অভাগা জাতি কবে হব শুদ্ধ

অভাগা জাতি কবে হব শুদ্ধ
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিটি স্বাধীনতাই অসংখ্য জীবনের বিনিময়ে এবং রক্তের নহর বয়ে আসে। যুগে যুগে দেশে দেশে স্বৈরাচারের পতন বিনা রক্তপাতে কখনো হয়নি। যতক্ষণ না তরুণ-যুবক তার রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছেন, ততক্ষণ কোনো স্বৈরাচারের পতন হয়নি। ১৭ বছরের শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার এদেশের আপামর জনগণের ছিল না, সেই সরকারটি ছিল শুধুই আওয়ামী লীগের সরকার। কারণ, শেখ হাসিনা এদেশের জনগণের কথা শুনেননি, তিনি শুধু তার দলের নেতাকর্মী, এমপি-মন্ত্রীর কথাই শুনেছেন। এর বাইরের মানুষকে তিনি মানুষই মনে করেননি। যে বা যারাই কথা বলেছেন বা বলতে চেষ্টা করেছেন, তাদের থাকতে হয়েছে আয়নাঘরে, না হয় হতে হয়েছে গুম-খুনের শিকার। বাবার সামনে ছেলে হত্যা বা ছেলের সামনে বাবা হত্যা, ক্রসফায়ার নামের একটি নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ মানুষ দেখতে দেখতে আর সইতে পারছিল না, তারা শুধু সময়ের অপেক্ষায় ছিল। ভোটের অধিকার মানুষের কীভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তা এ জাতি কখনো ভুলে যাবে না। শেখ হাসিনার অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাই জীবন বাজি রেখেই ছাত্র-জনতা সেদিন রাস্তায় নেমে এসেছিল। প্রতিটি সেক্টরকে হাসিনা ১৭ বছরে তার মনের মতো করে সাজিয়ে রেখেছেন স্তরে স্তরে। প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টরে তিনি আওয়ামী পতাকায় আপাদমস্তক ঢেকে রেখেছিলেন। জাতির বিবেক সংবাদপত্রকে তিনি দলীয় সংবাদপত্রে পরিণত করেছেন। সাংবাদিকতা যদি হয় সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলা—তাহলে বলব সেই সাংবাদিকতাকে এমনভাবে কলুষিত করেছেন যে সাংবাদিকরা তার দলীয় ক্যাডারে পরিণত হয়েছেন। তাদের স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’। সেই দলীয় সাংবাদিকরা জাতির সঙ্গে বেঈমানি করেছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার বিনিময়ে। গণঅভ্যুত্থানের পর জানতে পেরেছি, কোন সাংবাদিক কত টাকা বিদেশে পাচার করেছেন এবং তারা কত টাকার মালিক কীভাবে হয়েছেন। মোদ্দা কথা, হাসিনার পকেট সাংবাদিকে তারা পরিণত হয়েছিলেন নীতিনৈতিকতা ভুলে। হাসিনা যা করেছেন, তার সবটুকুই সাপোর্ট দিয়ে গেছেন অন্ধের মতো।

তাই বলব, হাসিনাকে স্বৈরাচার বানানোর দায় সব সেক্টরের মানুষেরই আছে। ১৭ বছরে যে মানুষ একবারও ফুঁসে ওঠেনি তা কিন্তু নয়, সেই ফুঁসে ওঠা মানুষকে কেমন করে দমন করা হয়েছে, সেটি নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান তো একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দিনের পর দিন অন্যায় আর বৈষম্য করে গেছে হাসিনা সরকার। যে শিশুটি ১৭ বছর আগে জন্মেছে, সে শুধু ‘শেখ’ মুখস্থ করেই বড় হয়েছে। মনে হচ্ছে যেন শেখের বাইরে এদেশে আর কোনো ইতিহাস নেই।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু বাচ্চারা বাবা-মা, দাদা-দাদির কাছে শুনছে তো অন্য ইতিহাস, তবে কি তা মিথ্যা? ৬৯-এর ইতিহাস, ৭১-এর ইতিহাস—সবটাই যদি শেখরা করে, তবে এত এত রক্ত ঝরল কাদের? শেখ হাসিনা আসলে ভুলে গিয়েছিলেন ইতিহাস কখনো উল্টানো যায় না। ইতিহাসের জন্মই হয় ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বলে থাকার জন্য। তাই বলব, যদি বর্তমান সরকার জুলাইকে পাশ কাটিয়ে দেশ চালাতে চায়, তবে বড় ভুল করবে। কারণ আবু সাঈদ-মুগ্ধরা যে ইতিহাস রচনা করে গেছেন, তা আগামী প্রজন্ম ধারণ করবে, আর ধারণ করবে বলেই সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা বা বৈষম্য কেউ মেনে নেবে না। আমার বিশ্বাস, তারেক রহমান সরকার সেই ভুলটি নিশ্চয়ই করবে না। আজ অনেকে বলে, শেখ হাসিনাকে তার দলের লোক ডুবিয়েছে, তিনি খারাপ ছিলেন না। আমি বলব—তিনি তো তার বাবার দেখানো পথেই হেঁটেছেন। তার বাবা বিরোধী দল দমন কতটা নিষ্ঠুরভাবে করেছেন, তা ইতিহাস সাক্ষী।

কিন্তু তারেক রহমানের শরীরে শহীদ জিয়ার রক্ত, বেগম জিয়ার রক্ত—অতএব তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন, এটাই মানুষের প্রত্যাশা। মাঠপর্যায়ের লোকরা যদি চাঁদাবাজি বা দুর্নীতি করে, তা যেমন তার ঘাড়ে বর্তাবে, তেমনি ভালো কাজের প্রশংসাও তিনিই পাবেন। যারা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন ১৭ বছর বিএনপির লোকজন ঘরে থাকতে পারেনি, এখন একটু-আধটু করবে, মনে রাখবেন তারা সরকারকে ডোবাবে। এদের নিয়ে ভাবার সময় এখনই। জুলাই একদিনে ঘটেনি এটিও যেমন সত্য, তেমনি আবু সাঈদরা বুক পেতে দেওয়ার সাহস না করলে হয়তো হাসিনা আবার টিকে যেতেন। আর হাসিনা যদি টিকে যেতেন, তাহলে এদেশে কী ঘটত, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। হয়তো জার্মানির নাৎসি বাহিনীর মতো গণহত্যা চলত। হয়তো লাখ লাখ মানুষ হত্যা করে আওয়ামী লীগ উল্লাস করত। তাই বলব, আমরা আর ক্ষমতার অপব্যবহার দেখতে চাই না। আর চাই না এদেশে আর কোনো গণঅভ্যুত্থান ফিরে আসুক।

লেখক : সিনিয়র সম্পাদনা সহকারী, আমার দেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন