একটা সময় মুসলমান মেয়েরা খুব বেশি গানের জগতে আসতেন না। ধর্মীয় বিধিনিষেধ কিংবা পারিবারিক চাপ তাদের নিরুৎসাহিত করত। তবু ব্যতিক্রম ছিলেন কিছু সাহসী নারী—যারা প্রথা ভেঙে সমাজকে নতুন আলো দেখিয়েছেন। চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে, দেশভাগের পর (১৯৪৭) ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গন নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পায়। নাজিমুদ্দিন রোডে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বেতার কেন্দ্রে তখন অসংখ্য শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিমনা মানুষ জড়ো হতেন। ঠিক সেই সময় সংগীত পরিবেশনার মঞ্চে উঠে আসেন কয়েকজন নারীকণ্ঠ। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন লায়লা আর্জুমান্দ বানু, আফসারী খানম ও হুসনা বানু খানম।
লায়লা আর্জুমান্দ বানু
লায়লা আর্জুমান্দ বানু (১৯২৯-৯৫) ছিলেন গায়িকা ও সমাজকর্মী। তিনি ১৯২৯ সালের ৫ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ইডেন বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ও দর্শনশাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৪৯ সালে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। শৈশব থেকেই তিনি সংগীতে প্রতিভার পরিচয় দেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে, ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর, অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঢাকা বেতারকেন্দ্রের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি একক সংগীত পরিবেশন করেন। এভাবেই প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে তিনি ঢাকা বেতারে গান গাওয়ার ইতিহাস গড়েন।
তিনি ওস্তাদ গুল মুহম্মদ খানের কাছে উচ্চাঙ্গসংগীতে তালিম নেন। নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, গজল, আধুনিক ও লোকসংগীতে তার কণ্ঠ ছিল সমান পারদর্শী। কঠোর পর্দাপ্রথা ও সামাজিক সমালোচনার সময় তিনি বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুর (খ্যাতিমান ঐতিহাসিক) ও মা সারা তৈফুরের উৎসাহে সাহসী পদক্ষেপ নেন। এর ফলে নারীদের সংগীতাঙ্গনে অংশগ্রহণের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়।
তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৮ সালে ইরানের শাহ রেজা পাহলবীর কাছ থেকে ‘অভিষেক পদক’ এবং ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা সংগীত কলেজের অবৈতনিক অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি ঢাকা জাদুঘরের ট্রাস্টি, ‘নজরুল স্বরলিপি শুদ্ধীকরণ বোর্ড’-এর চেয়ারম্যান, সংস্কৃতি কমিশনের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য এবং এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রকাশনা Dhaka : Past, Present, Future-এর সংগঠক কমিটির সদস্য ছিলেন। বিদেশে তিনি সাংস্কৃতিক সফরে বহুবার বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তার মৃত্যু হয় ১৯৯৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি।
এই পরিবারের সাংস্কৃতিক আবহকে সমৃদ্ধ করেছিলেন তাদের মা-ও। তিনি ছিলেন সংগীতপ্রিয় এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন ও পরিচালনায় পারদর্শী। লায়লা আর্জুমান্দ বানুর বড় বোন লুলু বিলকিস বানু ভিকারুননিসা নূন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ছোট বোন মালেকা বিলকিস বানু।
বাংলাদেশ টেলিভিশনে লায়লা আর্জুমান্দ বানুর পরিচালনায় মহিলাদের একটি মিলাদ মাহফিল সম্প্রচারিত হয়েছিল, যা সে সময় এক অভিনব দৃষ্টান্ত। তিনি ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে সৌন্দর্যের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন।
আফসারী খানম
আফসারী খানম ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতে দক্ষ শিল্পী। বিশিষ্ট সংগীত পরিচালক এবং রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী আব্দুল আহাদের সঙ্গে মিলিতভাবে তিনি অসংখ্য রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেছেন। তার স্বভাব ছিল অতি সহজ-সরল ও স্নেহশীলা। আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। তিনি মজা করে বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি নিমন্ত্রণ না-ও করো, আমি তবুও তোমার বিয়েতে যাব।’ সত্যিই তিনি এসেছেন এবং আশীর্বাদ করেছিলেন। গানের মানুষ হয়েও তার জীবনযাপন ছিল অতি সাধারণ, নিরহংকার ও প্রীতিময়। আফসারী খানমের স্বামী শামসুর রাহমান ছিলেন সিএসপি। পরে সোভিয়েত ইউনিয়নে পাকিস্তানের অ্যাম্বাসাডর।
হুসনা বানু খানম
হুসনা বানু খানমও রবীন্দ্রসংগীতে পারদর্শী ছিলেন। তিনি হোম ইকোনমিকস কলেজে অধ্যাপনা করতেন। রেডিওতে নিয়মিত রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করতেন এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তার বড় ভাই প্রখ্যাত ফতেহ লোহানী পঞ্চাশ-ষাট দশকে চলচ্চিত্র, নাটকে অভিনয় ও টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। উপমহাদেশের অনেক উচ্চমানের একজন সৃজনশীল শিল্পী ছিলেন।
অন্য ভাই ফজলে লোহানী বিখ্যাত সাংবাদিক-লেখক এবং উপস্থাপক। তার উপস্থাপনায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হতো জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’ আজও সর্বকালের সেরা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান।
রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সনজীদা খাতুন তার লেখায় লিখেছেনÑসেগুনবাগিচা তাদের বাসভবন থেকে রিকশা করে হুসনা বানু খানমের আজিমপুর বাসায় যেতেন রবীন্দ্রসংগীতের তালিম নিতে।
গান শুধু সুর ও কণ্ঠের সমাহার নয়; এটি ইতিহাস, স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক। লায়লা আর্জুমান্দ বানু, আফসারী খানম ও হুসনা বানু খানম—তারা শুধু সংগীত পরিবেশন করেননি, তারা প্রথা ভেঙে পথ দেখিয়েছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। সাহস, প্রতিভা ও নিষ্ঠা দিয়ে তারা নারীদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাদের অবদানকে স্মরণ করা মানে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে জীবন্ত রাখা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

