মাডলিন নামক ছোট্ট জাহাজটি গাজার ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জাহাজটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকতেই মাঝরাতে ইসরাইলের কিছু স্পিডবোট জাহাজটিকে ঘিরে ধরল এবং সাদা রঙের কিছু একটা স্প্রে করা হলো জাহাজের গায়ে। এরপর ইসরাইলি সেনারা জাহাজটিতে ঢুকে গ্রেপ্তার করল ১২ জনকে; অথচ তাদের সঙ্গে কোনো অস্ত্র ছিল না, ছিল শুধু খাদ্য, ওষুধ আর বিবেক।
মাডলিন জাহাজের মিশন ছিল খুব সাধারণ—গাজার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষগুলোর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ ও কিছু ত্রাণসামগ্রী বিতরণ। কিন্তু যেখানে নৈতিকতার বালাই নেই, ক্ষমতাবানরা ছাড়া আর কেউ মুখ খুললেই তার টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছে, এমনকি আন্তর্জাতিক জলসীমাও নিরাপদ নয়, তখন এই ছোট্ট জাহাজটিও অনেক বেশি শক্তিশালী। মাডলিন কেবল একটি জাহাজ নয়, এটি ছিল সাগরের ঢেউয়ের পরতে পরতে এঁকে দেওয়া সাহসের বার্তা।
গাজার প্রথম ও একমাত্র নারী জেলে মাডলিন কুলাব ১৩ বছর বয়সেই তার বাবার পেশায় নেমে পড়েছিলেন। ওই বয়সেই সাগরে ইসরাইলি অবরোধ ও নিরাপত্তাহীনতার এক জগতে তার বিচরণ শুরু। ধীরে ধীরে তিনি ছোট ব্যবসা দাঁড় করান, কর্মীও নিয়োগ দেন। মানুষকে তিনি নৌকায় ভ্রমণ করাতেন। হতাশায় নিমজ্জিত এক পরিবেশের মধ্যে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ গড়েন। মাডলিন বলেন, ‘আমার সাহস আর সদিচ্ছাই আমার সম্বল।’
এমন এক সাহসী ফিলিস্তিন নারীর প্রতি সম্মান জানিয়ে তার নামে নামকরণ করা জাহাজটি গাজায় ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছে। এই জাহাজের যাত্রীদের একজন গ্রেটা থানবার্গ। একসময় তিনি ছিলেন পশ্চিমা প্রগতিশীলদের মধ্যমণি। এখন গাজার পক্ষে আওয়াজ তোলায় তাদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছেন। জাহাজে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সরকারগুলো যখন কোনো উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ, এমনকি উল্টো ইসরাইলকে সহযোগিতা করছে, তখন আমাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে।’
ইতিহাসের রক্তরঞ্জিত পথ ধরে মাডলিন জাহাজের এই যাত্রা। এর আগে ২০১০ সালে ইসরাইলি বাহিনী ত্রাণবাহী তুর্কি জাহাজ মাভি মারমারায় হামলা করে ৯ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা ও বাকিদের আটক করে। কিন্তু তারপরও গাজা অভিমুখী যাত্রা থেমে থাকেনি। আজকের মাডলিন যেন ঘোষণা করছে—‘ফিলিস্তিন আর কোনো আঞ্চলিক ইস্যু নয়; এটা এখন বিশ্ববিবেকের প্রশ্ন।’
পশ্চিমা ক্ষমতাসীনদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠায় গ্রেটা থানবার্গ এখন মূলধারার মিডিয়াগুলোর টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। গণহত্যার বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় মিডিয়া তাকে ‘সুশীল এলিট’দের কাতারে ফেলেছে। এক মার্কিন সিনেটর ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করে বলেছেন, ‘দেখো, যেন ডুবে যেও না।’ এর বিপরীতে গ্রেটাও কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, ‘আমরা সাঁতার কাটতে জানি।’
এদিকে ছোট্ট এই জাহাজটিকে কেন্দ্র করে ইসরাইল যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তাতে স্পষ্ট হয়ে গেছে, রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইল কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। যে ভাষায় হুমকি দিয়ে তারা এই জাহাজটিকে বিপন্ন করে তুলতে চাইছে, তার সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাতজ থানবার্গকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী হামাস প্রোপাগান্ডিস্ট’ তকমা দিয়েছেন। যেকোনো মূল্যে এই জাহাজটিকে থামানোর জন্য তিনি আর্মিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইসরাইলি শিশুদের দিয়ে জঘন্য একটি ভিডিও বানানো হয়েছে। ভিডিওতে শিশুরা থানবার্গকে হুমকি দিচ্ছে। যুদ্ধে নিহতদের প্রতি তাদের কোনো সমবেদনা নেই, না আছে শান্তির প্রতি কোনো প্রতিশ্রুতি। পুরো সময়জুড়ে ইসরাইল একটি মেয়ের অগ্রযাত্রা থামাতে ব্যতিব্যস্ত ছিল।
আরবদের নীরবতা
ইসরাইলের এই অমানবিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেও কিছু বিবেকবান মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। ড. গ্যাবর মাতে হলেন হলোকাস্ট থেকে বেঁচে ফেরা একজন ইহুদি ও বিশ্বখ্যাত ট্রমা বিশেষজ্ঞ। পোল্যান্ডের ওয়ারস গেটো আপরাইজিং মেমোরিয়াল পরিদর্শনের পরে গ্রেটা থানবার্গদের প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি একটি ভিডিওতে বলেছেন, ‘আজ তোমরা সেই সংগ্রামীদের প্রতিনিধিত্ব করছ যারা একদিন এখানে হিটলারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। সেদিনকার সেই ছোট্ট দলটির প্রতিনিধি হিসেবে আজ তোমরা দুনিয়ার নৃশংসতম খুনি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছ, যখন দুনিয়ার বৃহৎ শক্তিগুলো এদের মদত জুগিয়ে যাচ্ছে। দুনিয়ার সবটুকু মানবতা আজ তোমাদের সঙ্গী, যারা খোলামনে ভাবতে পারে, যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে আজ তাদের সবার মুগ্ধতা আর সমর্থন তোমাদের প্রতি।’
মাডলিন জাহাজটির যাত্রা শুরু হয় ইতালি থেকে। অথচ ভূমধ্যসাগরের কোলজুড়ে অবস্থিত আরব রাষ্ট্রগুলোয় গাজা উপত্যকার পরিস্থিতি নিয়ে এক নিষ্ঠুর নীরবতা বিরাজ করছে। সাগরের ওপার থেকে মিসর শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে। সাগরের পাড়ে বেড়াতে আসা লোকজন থানবার্গের জাহাজটিকে দূর থেকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছে আর ভিডিও করেছে, কিন্তু মিসরের কেউ এই উদ্যোগে শামিল হয়নি। মনে হচ্ছে, গাজা উপত্যকা সুইডিশ তরুণী গ্রেটা থানবার্গের কাছে যতটা আপন, আরব প্রতিবেশীদের কাছে ততটা আপন নয়। ফিলিস্তিনিরা যখন মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বে ক্ষুধার জ্বালায় মারা যাচ্ছে, মিসর তখন সেনা মোতায়েন করে গাজার রাফা সীমান্ত বন্ধ করে রেখেছে। আরব রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে যেসব রাষ্ট্রে স্বৈরতন্ত্র চলছে, তারা আর ফিলিস্তিন নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। ফিলিস্তিন নিয়ে মাথাব্যথা শুধু তাদের যারা স্বাধীন ও বিবেকবান, যারা নীরবতা, হতাশা আর স্বৈরতন্ত্রের কাছে মাথানত করে না।
আরবদের নীরবতার মধ্যে মাডলিন প্রতিবাদের একটা ধরন। এটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, বিশ্বমানবতা যদি সাহস করে এগিয়ে আসত, তাহলে কী ঘটতে পারত। কেমন হতো যদি হাজার হাজার জাহাজ ভূমধ্যসাগরের সব বন্দর থেকে গাজার উদ্দেশে যাত্রা করত?
বিশ্ব নির্বিকার
ডানকার্কের কথা মনে আছে? ১৯৪০ সালে কতগুলো বেসামরিক নৌকা ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে মিত্রবাহিনীর আটকে পড়া সৈন্যদের উদ্ধার করেছিল। না আদেশ, না অনুমতি—শুধু সাহসে ভর করে তারা ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। কেমন হতো যদি দুনিয়ার মানুষ গাজার গণহত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াত?
বিশ্ব চুপ করে আছে বলেই ইসরাইল এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে। দেশটি আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করে না, তাঁবুর মধ্যে শত শত শরণার্থী হত্যা করে, শিশুদের অনাহারে মারে, হাসপাতালে বোমা হামলা করে, স্কুল গুঁড়িয়ে দেয়, চিকিৎসাকর্মী হত্যা করে, খাবার সংগ্রহের সময় শিশুদের গুলি করে মারে আর এমন ভাব করে, যেন তার কিছুই হবে না। এর কারণ ইসরাইলের আছে আমেরিকান বোমা, আমেরিকান ভেটো, সহযোগী ইউরোপ, নির্বিকার আরব বিশ্ব আর ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাওয়া ফিলিস্তিনি অভিজাত শ্রেণি।
নৈতিক গতিপথ
গাজার বর্তমান সংকট শুধু একটি জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার ব্যাপার নয়। চলমান ঘটনা ভবিষ্যৎ সভ্যতার নৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে। আমরা কি এমন একটি বিশ্ব চাই, যেখানে আইন অর্থহীন, গণহত্যাকে আত্মরক্ষা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়, খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে মানুষ হত্যা একটা যুদ্ধকৌশল আর সত্য একটা বোঝা? মাডলিন আমাদের জন্য একটি দর্পণস্বরূপ। এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, বর্তমান দুনিয়াটা কীভাবে চলছে আর ভবিষ্যৎ দুনিয়াটা কেমন হতে পারে। স্বাধীনতা ক্ষমতাবানদের তরফ থেকে দুর্বলদের জন্য কোনো উপহার নয়। এটা আদায় করে নেওয়ার জিনিস।
মাডলিন জাহাজের যাত্রী ও ফ্রেঞ্চ রাজনীতিবিদ রিমা হাসান তার এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘ওরা যখন আমাদের গ্রেপ্তার করবে, তখন আমরা ওদের দিকে আলজেরিয়ার নেতা লারবি বেন মাহদির মতো তাকিয়ে থাকব। উপনিবেশবাদীরা তাকে যখন হাতকড়া পরিয়ে দিয়েছিল, তখন তিনি ছিলেন শান্ত আর আলজেরিয়ার স্বাধীনতার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত।’
হাসান আরো লিখেছেন, ‘আমি পাশ্চাত্যের নিন্দা জানাই ইসরাইল নামক এই কলোনির প্রতি তাদের সহযোগিতার জন্য। আমি আরবদের কাপুরুষতার নিন্দা জানাই। আমি নিন্দা জানাই দুর্নীতিগ্রস্ত ফিলিস্তিনি অভিজাত শ্রেণির প্রতি।’ বেন মাহদির একটি কথা ধার করে রিমা হাসান আরো লেখেন, ‘বিপ্লবকে রাস্তায় ছুঁড়ে দিন, জনগণ তা হাতে তুলে নেবে।’
বিপ্লব আজ সমুদ্রে ছুড়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা কি তুলে নেব?
মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ : এইচ এম নাজমূল হুদা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

