ইতিহাসের বইয়ে যেমন রাজা, সেনাপতি, সম্রাট আর বিজয়ীদের নাম বড় করে লেখা থাকে, আজকের দিনে পত্রিকা, টেলিভিশন আর সোশ্যাল মিডিয়াতেও আমরা প্রায় একই দৃশ্য দেখি।
ধরে নেওয়া যাক উন্নয়নের গল্পটা সরকারের। আর তার অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে বিভিন্ন স্থাপত্য ও ইমারত। কিন্তু সেই উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, বহুতল ভবন বা শহর-সাজানোর প্রকল্পের পেছনে যাদের ঘর ভেঙেছে, যাদের দোকান উচ্ছেদ হয়েছে, যাদের বস্তি রাতারাতি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, কিংবা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা কোথায়? কোথাও তাদের দেখা মিললেও কীভাবে দেখি? ‘অবৈধ দখলদার’, ‘উন্নয়নবিরোধী’, ‘আইনশৃঙ্খলার সমস্যা’—এসব নামে। জুলাইয়ের জনদ্রোহে এসব মানুষই ছিলেন সবার সামনে। কিন্তু আন্দোলন শেষ হতে না হতেই তারা হারিয়ে গেছেন ইতিহাসের অতলে।
জুলাইতে কারা নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই চর্বিতচর্বণের ইতিহাস কমবেশি সবাই লিখছে। কিন্তু যারা এই আন্দোলনে নিজের বাড়ির সামনে থেকেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল, তারা কেন হারিয়ে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নটাও করা হোক। যারা আন্দোলনে গিয়েছিল অন্যদের মতো তাদেরও ঘর ছিল, হাঁড়ি ছিল, বিছানা ছিল, ছেলেমেয়ের স্কুল ছিল, মেয়ের বিয়ের সঞ্চয় ছিল, রোগে আক্রান্ত বাবা-মায়ের ওষুধ ছিল। তাদের অনুন্নত গরিবি জীবনের শত কান্নার আড়ালে ছিল কিছু হাসিমুখ আর হাসিমাখা গল্প। হাসিনার কথিত উন্নয়নের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ‘পুনর্বাসন সমস্যা’ বা ‘ক্ষতিপূরণ জটিলতা’। এরাই যখন আন্দোলন করে হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিল, তখন সুকৌশলে তাদের আবারও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ইতিহাস থেকে।
আমরা যদি মানুষের ভাষায় জুলাইয়ের ইতিহাস লিখতে চাই তখন এগুলো হতে পারে ভিটেহারা হওয়া, স্মৃতিহারা হওয়া এবং নিরাপত্তাহারা হওয়া কিছু মানুষের চরম নির্মম আর্তনাদ। এজন্যই ঘটনাগুলো ইতিহাস থেকে বাদ পড়ে যায়, বাদ দেওয়া হয়।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, জুলাইতে কেউ মিছিলে স্লোগান দিয়েছিলেন, কেউ আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিলেন। কেউ গোপনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন, কেউ ওষুধ কিনে দিয়েছিলেন। কেউ নিজের ঘরের দরজা খুলেছিলেন। কেউ ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময় বিকল্প পথে তথ্য পৌঁছে দিয়েছিলেন। কেউ খাবার রান্না করেছিলেন। কেউ সন্তানকে হারানোর ভয় বুকের ভেতর চেপে রেখে অন্যের সন্তানকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। আবার কেউ হয়তো শুধু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মিছিলকারীদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘ভয় পেয়ো না, আমরা আছি।’ এই ‘আমরা আছি’ বাক্যটিই ছিল জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ক্ষমতা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। একে অপরকে সন্দেহ করতে শেখায়। ভয়ের মধ্যে একা করে ফেলতে চায়। কিন্তু জুলাই মানুষকে একত্র করেছিল। তখন মানুষ বুঝেছিল, আলাদা আলাদা অবস্থায় তারা দুর্বল হলেও সম্মিলিতভাবে তারাই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। রাজপথে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রমাণ করেছিল, ক্ষমতার সবচেয়ে বড় উৎস কোনো ভবন, দলীয় কার্যালয়, বন্দুক কিংবা প্রশাসনিক আদেশ নয়। ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ। রাষ্ট্র জনগণের; জনগণ রাষ্ট্রের অধীন কোনো নীরব প্রজা নয়।
জুলাইয়ের ইতিহাসকে সংকুচিত করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। একটি গণ-অভ্যুত্থানকে কয়েকজন ব্যক্তির বীরত্বসূচক গল্পে পরিণত করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ঠিক যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে একজন ব্যক্তির অর্জন হিসেবে কলুষিত করা হয়েছিল, জুলাই নিয়েও সেই প্রবণতা দৃশ্যমান। জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণকে ছোট করে দেখানো হয়েছে। নারীদের অবদানকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সব শ্রেণির মানুষের অভিজ্ঞতাগুলো জুলাইয়ের মূল বয়ান থেকে বাদ পড়তে শুরু করেছে। অথচ যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত শক্তি তার বহুত্বে।
যে ইতিহাস গণমানুষের প্রতিরোধকে ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াইয়ে পরিণত করে, সেই ইতিহাসকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। যে ইতিহাস শুধু সুযোগসন্ধানী ও ক্ষমতাবানদের জুলাইয়ের একমাত্র উত্তরাধিকারী মনে করে, আসুন সেই ইতিহাসকেও প্রত্যাখ্যান করি। যে ইতিহাস শহীদদের রক্তের বিচার নিশ্চিত করার চেয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা, পদ-পদবি ও রাজনৈতিক হিসাব গোছাতে বেশি ব্যস্ত থাকে, সেই ইতিহাসও আমার-আপনার নয়। আমরা যারা জুলাইতে রাস্তায় নেমেছি, তারা কোনো ব্যক্তিকে গ্লোরিফাই করার জন্য নামিনি। আমরা রাস্তায় নেমেছিলাম জনতার অধিকার আদায় ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রশ্নে।
কোনো গণ-অভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের মাধ্যমে টিকে থাকে না। শাসকের পতন একটি সূচনা হতে পারে, সমাপ্তি নয়। পুরোনো রাষ্ট্রকাঠামো, প্রশাসনিক সংস্কৃতি, দুর্নীতি, বিচারহীনতা, দলীয়করণ এবং নাগরিকের কণ্ঠরোধের ব্যবস্থা অক্ষত থাকলে শুধু সরকার পরিবর্তন মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে না।
রাষ্ট্র যদি আবার পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যায়, তবে সেটিই হবে শহীদদের রক্তের সঙ্গে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা। যে পুলিশি কাঠামো মানুষের প্রতিবাদকে শত্রুর তৎপরতা হিসেবে দেখে, তার সংস্কার প্রয়োজন। যে প্রশাসন জনগণের সেবক হওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের আনুগত্যে অভ্যস্ত, তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। যে বিচারব্যবস্থায় অর্থ, পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রভাব বিচারপ্রাপ্তির গতিপথ নির্ধারণ করে, তাকে স্বাধীন ও জনবান্ধব করতে হবে।
আমরা যদি সত্যিই শহীদদের প্রতি দায়বদ্ধ হই, তবে আমাদের প্রথম দায়িত্ব সত্যকে রক্ষা করা। সত্যকে দলীয় সুবিধার কাছে বিকিয়ে দেওয়া যাবে না। গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে সংখ্যাগুরুর একচ্ছত্র বয়ানের কাছে আত্মসমর্পণ করতে দেওয়া যাবে না। বিচারকে রাজনৈতিক সমঝোতার কাছে বিসর্জন দেওয়া যাবে না। গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনের দিন কিংবা বক্তৃতার স্লোগানে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।
বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্নও শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। কারণ, মানুষ নতুন কোনো ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরির জন্য জীবন দেয়নি। মানুষ জীবন দিয়েছিল এমন একটি রাষ্ট্রের জন্য, যেখানে নাগরিকের মর্যাদা তার অর্থ, রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম, জাতিসত্তা কিংবা সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে না।
জুলাইকে শুধু রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত অর্থ ছোট হয়ে যায়। জুলাই ছিল মানুষের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। এটি ছিল ভয়কে প্রত্যাখ্যান করার সংগ্রাম। এটি ছিল রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দেওয়ার সংগ্রাম যে মানুষ কেবল ভোটার নয়, কেবল করদাতা নয়, কেবল প্রশাসনের নিয়ন্ত্রিত সংখ্যা নয়, মানুষই রাষ্ট্রের মালিক।
এবার তাদের কথা হোক। গল্প হোক জনতার প্রতিরোধ নিয়ে। যাদের ঘাম, রক্ত, অশ্রু ও সাহস দিয়ে জুলাই এসেছিল, জুলাইকে তাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়াটা হোক আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


