ভেরিফিকেশনের নামে তামাশা!

ভেরিফিকেশনের নামে তামাশা!

সম্প্রতি ৪৯তম বিসিএসের গেজেট বেরিয়েছে। সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল ৬৬৮ জনকে, গেজেটে জায়গা পেয়েছেন ৬১১ জন। বাকি ৫৭ জনের নাম নেই, আর কেন নেই, প্রজ্ঞাপনে এর কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। গেজেট প্রকাশের রাতে যারা তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পাননি, তারা আজও জানেন না, ঠিক কোন অপরাধে তাদের বাদ দেওয়া হলো।

বিজ্ঞাপন

একজন প্রার্থীকে প্রিলি, রিটেন ও ভাইভা পেরিয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হতে হয়। তারপর ভেরিফিকেশন, সবশেষে গেজেট। লক্ষ করার বিষয় হলো, এই ধাপগুলোর একেবারে শেষ প্রান্তে এসেই মেধাবীদের স্বপ্ন থমকে যাচ্ছে, আর রাষ্ট্র কারণটুকু জানানোরও প্রয়োজন মনে করছে না।

এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৪৪তম বিসিএসের গেজেটে বাদ পড়েছিলেন ১৮৬ প্রার্থী। ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে (স্বাস্থ্য) সুপারিশ পেয়েও গেজেটে ঠাঁই হয়নি ২১ জন চিকিৎসকের, যাদের ১৫ জনই সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। একটি কলেজের এতজন একসঙ্গে সন্দেহভাজন হয়ে গেলেন কীভাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো কেউ দেয়নি। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে। ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ১৪ হাজার ৩৮৪ জনের মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পর বাদ পড়েছেন দুই হাজারের বেশি প্রার্থী।

ভেরিফিকেশন ব্যবস্থাটা আসলে কেমন, সেটি বুঝতে প্রাথমিকের এ ঘটনাই বোধহয় সবচেয়ে কাজের। ৪৪তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হয়েছিলেন শামীম শাহরিয়ার। তার বাবা হাতেম আলী রাজশাহীর পুঠিয়ার সাধারণ কৃষক, রাজনীতির ধারেকাছেও কখনো যাননি। তিনি জানতে চেয়েছেন, ছেলের প্রতি এই অবিচার কেন। ফরিদপুরের নগরকান্দার জেলে নারায়ণ মল্লিকের ছেলে উজ্জ্বল চিকিৎসক হয়েছেন, সুপারিশও পেয়েছেন। বাবার প্রশ্ন, একজন জেলে দেশের কী ক্ষতি করেছেন যে মেধায় টিকেও তার ছেলে চাকরি পাবে না? এ প্রশ্নের জবাব রাষ্ট্রেরই দেওয়া উচিত। আছেন ডা. সিরাজাম মুনিরাও। রাজনীতির ছায়া এড়াতে ছাত্রজীবনে তিনি কোনো সভা-সেমিনারেও যাননি, অথচ গেজেট থেকে তিনিও বাদ পড়েছেন। রাজনীতি করলে বিপদ, না করলেও বিপদ। তাহলে মাপকাঠিটা আসলে কী?

ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন আমরা অস্বীকার করছি না। রাষ্ট্রের কাজে যিনি যুক্ত হবেন, তার পরিচয়, নাগরিকত্ব, ঠিকানা ও অপরাধের রেকর্ড যাচাই হতেই পারে। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন প্রার্থীর নিজের কোনো অপরাধ না থাকলেও বাবা, চাচা বা পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৯তম বিসিএসের এক প্রার্থীর বাবা সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা জামায়াতের আমির।

ভেরিফিকেশনের সময় প্রার্থীকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, পরিবারের কেউ রাজনীতিতে যুক্ত কি না। তিনি সততার সঙ্গে সত্যটাই বলেছিলেন, আর প্রায় ১০ মাস অপেক্ষার পর গেজেটে তার নাম আসেনি। প্রশ্ন হলো, তার বাবা একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত—যে দলটি সংসদে বিরোধী দল। প্রার্থীর বাবার সেই দল করা কি অপরাধ?

সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতার কথা বলা আছে। ২৭ অনুচ্ছেদ বলছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় পাওয়ার অধিকারী। দুটি অনুচ্ছেদ একসঙ্গে পড়লে সুযোগের সমতা বলতে যা বোঝায়, তা বাবার রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না।

এই ব্যবস্থার উৎস কোথায়, সেটিও একটু ভেবে দেখা দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করিয়ে দিয়েছেন, ব্রিটিশ আমলে পুলিশ ভেরিফিকেশন চালু হয়েছিল তাদের চিহ্নিত করতে, যারা ব্রিটিশ রাজকে মেনে নেয়নি, যাতে তারা সরকারি চাকরিতে ঢুকতে না পারে। অর্থাৎ এটি মূলত ভিন্নমত শনাক্ত করার একটি ঔপনিবেশিক হাতিয়ার। স্বাধীন দেশে এসেও সরকারের পর সরকারের হাতে এটি নিয়োগ-বাণিজ্য ও দলীয় ছাঁকনির কাজ করেছে। আওয়ামী লীগের আমলেও বিরোধী রাজনীতির পরিবারের সন্তানদের ভেরিফিকেশনে আটকে দেওয়ার অভিযোগ বহুবার উঠেছে। আজ ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, কিন্তু ছাঁকনিটা একই আছে। বদলেছে শুধু কারা সেই ছাঁকনির ফাঁক দিয়ে বাদ পড়ছেন।

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই বলেছিলেন, চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক রাখার প্রয়োজন নেই। কমিশনের প্রস্তাবে এ-ও ছিল যে লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হবে না। অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রথা ভাঙতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এরপর দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী ফেব্রুয়ারিতে বলেছিলেন, অন্যায়ভাবে কোনো মেধাবী যেন নিয়োগবঞ্চিত না হন, সেটি তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং পুরো ভেরিফিকেশন ব্যবস্থাই ঢেলে সাজানো হবে। সেই কথার সাত মাস পরে আবার নাম বাদ পড়ার তালিকা এসেছে। তাই ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি কতদূর এগিয়েছে, জাতি তা জানতে চাইতেই পারে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের সূচনা হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবিতেই। তরুণরা সেদিন সরকারি চাকরিতে সুযোগের সমতা চেয়েছিলেন, মেধার মূল্যায়ন চেয়েছিলেন আর এই দাবির জন্য অনেকে প্রাণও দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের কোটা বাতিল হয়ে যদি তার জায়গায় রাজনৈতিক পরিচয়ের ছাঁকনি বসে, তাহলে বৈষম্য থেকেই গেল, বদলাল শুধু তার সুবিধাভোগীরা। এমন বাংলাদেশের জন্য এই তরুণরা রাস্তায় নামেননি।

সরকারি চাকরি এখন সত্যিই সোনার হরিণ। ৪৯তম বিসিএসে (বিশেষ) ৬৮৩টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন তিন লাখ বারো হাজারের বেশি প্রার্থী, অর্থাৎ মোটামুটি সাড়ে চারশ জনে একজন। প্রিলি, লিখিত ও ভাইভা পেরিয়ে সুপারিশ পাওয়া মানে বছরের পর বছর রাত জাগার ফল। তারপর ভেরিফিকেশনের নামে মাসের পর মাস অপেক্ষা, আর শেষে অনুল্লিখিত কারণে বাদ। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা আছে, তাই একবার গেজেট হাতছাড়া হলে অনেকের জন্য সেই সুযোগ আর কখনোই ফেরে না। কেউ কেউ সুপারিশ পাওয়ার পর আগের চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে এসেছিলেন। এই মানসিক আঘাতের ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ করা যায় না। একজন তরুণ বা তরুণীকে সন্দেহভাজন বানিয়ে ছেড়ে দেওয়া মানে শুধু একটি চাকরি কেড়ে নেওয়া নয়, তার সামাজিক মর্যাদাও ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া। যেসব অভিভাবক কৃষিজমি বিক্রি করে সন্তানকে পড়িয়েছেন, তাদের কাছে এ আঘাত আরো গভীর।

সরকারি চাকরির পরীক্ষার্থীদের কাছে বার্তা পৌঁছে গেছে যে মেধাই যথেষ্ট নয়, আরো কিছু লাগে।

অথচ এর সমাধান কঠিন নয়, দরকার শুধু ইচ্ছাশক্তি। পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ফরম থেকে তুলে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, যাকে বাদ দেওয়া হবে, তাকে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। সমকালের একটি মতামত লেখায়ও এই দাবিই উঠেছে : বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীকে লিখিতভাবে কারণ জানানো এবং যুক্তিসংগত প্রশ্ন থাকলে স্বাধীনভাবে পুনঃযাচাই করা। তৃতীয়ত, ভেরিফিকেশনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে এবং মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। চতুর্থত, মনগড়া বা প্রতিহিংসামূলক প্রতিবেদন দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ের এক-দুজনের মন্তব্যে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হলে সেটি প্রশাসন থাকে না, হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তিগত দলাদলির সুযোগ। আর সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে আর কত অপেক্ষা করতে হবে, সে উত্তরও সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশিত।

বহু সরকারই ক্ষমতায় আসার সময় মেধার জয়গান গেয়েছে, আবার ক্ষমতায় থেকে সেই মেধাবীদেরই পথ আটকেছে। এ সরকার সেই পরিচিত পথে হাঁটবে, নাকি ব্যতিক্রম হবে, তার প্রথম পরীক্ষা হবে খুব সহজ। পরবর্তী বিসিএস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই ভেরিফিকেশন ফরম থেকে পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নটি তুলে দেওয়া হোক। একই সঙ্গে বাদ পড়া ৫৭ জন প্রার্থী, প্রাথমিকের দুই হাজার সহকারী শিক্ষক এবং ৪৪ ও ৪৮তম বিসিএসের বঞ্চিতদের বিষয়টি এখনই নতুন করে বিবেচনা করা হোক। মেধাবী তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই তামাশা এবার থামুক।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন