এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে আদর্শিক মিল নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া এনসিপি মধ্যপন্থি আদর্শে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলে । এনসিপির ২৪ দফায় ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের উল্লেখ নেই, বরং নারীর সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ মনোনয়ন দিয়ে তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির দিকেই অঙ্গীকারবদ্ধ।
এনসিপি-জামায়াতের নির্বাচনি সমঝোতা আদর্শিক বিচ্যুতি কি না—এ প্রশ্নে যাওয়ার আগে বুঝতে হবে, কেন এনসিপির সমঝোতা করা প্রয়োজন হলো। এনসিপির অনেক সমর্থক চেয়েছিলেন দলটি এককভাবে নির্বাচন করুক, এমনকি হেরে গেলেও। এই প্রত্যাশার কারণ এনসিপি নিজেরাই। কারণ এনসিপি জাতিকে নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আদর্শিক দিক থেকে এটিই ছিল সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত এবং শীর্ষ নেতৃত্বও তা স্বীকার করেছেন। মনোনয়ন থেকে প্রচারণা সবকিছুই এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতির অংশ ছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলটি পিছিয়েছে কঠিন বাস্তবতার কারণে—নেতাদের জীবননাশের আশঙ্কা। হাদি হত্যার পর পরিস্থিতি পাল্টায়; নাহিদ ইসলাম কোনো রাখঢাক না রেখেই সেটা বলেছেন। সামাজিক মাধ্যমে এনসিপি নেতাদের ‘হত্যার তালিকা’ ঘুরে বেড়াচ্ছে। দলের ভেতরে বিশ্বাস—কমপক্ষে ১০-১৫ জন সংসদ সদস্য না হলে নির্বাচনের পর বহু নেতার লাশ রাস্তায় পড়ে থাকার ঝুঁকি রয়েছে। আরেকটি বাস্তবতা—এত কম সময়ে সারা দেশে সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হয়নি, ফলে এককভাবে গেলে একটিও আসনে জিততে না পারার ঝুঁকি ছিল প্রবল। এমনকি নির্বাচনে না গেলেও নির্যাতন-হত্যা বাড়তে পারত বলে ধারণা নেতৃত্বের। এবারের নির্বাচনের বাস্তবতা হলো, কোনো দলই এককভাবে যাচ্ছে না, বিএনপি-জামায়াতও নয়। সেখানে এনসিপির মতো নতুন দলের পক্ষে এককভাবে নির্বাচন করা আদর্শিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে সম্ভব এবং নিরাপদ ছিল না।
সমঝোতা করা অনিবার্য হয়ে পড়ার কারণে প্রথম প্রশ্ন ছিল—কার সঙ্গে? জীবনরক্ষা ও নির্বাচনি বাস্তবতা বিবেচনায় সমঝোতার সম্ভাব্য পক্ষ ছিল বিএনপি বা জামায়াত। এনসিপি প্রথমে জামায়াতের কাছে যায়নি; তারা প্রথমে গেছে বিএনপির কাছে। এনসিপির এক শীর্ষ নেতা বলেছেন, বিএনপি যদি অন্তত ১০-১৫টি আসনও সম্মানজনকভাবে দিত, সমঝোতা তাদের সঙ্গেই হতো। প্রায় দেড় মাস চেষ্টা করেও এনসিপি ব্যর্থ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিকল্প না থাকায় জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়েছে।
এনসিপির শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম পরিষ্কারভাবে বলেছেন, সমঝোতার প্রধান কারণ হাদি হত্যা। এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল না; ছিল জীবনরক্ষার তাগিদ। এখন পুরো পৃথিবীর কাছেই স্পষ্ট যে, হাদিকে কারা কোন উদ্দেশ্যে হত্যা করেছে। হাদি যেসব কারণে নিহত হয়েছেন, সেই একই ধরনের ঝুঁকি এখন এনসিপির প্রায় সব শীর্ষ নেতার ক্ষেত্রেই আছে। বাস্তবতা হচ্ছে নির্বাচনের পর যদি এনসিপির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এমপি না থাকে, তাহলে হত্যার শঙ্কা অত্যন্ত প্রবল। কিন্তু ১৫-২০ জন এমপি থাকলে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নেতাদের প্রাণরক্ষা তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।
এনসিপি প্রথমেই বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতা করতে চেয়েছিল। কিন্তু বিএনপি মাত্র দু-তিনটি আসনের প্রস্তাব দেয়, যাতে ‘না’ বলা ছাড়া উপায় না থাকে। বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে পথ বেছে নিয়েছে, সে পথে কোনোভাবেই এনসিপি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক সুবিধা বিএনপি পেয়েছে, কিন্তু নেতৃত্ব দিতে পারেনি। জুলাই সফল না হলে খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেক রহমানের দেশে ফেরা—কিছুই সম্ভব হতো না। অথচ জুলাই-পরবর্তী সময়ে বিএনপি জুলাই সনদ, সংস্কার ও বিচারের বিরোধিতা করেছে। বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট রেখে দিয়েছে; গণভোটে প্রকাশ্যে ‘না’ ভোট চেয়েছে। তারেক রহমান বলেছেন, ‘দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত তার হাতে নেই’—কেন নেই তাও বলতে পারেন না।
হাদি হত্যার পর বিএনপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাদের এক নেত্রী হাদিকে ‘গিনিপিগ’ বলেছেন। বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবীরা হাদিকে নিয়ে কটূক্তি করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; বরং নানা উপায়ে হাদি হত্যার বিচারের ফোকাস সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে গেলেও এনসিপি নেতাদের জীবন নিরাপদ হতো না। তার স্পষ্ট প্রমাণ, গোপালগঞ্জে নাহিদ-হাসনাতদের আওয়ামী লীগ যখন হত্যাচেষ্টা করে, তখন বহু বিএনপি নেতা, বুদ্ধিজীবী, টকশোকারী, বিতার্কিক—সবাই প্রকাশ্যে উল্লাস করেছে।
বিএনপির উদ্দেশ্য ছিল মাত্র কয়েকটি আসন দিয়ে এনসিপিকে ভেঙে ফেলা। তারা যেভাবে গণঅধিকার পার্টিকে ছিন্নভিন্ন করেছে, এনসিপির ক্ষেত্রেও সেই পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সফল হয়নি।
নির্বাচনি সমঝোতায় দলীয় স্বার্থ-সুরক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি এনসিপিকে মাত্র দু-তিনটি আসনের প্রস্তাব দিয়ে দলটিকে অবমূল্যায়ন করেছে। অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে এনসিপি ৩০-৩৫টি আসনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। এ সমঝোতা আদর্শিক নয়, শুধু নির্বাচনি। নারী নেতৃত্ব নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও এনসিপি জামায়াতকে স্পষ্ট জানিয়েছে, সাংগঠনিক ও আদর্শিক সিদ্ধান্তে জামায়াতের হস্তক্ষেপ চলবে না এবং জামায়াত এতে সম্মত হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকার ৩০-৩৫ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত অন্তত দুই নারী নেতা আছেন এবং যারা সরে গেছেন বা পদত্যাগ করেছেন, তারাও প্রাথমিক তালিকায় ছিলেন। এটি প্রমাণ করে এনসিপি নিজের মূল্যবোধ বিসর্জন দেয়নি।
এখানে আরেকটি মৌলিক পার্থক্যও রয়েছে—সংস্কার, বিচার, গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি বিপরীত অবস্থান নিয়েছে; অথচ এসব প্রশ্নে জামায়াত তুলনামূলকভাবে অনুকূল অবস্থানে ছিল। বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা মানে ছিল এনসিপির বিলীন হওয়া ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় শক্তির এজেন্ডায় আটকে পড়া; জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় সেই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। তাই ঠান্ডা মাথায় বিচার করলে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতাই ছিল বেশি ‘লাভজনক’ বিকল্প।
যেহেতু জীবন ও দলীয় আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার অন্য কোনো বিকল্প নেই, তাই নির্বাহী কমিটির ৮৬ শতাংশ সদস্য জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষেই ভোট দিয়েছে, জামায়াতকে ভালোবেসে নয়। ঐতিহাসিক সত্য হলো, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান জামায়াতকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আজ কোন বিবেকে বিএনপি-আওয়ামী লীগের নেতা ও সমর্থকেরা এনসিপি-জামায়াত সমঝোতার সমালোচনা করে? বিএনপি ও আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছে, ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে, তবে তাদের জামায়াতের আদর্শের রাজনীতি করতে হয়নি। তাহলে এনসিপির নেতাদের জীবন-মরণ প্রশ্নে এবং কার্যকর বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে এই সমঝোতা গ্রহণ করার কারণে কোন যুক্তিতে জামায়াতের আদর্শের রাজনীতি করতে হবে?
এনসিপির নেতারা আপনার ছেলে-মেয়ে ও ভাই-বোনের বয়সি। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জুলাই সংগ্রামে বেঁচে এসেছে। আবারও জীবন হাতে নিয়ে এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে দেশের ভবিষ্যতের জন্য। ৫৪ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন সম্ভাবনাকে ৫৪ সপ্তাহও সময় দেওয়া যাবে না কেন?
লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, কানাডা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

