আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

শাসকদের জন্য অশনিসংকেত

এলাহী নেওয়াজ খান

শাসকদের জন্য অশনিসংকেত

লেখাটা শুরু করেছিলাম ইন্দোনেশিয়ার গণবিদ্রোহ নিয়ে। এরই মধ্যে হতবাক করা ঘটনা ঘটে গেল নেপালে। সেখানে ছাত্র-জনতার গণবিদ্রোহে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটল, যা রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের প্রচণ্ডভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। আর এই ঘটনাটা ঘটেছে একদম বাংলাদেশ স্টাইলে। মনে হলো বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের চিত্রনাট্যটি হুবহু নেপালে মঞ্চস্থ হয়েছে। শুধু সময়ের একটি ব্যবধান আছে। যেখানে বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন ঘটতে সময় লেগেছিল ৩৬ দিন আর সেখানে নেপাল সরকারের পতন ঘটেছে মাত্র ২৪ ঘণ্টায়। শুরু হয়েছিল ৮ সেপ্টেম্বর, পতন ঘটল পরের দিন ৯ সেপ্টেম্বর। হয়তো গণআন্দোলনের মুখে সরকার পতনের ক্ষেত্রে এটা একটা বিশ্ব রেকর্ড।

মূলত নেপালে গত ২০ বছরে ১৪ বার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় কোনো একজন শাসককে কেন্দ্র করে কায়েমি স্বার্থের যূথবদ্ধ সংঘশক্তি সৃষ্টি হয়নি। ফলে আন্দোলনের মুখে দ্রুত সরকার পতন ঘটে গেছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা নিজের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে ক্ষমতার এমন একটা বলয় সৃষ্টি করেছিলেন, যার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন সামরিক ও বেসামরিক আমলা, পুলিশ, ব্যবসায়ী প্রভৃতি নানা পেশা ও শ্রেণির মানুষকে। সে কারণে তিনি গণহত্যা চালিয়েও ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি শক্তি প্রয়োগ ও রক্তপাত ঘটিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার নিষ্ঠুর পথটি বেছে নেননি, যেটা আমরা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে দেখেছি। রক্তপাত এড়াতে কেপি শর্মা সেনাপ্রধানের পরামর্শে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পদত্যাগ করায় নিহতের সংখ্যা অনেক কম হয়েছে। তিনি যদি শেখ হাসিনার মতো রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করতেন, তাহলে সেখানে হয়তো আরেকটি বেদনাদায়ক গণহত্যার ঘটনা ঘটতে পারত।

এদিকে নেপালের আন্দোলনটি বাংলাদেশ স্টাইলে হলেও পরিবর্তনের ধরনটা রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন। কারণ বাংলাদেশের আন্দোলনে ভারতপন্থি সরকারের পতন ঘটেছিল, আর নেপালে পতন ঘটল ভারতবিরোধী সরকারের। কিন্তু এই তরুণ তুর্কিরা ভারতের রাজনৈতিক অভিলাষ চরিতার্থ করতে রাস্তায় নেমেছে, তা মনে হয়নি। এটাকে বলা যায় বঞ্চনা থেকে বিদ্রোহ। একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এই বিদ্রোহের অন্তর্নিহিত কারণটা স্পষ্ট হয়ে যাবে।

যদিও দেশে-বিদেশি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরাখবরে দেখা যাচ্ছে, ভারতের মিডিয়াগুলো নেপালের এই আন্দোলনকে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং আবার সাংবিধানিকভাবে হিন্দু রাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার আন্দোলন হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আন্দোলনকারী তরুণরা ভারতীয় মিডিয়াগুলোর ওইসব প্রতিবেদনকে ডাহা মিথ্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তারা বলেছে, ভারতীয় মিডিয়াগুলো মূলত বিজেপি সরকারের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। কারণ এই তরুণরা ইতিহাসে সচেতন এবং নেপালের সঙ্গে ভারতের অতীত আচরণ তাদের অজানা নয়। মূলত এই তরুণরা অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। তারা বিদ্রোহ করেছিল দুর্নীতিগ্রস্ত এলিটদের বিরুদ্ধে। তারা কখনো আর রাজতন্ত্রে কিংবা সাংবিধানিকভাবে হিন্দু রাষ্ট্রে ফিরে যাবে না।

একটি ফুটেজে আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক চিন্তা ও বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। রাতে দেখা যাচ্ছে, ভারতের ‘রিপাবলিক টিভি’র একজন প্রতিনিধিকে রাজপথে প্রকাশ্যে মারধর করা হচ্ছে। অনেকেরই স্মরণ আছে, বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের পর এই রিপাবলিক টিভির পশ্চিম বাংলার প্রতিনিধি ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ কীভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়েছিলেন। একই কাজ তারা করতে গিয়েছিলেন নেপালে। কিন্তু নেপালের আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা জবাব দিয়েছে মারধর করে। এ থেকে নেপালের গণবিদ্রোহের বৈশিষ্ট্যটা স্পষ্ট হয়ে যায়। যদিও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি নেপাল কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পরিবারের সদস্য হওয়ায় বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। কিন্তু তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে যে সততা দেখিয়েছেন, তা আবার অনেককে আশ্বস্তও করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন আগামী মার্চ মাসে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে ভারতপন্থিদের পরাজয় ঘটবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় একের পর এক এ ধরনের গণবিদ্রোহ কেন সংঘটিত হচ্ছে? প্রথমে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার গণঅভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের পরিবারতন্ত্রের পতন আমাদের চমকে দিয়েছিল। যে ব্যক্তিটির নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কার দীর্ঘদিনের সশস্ত্র এলটিটি সংঘাতের অবসান ঘটেছিল, সেই ব্যক্তি ও তার পরিবারের এই পরিণতি সত্যিই বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। শ্রীলঙ্কার সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির দুই বছরের মাথায় বাংলাদেশে গণবিদ্রোহের মুখে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন বিশ্ববাসীকে আরো অবাক করে দিয়েছিল। ঠিক এর এক বছর পর একই স্টাইলে গণআন্দোলনের মুখে দ্রুততম সময়ে নেপালে নির্বাচিত সরকারের পতনের ঘটনা উন্নয়নশীল দেশগুলোর শাসকদের জন্য সত্যিই এক অশনি সংকেত।

আজ নেপালে যে বিদ্রোহী তরুণসমাজ সরকারের পতন ঘটিয়ে দিল, তারা জেন-জি গ্রুপ হিসেবে পরিচিত। তারা হচ্ছে সেই জেনারেশন, যাদের জন্ম হয়েছে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে, যারা পৃথিবীর আলোয় এসে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে বড় হয়েছে। সর্বক্ষণ সোশ্যাল মিডিয়ায় লেগে থাকা এবং চোখ-কান খোলা এই তরুণসমাজ প্রতিক্ষণ পৃথিবীর তাবৎ ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে থাকে। তারা জন্মের পরে রূপকথার গল্প শুনে বড় হয়নি। তাই পুরোনো দিনের মিথ্যা ঘটনাকে মিথ বানিয়ে রাজনীতি করার দিন যে শেষ হয়ে গেছে, তা বুঝতে এখনো যেসব শাসক অক্ষম, তাদের জন্যও অপেক্ষা করছে একই পরিণতি।

এশিয়ার দেশগুলোর এই নতুন ধরনের গণজাগরণ আমাদের এটাই স্মরণ করে দিচ্ছে, সরকারের ভেতরের দুর্নীতিগ্রস্ত এলিটরা রাষ্ট্রের জন্য কতটা বিপদ ডেকে আনতে পারে। জনবিচ্ছিন্ন এই এলিটদের মধ্যে রয়েছে রাজনীতিবিদ, পুলিশ এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলারা। তাদের মিলিত সংঘশক্তি এমন এক কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করে, যা কেবল তাদের স্বার্থকেই সমুন্নত রাখে।

নেপালে রাষ্ট্রের সুবিধাপ্রাপ্ত দুর্নীতিপরায়ণ রাজনৈতিক এলিটদের সঙ্গে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যই গণবিদ্রোহের মূল কারণ। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য স্কুল ও কলেজগামী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দৃষ্টিকটুভাবে দৃশ্যমান, যা সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে গণবিদ্রোহের অন্তর্নিহিত কারণ ছিল ওই একই, অর্থনৈতিক বৈষম্য।

পরিশেষে, ইন্দোনেশিয়ার একটি অসমাপ্ত গণবিদ্রোহের কথা উল্লেখ করে আমার লেখা শেষ করছি। এই গণবিদ্রোহে ইন্দোনেশীয় সরকারের পতন না ঘটলেও দুর্নীতিপরায়ণ রাজনৈতিক এলিটদের বুক কাঁপিয়ে দিয়ে গেছে। ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান এই গণবিদ্রোহের নেপথ্যেও রয়েছে ধনী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যকার বিরাট অর্থনৈতিক বৈষম্য, যা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। যখন ইন্দোনেশিয়ার জনগণ অর্থনৈতিক সংকটে ধুঁকছে, যখন এ কারণে সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি অনেক খাতে ব্যয় কমিয়ে কৃচ্ছ্রসাধন করছে, তখন এমপিদের বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। যেখানে জনপ্রতিনিধিরা এরই মধ্যে মাসে তিন হাজার মার্কিন ডলার বেতন পেয়ে থাকেন, সেখানে এই বৃদ্ধির প্রস্তাবটা ছিল অভাবগ্রস্ত জনগণের প্রতি একটি নিষ্ঠুর তামাশা, যা জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে দেশে দেশে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন