আবু সাঈদের মৃত্যুর পর অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে মিরপুর। সর্বাত্মক রূপ নেয় আন্দোলন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও অংশ নিতে শুরু করে। ১০নং গোলচত্বর হয়ে ওঠে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। গোলচত্বরের মিলিত হওয়া চারটি রাস্তার দুপাশে রয়েছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি, হাসপাতাল ও বিপণিবিতান। গণজমায়েতের সময় বন্ধ করে দেওয়া হয় ঢাকার সবচেয়ে ব্যস্ততম এ গোলচত্বর। ১৮ জুলাই ওভারব্রিজে মাইক লাগিয়ে ৭ মার্চের বক্তৃতা প্রচার করা হচ্ছিল।
ছাত্রদের লক্ষ করে ছোড়া সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাসের বিকট আওয়াজের নিচে বজ্রকণ্ঠ তলিয়ে যায়। ছাত্ররা টিয়ার গ্যাসের প্রতিষেধক হিসেবে আগুন জ্বালিয়ে স্লোগান দেয়। গোলচত্বরের তিন দিকের রাস্তা ছিল ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণে, শুধু ২ নম্বর থানা থেকে ১ নম্বর পর্যন্ত রাস্তা ছিল হোন্ডাবাহিনীর দখলে। পুলিশ থানার দিক থেকে রাবার বুলেট, বার্ড শট পেলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিয়ে হামলা করে। থানাগুলো টার্গেট হওয়ায় হেলিকপ্টার উড়ে পাহারা দেয়। দুপুরের পর সরকার-সমর্থক ছাত্রসংগঠন মিছিল বের করে লাঠিসোঁটা নিয়ে। অবিরাম ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্যে আন্দোলনকারীরা অরিজিনাল ১০-এর ট্রাফিক বক্স ভেঙে ইটপাটকেল নিয়ে রাস্তা দখল করে। বিকালে মিরপুর-১০ নম্বর আন্দোলনকারীদের দখলে চলে যাওয়ার পর স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা কাঁসা-ঝাঁঝরের শব্দে মুখর করে তোলে মিছিলের অগ্রভাগ।
ফুটওভারব্রিজে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর তার লেলিহান শিখা ঊর্ধ্বগামী হয়ে ছেয়ে ফেলে মেট্রোলাইনের গার্ডার। আগুনের কুণ্ডলী যখন আকাশে ওঠে, তখন কাঁসার আওয়াজ আরো প্রবল হয়ে ওঠে। সন্ধ্যায় রাজপথে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে সব গাড়ি ঢুকে যায় গলিতে। একদিকে সরকারি ছাত্রসংগঠন রাজপথ ছেড়ে মহল্লায় ফিরে যায়, অন্যদিকে বিদ্রোহী জনতা এসে দখল করে রাজপথ। সংঘর্ষের একপর্যায়ে সিয়াম সরদার চোখে গুলিবিদ্ধ হন বেনারসিপল্লিতে আর মুরাদ গলায় গুলিবিদ্ধ হন সেনপাড়ায়। মিরপুর অভিযাত্রিক স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ১২ বছর বয়সি শাহরিয়ার আহত হন রাবার বুলেটের আঘাতে।
পরদিন ‘কালো শুক্রবার’ সকালেও জ্বলছিল পুলিশবক্স। বিকালে শুরু হয় যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্ব। মিরপুর পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে ছাত্রজনতার ওপর সরকারি দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন বিক্ষিপ্ত গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। মিরপুর বাঙালিয়ানা ভোজের সহকারী বাবুর্চি হৃদয় মিয়া জুমার নামাজের পর গোলচত্বরের সমাবেশে যোগদান করে গুলিবিদ্ধ হন। মোত্তাকিন বিল্লাহ আগের দিনের রাবার বুলেটের আঘাত বুকে ও পেটে নিয়ে আবারও আন্দোলনে ফিরে আসে। শেখ মো. সাকিব রায়হান বুকে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মিরপুর গোলচত্বরে মারা যায় আলহাজ আব্বাসউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র মাহফুজুর রহমান (১৫)। মিরপুরে যেসব শিশুকিশোর আন্দোলনে যোগ দিয়ে মৃত্যুবরণ করে, মাহফুজ ছিল তাদের মধ্যে প্রথম শহিদ।
মাহফুজ ছাড়াও মৃত্যুবরণ করে শিক্ষার্থী শাফকাত হোসেন (১১), পোশাকশ্রমিক আশিকুর রহমান (১৭) ও আহনাফ (১৭), যাদের বয়স ছিল ১৭ বছরের নিচে। এদিনই মাথায় গুলি লাগার পর ছাত্র সাগর আহমদকে হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সে ছিল রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নাড়ুয়া ইউনিয়নের টাকাপোড়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক তফাজ্জল হোসেনের ছেলে। একই দিন মারা যান ছাত্র আহসান হাবীব তামিম ও রাব্বি মাতাবর। রাতে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে সেনাবাহিনী মোতায়েন ও কারফিউ জারি করে সরকার।
২০ জুলাই কারফিউ জারির পর সকাল থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে মেশিনগান তাক করে আর্মির গাড়িকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মিরপুর পোস্ট অফিস, ২ নম্বর ওভারব্রিজ, ১০ নম্বর গোলচত্বর প্রভৃতি স্থানে সাঁজোয়া যান থেকে নেমে অস্ত্রধারী সেনারা জনতাকে স্থানত্যাগের নির্দেশ দিতে থাকেন। অফিসগামী কর্মী ও গার্মেন্টকর্মীরা বাসায় ফিরে যান, যারা জানতেন না অফিস-আদালত বন্ধ। বিরতির পর কারফিউ আবার বলবৎ হলে বিকালে ১০ থেকে ১১ নম্বরের রাস্তায় রাস্তায় আগুন দিয়ে বিক্ষোভ করে ছাত্রজনতা। এদিন মিরপুর গোলচত্বরে মারা যায় মো. সিফাত হোসেন এবং ন্যাশনাল বাংলা স্কুলের ছাত্র রুস্তম। ইনোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চাকরি করতেন মোত্তাকিন বিল্লাহ। সন্ধ্যা ৭টায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রথমে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আল হেলাল হাসপাতালে, সেখান থেকে ইবনে সিনায় এবং সেখান থেকে মাজার রোডের গ্লোবাল হাসপাতালে নেওয়ার পর গভীর রাতে মারা যান আইসিইউতে। রাতে ১০ নম্বর থেকে কাজীপাড়া রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু হলে ফাঁকা গুলি ছোড়া হয় অবিরাম। পুলিশ অনেকের জানাজা পড়তে না দিয়ে মৃত্যুর সার্টিফিকেট না দিয়ে রাতে লাশ তুলে নিয়ে যায় অজ্ঞাত স্থানে।
২১ ও ২২ জুলাই সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ১০ নম্বর গোলচত্বরে আর্মির মেশিনগান-সজ্জিত একটি গাড়ি ১৩ নম্বরের দিকে, অন্যটি ২ নম্বরের দিকে তাক করে দাঁড়িয়ে থাকে। মিরপুর মডেল থানার চারদিকের রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে সতর্ক প্রহরা বসায় পুলিশ। ২৩ তারিখ কোটার প্রজ্ঞাপন জারি এবং একই সঙ্গে গেজেট প্রকাশ করার পর মনে হচ্ছিল অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। তার চিহ্ন হিসেবে তিন দিন সাধারণ ছুটির পর কারফিউ শিথিল করে অফিস-আদালত খুলে দেওয়া হয়। ১০ নম্বর চৌরাস্তার মোড়ে আর্মির সতর্ক প্রহরার মধ্যে মেট্রোস্টেশন পরিদর্শন করে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর। শিক্ষার্থীদের ধরতে এলাকায় এলাকায় ব্লক রেইড চলাকালে ৩০ জুলাই নিহতদের স্মরণে সরকার শোকপালন কর্মসূচি ঘোষণা করে, যাকে প্রত্যাখ্যান করে ফেসবুক প্রোফাইল লাল করার আহ্বান জানায় ছাত্রসমাজ। এমনকি জাতিসংঘে ব্যবহৃত সামরিক যানবাহনের গায়ে আন্দোলনকারীরা হোলির কালিতে লেখে—‘কোটা নয় মেধা।’
৩১ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালনের পর ১ আগস্ট ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচিতে ছাত্ররা গ্রাফিতি আঁকতে শুরু করে। এটি এমন একটি অভাবিত কর্মসূচি, যার ফলে সারা দেশের অব্যবহৃত দেয়াল হঠাৎ জাদুস্পর্শে পরিচ্ছন্ন ও গণ-আকাঙ্ক্ষার বাঙ্ময় প্রতীক হয়ে ওঠে। একটি গ্রাফিতির ভাষা ছিল—‘দেয়ালের কান আছে তাই নয়, দেয়ালের মুখও আছে।’ কলেজের ছাত্ররা পাঠ্যপুস্তক থেকে বেছে নেয় কাজী নজরুল ও সুকান্তের পঙ্ক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বেছে নেয় সক্রেটিস-বেকনের বাণী, মাদরাসার ছাত্ররা আঁকে ক্যালিওগ্রাফি। তা ছাড়া তাদের সৃজনীশক্তি এমনভাবে প্রকাশিত হয় যে, দেয়ালে দেয়ালে একই সঙ্গে রচিত হয় সংস্কার ও নতুন সংবিধানের খসড়া। ৩ আগস্টের পর থেকে ১০ নম্বর গোলচত্বর দখল করে মিরপুরের ছাত্রছাত্রীদের গ্রাফিতি আঁকার মহোৎসব শুরু হয়। ১নং থেকে ১৪ নম্বরের রাস্তার ডিভাইডার হয়ে যায় স্বাধীন সংবিধান লেখার খোলা খাতা আর কাজীপাড়া থেকে পল্লবী পর্যন্ত মেট্রোরেলের পিলার হয়ে যায় ঝাঁজালো স্লোগানে মুখর।
২ আগস্ট জুমার নামাজের পর মুসল্লিরা ছাত্রজনতার গণমিছিলে যোগ দিতে রাজপথে নেমে আসে। সবচেয়ে বড় মিছিল বের হয়ে আসে শাহ আলী মসজিদ ও ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে—যেখানে এসে দুই স্রোত মিলিত হয়, তাকে বলা যায় পদ্মা-যমুনার সঙ্গমস্থল। ৩ আগস্ট রাওয়া কনভেনশন হলে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা সভা করে ছাত্রজনতার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে। একই সঙ্গে মিরপুরের আন্দোলনে এসে যোগ দেয় মিরপুর ডিওএইচএসের অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসাররা। ১৩৮ দশমিক ৫৬ একর জমির ওপর দেশের সবচেয়ে বড় ডিওএইচএসে বসবাস করছিলেন ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহে নিহত ৩৭ সেনাকর্মকর্তার বিক্ষুব্ধ স্বজনরা। খালবিলবেষ্টিত মিরপুরের এ অংশটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন। মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন থেকে অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তারা এসে শামিল হন গোলচত্বরের রণক্ষেত্রে।
৪ আগস্ট রোববার সকাল ১১টায় মিরপুরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বলে খ্যাত ১ নম্বর এবং ১০ নম্বরের গোলচত্বরে অবস্থান নিতে শুরু করে ছাত্রজনতা। পাল্টা অবস্থান কর্মসূচি দিয়ে সরকারি ছাত্রসংগঠনের একটি দল স্টেডিয়ামের দিকে, অন্য দল মিছিল নিয়ে ১ নম্বরের দিকে এগিয়ে যায়। বৈষম্যবিরোধীদের হাতে ছিল ‘এক দফা, এক দাবি’র প্ল্যাকার্ড আর সরকার-সমর্থকদের মিছিলের ভাষা ছিল ‘সারা বাংলায় খবর দে, এক দফার কবর দে।’ সরকারি দল দুপুর থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত গোলচত্বর দখল করে রাখতে সক্ষম হয়। উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের চারদিকে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর দখলদাররা পালিয়ে যায়, অথচ তখনো ১০ নম্বর দখলে রেখে সরকারি দলের সমর্থকরা স্লোগান দিচ্ছিল—‘এক একটা বিহারি ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর।’ বিকালের দিকে সারা বাংলাদেশ থেকে সরকারি বাহিনী পালিয়ে যেতে শুরু করে, শুধু মিরপুরে তাদের ব্যর্থতা স্মরণ করে ছাত্ররা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দের আতঙ্কের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হলে আন্দোলনকারীরা আত্মরক্ষার্থে ঢাল বানায় ফুটপাতের অস্থায়ী বাজারের চৌকি দিয়ে। পড়ন্ত বিকাল ঘনিয়ে এলে মিরপুর-১০ নম্বর থেকে স্বাধীনতার ডাক দেয় মিরপুরের সরকারি দল। বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে দেশীয় অস্ত্র ও পিস্তল দিয়ে আক্রমণ করে প্রতিপক্ষের ওপর। মেট্রোরেলের ২৪৬ নম্বর পিলার থেকে ২৪১ নম্বর পিলার পর্যন্ত ছায়াচ্ছাদিত এলাকাটি দখল করে সরকারি দলের লোকেরা আক্রমণ চালায়, অন্য দল হাইপেরিয়নের চৌরাস্তার মোড়ে ২৩৬ নম্বর পিলারের কাছে জড়ো হয়ে স্লোগান দিচ্ছিল। একদিক থেকে এসে যোগ দেয় ৬ নম্বর মাদরাসার ছাত্র ও জনতা, অন্যদিক থেকে এসে যোগ দেয় বেনারসি-পল্লির ছাত্র ও অভিভাবকরা। তারপরই ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় আর্মি। মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে সেনাবাহিনী হাইপেরিয়নের বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে আর্মির কমান্ডার ফাঁকা গুলি করতে করতে ১০ নম্বরের দিকে এগিয়ে গিয়ে মহড়া দিয়ে ফিরে আসে। এটা ছিল প্রকৃত ঝড়ের আগে ঝড়ের সতর্কসংকেত। হঠাৎ জমায়েত সিপাহি-জনতার মিলিত অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সব বাঁধ ভেঙে পড়লে জনতার স্রোত ১০ নম্বর পৌঁছে হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করে। সরকার-সমর্থকরা পুলিশের ছত্রছায়ায় ধীরে ধীরে ২ নম্বর থানার দিকে পিছু হটে যায়। এ সময়ে থানা রোডে মারা যান শফিক আহমদ ও ছাত্র আলভী। গোলাগুলি ও ছড়াগুলির মুহুর্মুহু আওয়াজের মধ্যে শাহরিয়ারের গায়ে এসে লাগে তিনটি রাবার বুলেট। রাতে মিরপুরের রাস্তায় রাস্তায় জ্বলে আগুন এবং পুলিশশূন্য রাস্তায় সেনাবাহিনীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
৫ আগস্ট ছিল সোমবার। লং মার্চের ডাকে সাড়া দিয়ে ঢাকার প্রবেশপথ বাড্ডা, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, সাভার ও আশুলিয়ায় সকাল থেকে শুরু হয়ে যায় ছাত্রজনতার জমায়েত। ঢাকার পথে নেমে আসে লাখো মানুষের স্রোত, তাদের হাতে একমাত্র অস্ত্র বাঁশের বা গজারির লাঠি। পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। মিরপুর-১৪ নম্বরে গার্মেন্ট শ্রমিক মো. ফজলু এবং মিরপুর গোলচত্বরে ছাত্র মিরাজ ফরাজিসহ অনেকে নিহত হন পুলিশের গুলিতে। দুপুরে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার রাজপথ পরিণত হয় জনস্রোতে। শুরু হয় বাঁধভাঙা উৎসব। মুক্তির স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ঢাকাসহ সারা দেশের আকাশ-বাতাস—‘হইহই রইরই, হাসিনা তুই গেলি কই’, ‘এই মুহূর্তে খবর এলো, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেল।’
হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরও মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত রাখে। মিরপুর থানার সামনে সহিংসতার সূত্রপাত হয় আসর নামাজের আগে। এলোপাতাড়ি গুলি শুরু হলে আসরের পর লোকজন বিজয় উৎসবের মাঠ পেছনে ফেলে রেখে নিরাপদ আশ্রয়ে পালাতে থাকে। কালো ধোঁয়ার অন্ধকারের ভেতর মৃত্যুবরণ করেন ছাত্র বাপ্পি আহমেদ, তার সঙ্গে মর্নিং পোস্টের সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারী, গার্মেন্ট শ্রমিক আশরাফুল, শাহাদাত হোসেন ও সাব্বির হোসেন রনি। তা ছাড়া মিরপুর জোনে মারা যান শ্রমিক তোফাজ্জল হোসেন খান। গুলি ফুরিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ থানার তিনতলায় উঠে বাঁচার শেষ চেষ্টা করে। রাতে ‘মিরপুর মডেল থানা’ তখন পুড়ছিল বাস্তিল দুর্গের মতো। পরের দিন সকালে গোলচত্বরে ফিরে এসে আন্দোলনকারীরা ভস্মীভূত পুলিশ বক্সের পোড়া কলঙ্ক রঙ লাগিয়ে মুছে দেন। অঙ্কনশিল্পীরা গোলচত্বরের ২৪৭ নম্বর ভ্যানগার্ড পিলারে লাল কালিতে চত্বরের নতুন নাম লিখে দেন ‘স্বাধীনতা চত্বর’।
লেখক: জি ব্লক, ৫ নং রোড, মিরপুর-২
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


পুতুলকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠালো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা