আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

নির্বাচনি ইশতেহার, স্বর্গবাসের প্রতীক্ষা!

এম আবদুল্লাহ

নির্বাচনি ইশতেহার, স্বর্গবাসের প্রতীক্ষা!
এম আবদুল্লাহ

জল্পনা-কল্পনা ও সংশয়-সন্দেহ ভুল প্রমাণ করে শেষ পর্যন্ত ভোট হচ্ছে। ব্যালটে সিল দিয়ে ত্রয়োদশ সংসদে নিজের পছন্দের প্রতিনিধি পাঠাতে মানুষ মুখিয়ে আছে। তুমুল প্রচারযুদ্ধের পর চূড়ান্ত ভোটযুদ্ধের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ। দুদিন পরই থেমে যাবে জমজমাট প্রচার-প্রচারণা। ক্ষমতার আরাম কেদারায় বসতে ভোট টানার মরিয়া লড়াইয়ের শেষপর্যায়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নেতারা। পাশাপাশি রাষ্ট্রকাঠামোয় বড় ধরনের সংস্কারের প্রশ্নে জনসাধারণের ম্যান্ডেট নিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গণভোট। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান দলগুলো দৃশ্যতঃ এক কাতারে।

২০ দিনের প্রচারাভিযানে পুরো বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছেন আগামীর বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীত্বের দৌড়ে থাকা দুই শীর্ষ নেতা-তারেক রহমান ও ডা. শফিকুর রহমান। প্রচারাভিযানে আবার প্রমাণিত হয়েছে, এককেন্দ্রিক নেতৃত্বের রাজনীতিই এখনো বহাল। বিএনপি ও জামায়াতের প্রধান নেতা ছাড়া অন্যরা নিজ নিজ আসনের বাইরে প্রচারাভিযানে উল্লেখ করার মতো কোনো ভূমিকা রাখেননি বললেই চলে।

বিজ্ঞাপন

দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ক্লান্তিহীন প্রচারাভিযানে অংশ নিয়েছেন দুই রহমান। রাত-দিন একাকার করে প্রতিটি জনপদকে আলোড়িত করে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের স্বপ্ন ও পরিকল্পনার কথা যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, সমালোচনা-এমনকি বিষোদ্গারও করেছেন। কখনো তেজিকণ্ঠে, কখনোবা নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের চেষ্টা করেছেন। ক্ষণে ক্ষণে উত্তাপ ছড়িয়েছে ভক্ত-অনুরাগীদের মাঝে। ভার্চুয়াল যুদ্ধ হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে লাগামহীনভাবে, সত্য-মিথ্যার মিশেলে। দুই শীর্ষ নেতার সমাবেশগুলোতে লোকসমাগম ছিল টইটুম্বুর। জনজোয়ারের বিচারে মনে হয়েছে-‘কেউ কারে নাহি ছাড়ে, সমানে সমান’। নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে ঘটেছে একাধিক সহিংসতা ও মারামারির ঘটনা। প্রাণহানিও হয়েছে।

এরই মধ্যে ক্ষমতাপ্রত্যাশী দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। প্রচারাভিযানে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে ইশতেহারের মাধ্যমে। ক্ষমতায় গেলে কোন কোন নীতি-আদর্শ অনুসরণ করে দেশ পরিচালনা করবেন, তা তুলে ধরা হয়েছে সেখানে। ভোটারের মন ভোলানো ও গলানোর প্রতিশ্রুতি শুনে মনে হতে পারে-বাংলাদেশের দুর্ভাগা নাগরিকরা স্বর্গবাসের খুব কাছাকাছি আছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে দলই ক্ষমতায় যাক, প্রদত্ত অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশ দরদি ও কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং নাগরিকরা সুখ-সাগরে ভাসবেন-এমনটাই আশা করা যায়! নাগরিকদের কোনো অপ্রাপ্তি থাকবে না! অসুখ হলে বিনামূল্যে চিকিৎসা মিলবে, খিদে পেলে কার্ডের মাধ্যমে খাবার মিলবে, মাসোহারা মিলবে, সন্তানের শিক্ষায় টিউশন দিতে পকেটে চাপ পড়বে না; স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাদের জন্য টিফিনের ব্যবস্থা করতে মায়েদের ঝক্কির বদলে মিলবে ‘মিড-ডে মিল’; চাকরি মিলবে কোনো পেরেশানি, ঘুস ও জুতোক্ষয় ছাড়া-আরো কত কী! এমন স্বর্গবাসী হতে কে না চায়? শুধু কয়েকটা দিনের প্রতীক্ষা!

এবারের নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণার বিশেষত্ব হলো-দেড় যুগেরও অধিক সময় ধরে উপেক্ষিত ভোটারদের মন জয় করার প্রাণপণ চেষ্টা করতে হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোকে। বিশেষত, জুলাই অভ্যুত্থান-উত্তর দেশে রাষ্ট্রসংস্কারকে প্রাধান্য দিতে হচ্ছে সব পক্ষকেই, যা অতীতের ইশতেহারগুলোয় ততটা গুরুত্ব পায়নি। জনআকাঙ্ক্ষার নতুন বাংলাদেশের উপযোগী কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে আগ্রহ থাকায় এবারের ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে বিদেশি কূটনীতিকদের বিপুল উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

বিশিষ্ট নাগরিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদেরও এতটা আগ্রহভরে রাজনৈতিক দলের ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে খুব একটা উপস্থিত হতে দেখা যায়নি অতীতে। ইশতেহার প্রণয়নের ক্ষেত্রেও বিশেষত, বিএনপি ও জামায়াতকে বেশ শ্রম-ঘাম ঝরাতে হয়েছে, দক্ষতার পরিচয় দিতে হয়েছে। দলের শুভার্থী, শুভাকাঙ্ক্ষী দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তাও নিয়েছে-দুই দলই।

জামায়াত জোট বিএনপি’র বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ তুলছে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির। সেটি মাথায় রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) শুক্রবার ঘোষিত ইশতেহারে দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের অঙ্গীকার করেছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আমরা যদি এই তিনটির ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করি, তাহলে কোনো পরিকল্পনাই সফল করতে পারব না।’

বিএনপির ইশতেহারে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, প্রতিশোধের রাজনীতিতে নয়-ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে বিএনপি। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই হবে তাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়-উৎপাদন, বৈষম্যহীন, ন্যায্যতার নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে।

ইশতেহার অনুযায়ী, বিএনপি জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমন হবে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রত্যেক নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে-‘সবার আগে বাংলাদেশ’।

বিএনপি তাদের ইশতেহারে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং তারেক রহমানের উপস্থাপন করা রাষ্ট্রসংস্কারের ৩১ দফা ও জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়গুলো সমন্বয় করার প্রয়াস দেখা গেছে। ইশতেহারে ৯টি বিষয়কে ‘প্রধান প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দলটির প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে-‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা; ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়া; দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ; শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু; কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা; ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া; ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খনন ও পুনঃখনন, ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু; ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী চালু এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ।

অন্যদিকে জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ বিএনপি’র প্রধান অস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও নারী ইস্যু। সেটা মাথায় রেখেই ইশতেহার প্রণয়ন করতে হয়েছে দলটিকে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে ৪১ দফার নির্বাচনি ইশতেহার জাতির সামনে তুলে ধরেছে বুধবার। দলটি তাদের ইশতেহারের নাম দিয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সুশাসন, রাষ্ট্রসংস্কার এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশের রূপরেখার অঙ্গীকার করেছে দলটি। ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগান তুলে করে বুধবার ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান।

জামায়াত দাবি করেছে, ‘জনতার ইশতেহারে’ অ্যাপভিত্তিক প্রচারের মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি মানুষের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহারে যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকারের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র; বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ; যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের প্রাধান্য দেওয়া; নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ।

জামায়াত সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ; ব‍্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাত সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ; সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত এবং কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা; সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়, বরং সবার নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা; আধুনিক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা; বিশ্বের চাহিদা সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা; দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা; যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক বা রেলপথের দূরত্ব দু-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভোটারদের।

বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদে যেসব সংস্কারের বিষয়ে একমত হয়েছে সেগুলোই শুধু বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নির্বাচনি ইশতেহারে। যেসব বিষয়ে তাদের দ্বিমত ছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকে তারা বিরত থেকেছে। উচ্চকক্ষ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা আগের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছে ইশতেহারে। অর্থাৎ বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ভোটের ভিত্তিতে নয়, আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করবে। এতে করে ইসলামী আন্দোলনসহ যেসব ছোট দল পৃথক মার্কায় নির্বাচন করে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষে আসন পাওয়ার প্রত্যাশা করছিল, তা ফিকে হয়ে যাবে।

ইশতেহারে গণমাধ্যম

এবার গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা প্রশ্নে ইশতেহারে প্রধান দুটি দল কী বলেছে, সেদিকে নজর দেওয়া যাক। বিএনপি গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ২০০১-০৬ সময়ে স্বাধীনভাবে গণমাধ্যমে তৎকালীন সরকারকে বিভিন্ন সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এর জন্য কোনো সংস্থা থেকে পত্রিকায় ফোন করা হয়নি, যা গত ১৬-১৭ বছর দেখা গেছে। দলের ইশতেহারে গণমাধ্যম উপ-শিরোনামে বলা হয়েছে-সাংবাদিকদের কাজের সুরক্ষা প্রদান এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ওপর সব ধরনের আগ্রাসন প্রতিরোধ করবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুনর্নিরীক্ষণ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করবে। সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত এবং সুরক্ষায় বিশেষ সেল গঠন করবে। গণমাধ্যমের জন্য স্বাধীন রেগুলেটরি বডি গঠন এবং ৩০ দিনের মধ্যে অনলাইনে অভিযোগ নিষ্পত্তি করবে। জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড গঠন এবং সরকারি বিজ্ঞাপনের রাজনৈতিক পক্ষপাত দূর করবে।

মুক্ত সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতা ইস্যুতে বিএনপি অঙ্গীকারে সাংবাদিক হত্যা নির্যাতনের বিচার ও সুরক্ষা সেলের প্রতিশ্রুতি সাংবাদিকদের আশাবাদের জায়গা তৈরি করতে পারে। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুনর্নিরীক্ষার প্রতিশ্রুতি কেন দেওয়া হলো তা বোধগম্য নয়। আওয়ামী জামানায় নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে প্রণীত এই কালো আইনটি সাংবাদিক সমাজের আন্দোলনের মুখে লীগ সরকারই বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কী পুনর্নিরীক্ষা করবে বোঝা গেল না। এটা কি অজ্ঞতাবশত অঙ্গীকার? ওই আইনে করা হয়রানিমূলক মামলাগুলোও ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। অথচ মামলা বাতিলের অঙ্গীকার করা হয়েছে ইশতেহারে। জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড গঠনের প্রতিশ্রুতিতেও বিভ্রাট রয়েছে। কারণ সাংবাদিকদের কল্যাণে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ট্রাস্ট কাজ করছে ২০১৪ সাল থেকেই। ওই ট্রাস্টের উদ্যোগে ইতোমধ্যে প্রবীণ সাংবাদিকদের অবসরকালীন সম্মানী দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত নীতিমালা অনুমোদনে গত সপ্তাহে তথ্য মন্ত্রণালয়ে অংশীজনদের নিয়ে সভাও হয়েছে। এ নীতিমালা অনুমোদন করলেই সাংবাদিকদের অবসর সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে। একটু খোঁজখবর করে গণমাধ্যম-সংক্রান্ত ইশতেহার প্রণয়ন করলে এমন ভুল ও বিভ্রান্তিমূলক বিষয় স্থান পেত না।

জামায়াতের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত অঙ্গীকারেও ভুল-ভ্রান্তি দেখা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনি ইশতেহারের প্রথম ভাগের ১০ নম্বরে ‘তথ্য ও গণমাধ্যম’ শিরোনামে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। ভিশন হিসেবে উল্লেখ করেছে-‘অবাধ তথ্যপ্রবাহ, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের নিশ্চয়তা’। তাদের এ-সংক্রান্ত ৯ দফা অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে-গণমাধ্যমে সুস্থ ও সৃজনশীল চিন্তার প্রসারের লক্ষ্যে জাতীয় গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে; সংবিধান এবং মানবাধিকারের আলোকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে; ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য সরকারের আমলে গণমাধ্যমে যেসব ফ্যাসিবাদী দমননীতি প্রয়োগ করা হয়েছে, সেগুলোর পূর্ণ পর্যালোচনা করা হবে; অতীতে বন্ধ পত্রিকা, টিভি, নিউজ পোর্টাল আবার চালুর সুযোগ দেওয়া হবে এবং অবৈধভাবে ডিক্লারেশন বাতিলের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে; রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বাসসকে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং পেশাদারিত্ব বজায় রেখে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে; বেসরকারি টেলিভিশনে রাষ্ট্রীয় সংবাদ প্রচারে বাধ্য করার সংস্কৃতি বন্ধ করা হবে।

জামায়াতের অঙ্গীকারে আরো বলা হয়, সাংবাদিকদের জন্য ওয়েজবোর্ড নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ডও হালনাগাদ ও বাস্তবায়ন করা হবে; ডিএফপির বিজ্ঞাপন বিতরণে স্বচ্ছতা এবং বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করা হবে-গণমাধ্যমে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে সাংবাদিক সংগঠন ও প্রেস কাউন্সিলকে কার্যকর, স্বচ্ছ এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে। বিশেষ করে, প্রেস কাউন্সিলের বিচারিক ক্ষমতা বাড়ানো হবে এবং গুজব, অপপ্রচার ও অপসাংবাদিকতা রোধে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিকভাবে উৎসাহিত করা হবে।

জামায়াত ফ্যাসিবাদী শাসনে বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করার যে অঙ্গীকার করেছে-তা বিভ্রান্তিকর। কারণ বন্ধ করা সব গণমাধ্যমই চালুর ব্যবস্থা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরপরই হয়েছে। অধিকাংশ চালুও হয়েছে। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দিগন্ত টেলিভিশন সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা চব্বিশের আগস্ট মাসের মধ্যে তুলে নেওয়া হলেও এখনো পর্যন্ত চালু করতে পারেনি। ফলে নতুন করে চালুর সুযোগ দেওয়ার অঙ্গীকার অজ্ঞতাপ্রসূত বলে মনে হয়। তবে বন্ধ করে দেওয়া গণমাধ্যমের বিষয়ে পর্যালোচনা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অঙ্গীকার করলে তা প্রশংসিত হতো। বেসরকারি টেলিভিশনে রাষ্ট্রীয় সংবাদ প্রচারে বাধ্য করার সংস্কৃতি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অথচ গণঅভ্যুত্থানের পর নাহিদ ইসলাম তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে এটা বন্ধ করা হয়েছে। জামায়াতের অঙ্গীকারে ডিএফপি’র বিজ্ঞাপন বিতরণে স্বচ্ছতা ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে ডিএফপি এখন কোনো বিজ্ঞাপন বিতরণ করে না। ডিএফপির কাছ থেকে অনেক আগেই এটা সংশ্লিষ্ট দপ্তর-সংস্থায় চলে গেছে। ইশতেহারে ‘ডিএফপি’ লেখে ব্র্যাকেটে লেখা হয়েছে ‘তথ্য অধিদপ্তর’। ডিএফপির পূর্ণ নাম হচ্ছে ‘চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর’।

পেশাদার সাংবাদিক ও বিজ্ঞ সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে, তাদের সহযোগিতা নিয়ে গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইশতেহার প্রণয়ন করলে এমন সব হাস্যকর ভুলভ্রান্তি হওয়ার কথা নয়। দুটি দলই এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তবে বিএনপির তুলনায় জামায়াতের অঙ্গীকারের পরিধি ব্যাপৃত ও সুনির্দিষ্ট। ওয়েজবোর্ড, পে স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন, সুরক্ষার বিষয়ে জামায়াতের প্রতিশ্রুতিগুলো ইতিবাচক। দুদলই স্বাধীন সাংবাদিকতার সুরক্ষার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার শর্তজুড়ে দেওয়ায় কখনো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ নিলে তাকে ‘দায়িত্বহীন সাংবাদিকতা’র বিরুদ্ধে বলে যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারবে।

গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত ইশতেহারের ভুল-ভাল দেখে পুরো ইশতেহারের নির্ভুলতা নিয়েও সন্দেহ করার অবকাশ থাকে। তারপর নতুন বাংলাদেশের উপযোগী অঙ্গীকারনামা যাতে নির্বাচন-পূর্ব ভোটারের মন ভোলানোর কৌশলে পর্যবসিত না হয়-সেই প্রত্যাশা থাকলো।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...