প্রবীণদের জন্য সমাজ ও সরকারের করণীয়

প্রবীণদের জন্য সমাজ ও সরকারের করণীয়

আজ ১ অক্টোবর। জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। ১৯৯০ সাল থেকে এই দিনটি আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হচ্ছে। এই দিনটি উদযাপনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে প্রবীণদের অধিকার সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং তাদের সম্মান ও মর্যাদা সুরক্ষায় সমাজ, সংসার এবং রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির কাঠামোগত পরিবর্তনে কাজ করা।

বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে প্রবীণ জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। এখনই সময় এ ব্যাপারে যথোপযুক্ত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে প্রবীণ নাগরিক মোট জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ। ৬০ বছর পার হলে তিনি প্রবীণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি একাত্তর লাখ প্রবীণ নাগরিক রয়েছেন। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা প্রায় এক কোটি তিপ্পান্ন লাখ। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি প্রবীণ নারী। জনশুমারি অনুযায়ী, ২০৫০ সালে জনসংখ্যার প্রতি পাঁচজনের একজন হবেন প্রবীণ নাগরিক। বাংলাদেশে মোট প্রবীণ পুরুষের চেয়ে প্রবীণ নারীর সংখ্যা বেশি। প্রবীণ নারীদের বেশিরভাগই আবার বিধবা এবং সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় পরিবারের ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বয়স্ক ভাতা ছাড়া তাদের আর কোনো আয় নেই এবং পরিবারের অবহেলা তাদের নিত্যসঙ্গী। ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে প্রবীণদের মধ্যেও নারী প্রবীণের সংখ্যাই বেশি। তাদের দেখভালের জন্য দেশে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা কেন্দ্রের একান্তই অভাব। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও প্রবীণ নারীরা বেশি ভুক্তভোগী। বিশেষ করে, উপকূলীয় এলাকায় প্রবীণ নারী-পুরুষ স্বাস্থ্যসম্পর্কিত অনেক সমস্যায় ভুগে থাকেন।

সারা পৃথিবীতে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২৬ সালে প্রবীণ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘দ্য এইজ অব লনজেভিটি, রি-থিংকিং সিস্টেমস ফর লংগার লাইভস’ (The age of longevity, re-thinking systems for longer lives)Ñঅর্থাৎ এ বছর গড় আয়ু বৃদ্ধির বিষয়টি, দীর্ঘ জীবন সুসংহত করতে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার অনুসরণ। এই প্রক্রিয়াগুলোর অন্যতম হচ্ছে সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি হাসপাতাল, ব্যাংক ইত্যাদিতে অগ্রাধিকার সেবা, আর্থিক, বাসস্থান এবং সুসম খাদ্যনিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং সুলভে যাতায়াতব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫(ঘ) ধারায়ও প্রবীণের এই মৌলিক অধিকারগুলো সমুন্নত রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এই মৌলিক অধিকারগুলো কি বাংলাদেশের প্রবীণদের কাছে সহজলভ্য? এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠী শহরে ও গ্রামে, সমাজে এবং নিজ পরিবারে অনেক বেশি উপেক্ষিত। বয়স এবং লিঙ্গ—এ দুই কারণেই প্রবীণ মানুষ সমাজের সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকেন। পঙ্গুত্ব প্রবীণ বয়সের একটি অনিবার্য অনুষঙ্গ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণের চোখের দৃষ্টি, শ্রবণশক্তি, স্মৃতিশক্তি, হাঁটা-চলার ক্ষমতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ায়ও অনেকেই আক্রান্ত হন। এ সময় খাদ্য, পুষ্টি ও যত্নের প্রয়োজন হয়। বিদেশে এই বয়সি মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সেবাকেন্দ্র ও দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে অতি প্রবীণদের জন্য এসব সেবার একান্তই অভাব।

দীর্ঘমেয়াদি সেবার ক্ষেত্রে পরিবারকেন্দ্রিক কেয়ার সিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিবারের ইয়াং জেনারেশনকে প্রবীণদের সেবায় নিয়োজিত করা যায় এবং একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি কেয়ার সিস্টেম গড়ে তোলা যায়। আমেরিকায় প্রবীণদের দেখভালের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তায় ফ্যামিলি কেয়ার সিস্টেম চালু রয়েছে।

প্রবীণ বয়স কোনো রোগ নয়। এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অনিবার্য অধ্যায়। স্বাস্থ্যসম্মত সঠিক জীবনাচরণ, ব্যায়াম এবং মেডিটেশনের মাধ্যমে আমরা বয়সপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করতে পারি, কিন্তু এড়াতে পারি না। বার্ধক্যের একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে, প্রবীণরা যথেষ্ট অভিজ্ঞ। সারাজীবন রুটি-রুজির জন্য তাদেরও বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। দেশ ও জাতির সমৃদ্ধির প্রয়োজনে এই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান একটি মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু প্রবীণের এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজকে এগিয়ে নিতে যে সচেতনতার প্রয়োজন, তা পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে এখনো তৈরি হয়নি। এর জন্য প্রয়োজন মাদ্রিদ ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যান অব অ্যাকশন অন অ্যাইজিংয়ের (Madrid International Plan of Action on Ageing) আলোকে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা এবং বাজেট বরাদ্দ।

বর্তমান সরকার অবশ্য প্রবীণদের জন্য ট্রেনভাড়া ও মেট্রোরেলভাড়া হ্রাস করে প্রবীণ জনগণকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছে। বয়স্ক ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা চালু করে প্রবীণ নারী-পুরুষ ও প্রান্তিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। তবে এটি বলা যায়, প্রতি মাসে ৬০০ টাকা বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় খুবই অপ্রতুল এবং সব দুস্থ প্রবীণের কাছে এই ভাতা পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রবীণ নাগরিকদের সর্বাঙ্গীণ সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, যদি প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩ আইন হিসেবে পরিণত করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন-২০১৩ কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। বাংলাদেশে প্রবীণের মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে যত ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, তার প্রায় সবই উল্লেখ রয়েছে প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩-তে। যেমন—প্রবীণের আর্থিক নিরাপত্তা, খাদ্য, পুষ্টি ও বাসস্থানের নিরাপত্তা, প্রবীণের স্বাস্থ্যসেবা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে সুলভ মূল্যে ওষুধ, সরকারি হাসপাতালে অগ্রাধিকার, গণপরিবহনে কম ভাড়ায় যাতায়াত সুবিধা, কর্মক্ষম প্রবীণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অতি প্রবীণদের জন্য ডে-কেয়ার এবং দীর্ঘমেয়াদি সেবাযত্ন কেন্দ্র, সিনিয়র সিটিজেন কার্ড প্রদান, প্রবীণ নিবাস স্থাপন, অবহেলা ও নির্যাতন থেকে প্রবীণের সুরক্ষা ইত্যাদি রয়েছে। এগুলো প্রবীণের সুরক্ষায় মূল্যবান পদক্ষেপ।

আমরা মনে করি, প্রবীণ নাগরিকদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যনীতিতে জেরিয়াট্রিক কেয়ারের বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এটি প্রবীণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার। দেশের হাসপাতালগুলোতে প্রবীণদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা এবং বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সারা দেশে অতি প্রবীণ নাগরিক, যাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন, তাদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র প্রয়োজন। হতদরিদ্র প্রবীণদের বাসস্থান নিশ্চিত করার জন্য সারা দেশে বিনামূল্যে প্রবীণ নিবাস চালু করা প্রয়োজন।

২০১৪ সালে বাংলাদেশের প্রবীণ নাগরিকদের সিনিয়র সিটিজেন ঘোষণা করা হলেও এ ব্যাপারে কোনো সিনিয়র সিটিজেন কার্ড দেওয়া হয়নি। একটি সিনিয়র সিটিজেন কার্ড প্রবীণদের হাসপাতালে সিটপ্রাপ্তির অগ্রাধিকারসহ যাতায়াত, ব্যাংক হিসাব খোলা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়ার মর্যাদা দেবে।

সমাজের প্রবীণ পুরুষ ও নারী, যাদের ঘাম ও শ্রমে এ সমাজ এবং পরিবার দাঁড়িয়ে আছে, শেষ জীবনে তাদের সুরক্ষা ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র তথা সবার।

লেখক: প্রেসিডেন্ট, সিনিয়র সিটিজেন ফোরাম; সাবেক সদস্য, জাতিসংঘ সিডো কমিটি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন