে জাতীয় পরিসরের গণপ্রবাহে রূপান্তরিত হয়।

এই অভ্যুত্থানের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর ডিজিটাল চরিত্র। বিংশ শতাব্দীর গণঅভ্যুত্থানগুলো মূলত সংবাদপত্র, পোস্টার ও জনসভার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ‘জুলাই ৩৬’ ছিল স্মার্টফোন, লাইভ ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নাগরিক সাংবাদিকতার যুগের আন্দোলন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি ভিডিও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পৌঁছে যায় এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাৎক্ষণিকভাবে সংহতি জানাতে পেরেছেন। ফলে জাতীয় ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় পরিণত হতে সময় লাগেনি।

এখানেই আসে আন্তর্জাতিকীকরণের প্রশ্ন। আজকের বিশ্বে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট আর সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ থাকে না। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, ডিজিটাল যোগাযোগ, বৈশ্বিক গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি—সব মিলিয়ে একটি দেশের সংকট খুব দ্রুত বৈশ্বিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ‘জুলাই ৩৬’-ও তার ব্যতিক্রম নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন, বিভিন্ন রাষ্ট্র, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের সক্রিয়তা এই আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত করে।

তবে আন্তর্জাতিকীকরণকে কেবল বাহ্যিক সমর্থনের বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর একটি নৈতিক ও কূটনৈতিক মাত্রা রয়েছে। নৈতিক দিক থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নে উদ্বেগ জানাতে পারে। এটি অনেক সময় নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি এবং বিচার প্রতিষ্ঠার দাবিকে শক্তিশালী করে। অন্যদিকে কূটনৈতিক দিক থেকে একটি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগ, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে অভ্যন্তরীণ সংকটের আন্তর্জাতিক প্রতিফলন অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিকীকরণের আরেকটি দিক হলো ভূরাজনীতি। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্র। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ কখনো কখনো বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, জাতীয় স্বার্থকে অক্ষুণ্ণ রেখে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণ এবং একই সঙ্গে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য বজায় রাখা।

‘জুলাই ৩৬’ আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। আর তা হলো, রাষ্ট্রের শক্তি কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যবস্থায় নয়; বরং জনগণের আস্থায় নিহিত। যে রাষ্ট্র নাগরিকের কথা শোনে, ভিন্নমতকে সম্মান করে এবং সংকটের সময় সংলাপকে অগ্রাধিকার দেয়, সে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে অধিক স্থিতিশীল হয়। বিপরীতে সংলাপের অভাব, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক মেরূকরণ যেকোনো সংকটকে গভীরতর করে।

এই অভ্যুত্থান তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনারও নতুন পরিচয় বহন করে। একটি সচেতন তরুণ সমাজ রাষ্ট্রীয় নীতি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে এবং প্রয়োজন হলে সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তনের দাবি জানাতে পারে। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

তবে ইতিহাস আমাদের আরেকটি সতর্কবার্তাও দেয়। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তনের সূচনা সম্ভব হলেও টেকসই পরিবর্তন আসে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে। সরকার পরিবর্তন সহজ; কিন্তু বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার অনেক কঠিন। তাই ‘জুলাই ৩৬’-এর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান কতটা শক্তিশালী হবে, দুর্নীতি কতটা কমবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত হবে এবং নাগরিক অধিকার কতটা নিশ্চিত হবে, তার ওপর।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো স্মৃতির রাজনীতি। প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনার মতো ‘জুলাই ৩৬’-ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যার জন্ম দেবে। কেউ একে গণঅভ্যুত্থান বলবেন, কেউ গণআন্দোলন, কেউবা রাজনৈতিক পরিবর্তনের মোড় ঘোরানো ঘটনা বলবেন। কিন্তু ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হলে প্রয়োজন নিরপেক্ষ গবেষণা, তথ্য সংরক্ষণ এবং বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ। কোনো একক রাজনৈতিক বয়ান ইতিহাসের পূর্ণ সত্যকে ধারণ করতে পারে না।

পরিশেষে বলা যায়, ‘জুলাই ৩৬’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কেবল একটি আন্দোলনের নাম নয়; এটি একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা এবং পরিবর্তনের সাহসের প্রতীক। এর বৈশ্বিক অভিঘাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বিশ্বায়নের যুগে কোনো জাতীয় সংকট আর বিচ্ছিন্ন থাকে না। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক জনমত—সবকিছুই আজ পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

‘জুলাই ৩৬’-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, একটি রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ক্ষমতার কঠোরতায় নির্ভর করে না। তা নির্ভর করে জনগণের আস্থায়। উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি অবকাঠামোতে নয়; বরং ন্যায়বিচারে। আর আন্তর্জাতিক মর্যাদার মূল উৎস কূটনৈতিক প্রচারে না হয়ে বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। যদি বাংলাদেশ এই শিক্ষাগুলো ধারণ করতে পারে, তবে ‘জুলাই ৩৬’ কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি হয়ে থাকবে না; বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র মেরামত ও জনমতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার এক স্থায়ী প্রেরণায় পরিণত হতে থাকবে।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন