জুলাই শুধু একটি মাস নয়। এটি এমন একসময়ের নাম, যখন বাংলাদেশের মানুষ ভয়কে অতিক্রম করে রাজপথে নেমেছিল। ছাত্রদের আন্দোলন ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। সেই দিনগুলোতে মনে হয়েছিল, মানুষ শুধু নিজেদের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও লড়ছে। ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ ছিল সেই আন্দোলনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।
৩ আগস্ট সকালে আমার মতো আরো অগণিত তরুণ-তরুণী পরিবারের নিষেধ অমান্য করে রাজপথে নেমে এসেছিল। আমার পরিবার সেদিন আমাকে একা যেতে রাজি হয়নি। তাই আমার সঙ্গে বের হন মা। পরে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় আমার ছোট বোনও।
চিটাগাং রোড থেকে বাসে উঠে বুঝলাম, পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। রাস্তায় মানুষের সংখ্যা খুবই কম। কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ বাস থেমে গেল। হেলপার সবাইকে দ্রুত নেমে যেতে বললেন। সামনে একটি বড় মিছিল এগিয়ে আসছিল। বেশির ভাগ যাত্রী ফিরে গেলেও আমি সামনে হাঁটতে শুরু করি। আম্মু বারবার ফিরে যেতে বলছিলেন। কিন্তু তখন মনে হচ্ছিল, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তাদের পাশে দাঁড়ানোই উচিত।
পথে এক কিশোরী এসে জানতে চাইল, আমরা কি লংমার্চে যাচ্ছি। এরপর সে বলল, সেও আমাদের সঙ্গে যেতে চায়। মেয়েটির চোখে ভয় ছিল, কিন্তু সেই ভয়ের চেয়ে সাহসটাই ছিল বড়। তখন বুঝেছিলাম, এই আন্দোলনের শক্তি শুধু স্লোগানে নয়; এই শক্তি জন্ম নিয়েছিল সাধারণ মানুষের বিশ্বাস থেকে।
যত সামনে এগোচ্ছিলাম, তত মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল। কেউ কাউকে চিনত না, কিন্তু সবাই যেন এক পরিবারের মানুষ। সামনে কী অপেক্ষা করছে, কেউ জানত না। তবু কেউ থামছিল না। গুলির আশঙ্কা ছিল, হামলার আশঙ্কা ছিল। তারপরও মানুষের পা থেমে থাকেনি।
মাতুয়াইল এলাকায় পৌঁছানোর পর পুলিশ মিছিল ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। চারদিকে হঠাৎ দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। কিছু সময়ের জন্য সবাই ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু খুব বেশিক্ষণ সেই অবস্থা থাকেনি। অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষ আবার একত্র হয়। আবার স্লোগান ওঠে। তখন মনে হয়েছিল, একটি আন্দোলনকে ভাঙা যত সহজ, মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে ভাঙা তত সহজ নয়।
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই একসময় খেয়াল করলাম, আম্মু আর আমার ছোট বোনকে পাশে দেখছি না। কিছুক্ষণ পর দেখি, তারা আমার আগেই মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে স্লোগান দিচ্ছেন। যে মা কিছুক্ষণ আগেও আমাকে ফিরিয়ে নিতে চাইছিলেন, তিনিই তখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কণ্ঠ হয়ে উঠেছেন। সেই দৃশ্য আজও আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলোর একটি।
শেষ পর্যন্ত আমরা শহীদ মিনারে পৌঁছাই। সেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের ঢল নেমেছিল। মনে হচ্ছিল, পুরো বাংলাদেশ যেন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। সেই জনসমুদ্রে কারো পরিচয় ছাত্র, কারো শ্রমিক, কারো শিক্ষক কিংবা অভিভাবক ছিল না। সেদিন সবার পরিচয় ছিল একটাই—আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ।
জুলাই আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। শিখিয়েছে, কোনো আন্দোলন শুধু কয়েকজন মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; যখন সাধারণ মানুষ যুক্ত হয়, তখন সেটি ইতিহাস হয়ে যায়। শিখিয়েছে, ভয় যত বড়ই হোক, মানুষের সাহস তার চেয়েও বড় হতে পারে। শিখিয়েছে, একটি জাতিকে দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখা যায় না।
অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা কখনোই সমাধান হতে পারে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ঘটনা স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে যায়। কিন্তু জুলাইয়ের দিনগুলো সহজে মুছে যাওয়ার নয়। কারণ এই মাস শুধু আন্দোলনের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের জেগে ওঠার ইতিহাস। এটি এমন একসময়ের স্মারক, যখন ভিন্ন পরিচয়ের মানুষ এক পরিচয়ে এক হয়েছিল—বাংলাদেশ।
আজও জুলাই এলেই সেই দিনের পথচলা মনে পড়ে। মনে পড়ে উদ্বিগ্ন বাবার মুখ, সাহসী মায়ের চোখ, অচেনা এক কিশোরীর দৃঢ়তা আর হাজারো মানুষের একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। জুলাই তাই শুধু একটি মাস নয়। এটি সাহসের নাম, ঐক্যের নাম এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক অনন্ত প্রেরণা।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


