‘কিচেন ক্যাবিনেট’ সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি

আ-ফ-ম-খালিদ-হোসেন
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

‘কিচেন ক্যাবিনেট’ সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি

সাম্প্রতিক সময়ে কিচেন ক্যাবিনেট নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ তোলপাড় শুরু হয়েছে। এটি নিয়ে ইতি ও নেতিবাচক মন্তব্য দেখা যাচ্ছে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং শাসনতান্ত্রিক বাস্তবতায় ‘ক্যাবিনেট’ বা মন্ত্রিপরিষদ একটি সুপরিচিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সমকালীন রাজনীতিতে প্রায়ই একটি পরিভাষা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তা হলো ‘কিচেন ক্যাবিনেট’। আপাতদৃষ্টিতে একে কোনো সমান্তরাল শাসনকাঠামো মনে হতে পারে, তবে এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি ব্যবহারিক এবং প্রায় অনিবার্য অনানুষ্ঠানিক কৌশল।

‘কিচেন ক্যাবিনেট’ কোনো সাংবিধানিক বা আইনগত ভিত্তিযুক্ত প্রতিষ্ঠান নয়। যখন কোনো সরকারপ্রধান (প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা প্রধান উপদেষ্টা) তার মন্ত্রী বা উপদেষ্টা পরিষদের বাইরে গিয়ে জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্থে অত্যন্ত বিশ্বস্ত কয়েকজন সদস্য, আমলা কিংবা ব্যক্তিগত বন্ধুর একটি ছোট দলের ওপর নীতিনির্ধারণের জন্য অতিরিক্ত মাত্রায় ভরসা করেন, তখন সেই অনানুষ্ঠানিক অংশটিকে রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ । সরকারের শাসনব্যবস্থার ধরন যাই হোক না কেন—‘কিচেন ক্যাবিনেট’ থাকে। তবে একনায়কতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনে এই কিচেন ক্যাবিনেটই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের একমাত্র এবং সর্বেসর্বা চালিকাশক্তি, যেখানে আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভা স্রেফ মরীচিকায় পরিণত হয়।

বিজ্ঞাপন

এই পরিভাষাটির উৎপত্তি হয় ১৯ শতকের যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে। ১৮৩০-এর দশকে তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসন তার আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভাকে পাশ কাটিয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একটি অনানুষ্ঠানিক দলের পরামর্শকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। ধারণা করা হতো, তারা হোয়াইট হাউসের মূল দরজা এড়িয়ে রান্নাঘরের দিক দিয়ে এসে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী বৈঠকে অংশ নিতেন।

আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিপরিষদ থাকা সত্ত্বেও এমন একটি অনানুষ্ঠানিক বলয়ের উপস্থিতি কি দূষণীয় বা ক্ষমতার অপব্যবহার? আধুনিক জটিল রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা ও সুবিধা রয়েছে। মন্ত্রী বা উপদেষ্টা পরিষদে (২৫ থেকে ৫০ জন সদস্য) দীর্ঘ আলোচনা, নানামুখী মতভেদ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কিচেন ক্যাবিনেটের অবয়ব ছোট হওয়ায় অতিদ্রুত ও চটজলদি সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়। জাতীয় নিরাপত্তা, ভূরাজনৈতিক সংকট, কিংবা সংবেদনশীল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি এড়ানো অপরিহার্য। পুরো মন্ত্রিপরিষদের সামনে আলোচনার পরিবর্তে বিশ্বস্ত চার-পাঁচজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে গোপনীয়তা নিশ্ছিদ্র থাকে। মন্ত্রিপরিষদের সব সদস্য সব বিষয়ে সমান পারদর্শী হন না। সরকারপ্রধান যদি জটিল অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রশাসনিক বা বিশেষ কোনো সংস্কার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চান, তবে তিনি সবাইকে না ডেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ এবং উপদেষ্টা বা মন্ত্রীদের নিয়ে বসতেই পারেন। এটি সময় সাশ্রয় করে এবং কাজের কার্যকারিতা বাড়ায়।

স্মর্তব্য যে, কিচেন ক্যাবিনেট মূলত আইডিয়া তৈরি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, এটি কোনো চূড়ান্ত আইনি রূপ দিতে পারে না। দেশের আইন ও নিয়ম অনুযায়ী, মন্ত্রী বা উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন হলে সেই সিদ্ধান্তকে পরে এজেন্ডা আকারে আনুষ্ঠানিক ক্যাবিনেট মিটিংয়ে তুলেই পাস করাতে হয়।

নেতিবাচক দিক ও ঝুঁকি

সুবিধা থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিবিজ্ঞানী ও আইনজ্ঞরা এই সংস্কৃতির কিছু নেতিবাচক দিক এবং ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে থাকেন। সাংবিধানিক নিয়মে মন্ত্রিপরিষদকে যৌথভাবে দায়বদ্ধ করা হয়। কিন্তু কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্যরা—বিশেষ করে তারা যদি কোনো অনির্বাচিত ব্যক্তি বা ব্যাকস্টেজ প্রভাবশালী হন—তবে তারা জনগণের কাছে সরাসরি জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন না। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বা উপদেষ্টারা যদি অনুভব করেন যে মূল সিদ্ধান্তগুলো অন্য কোথাও হচ্ছে এবং আনুষ্ঠানিক ক্যাবিনেট মিটিংয়ে তারা শুধু ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে সই করছেন, তবে সরকারের অভ্যন্তরে মনস্তাত্ত্বিক কোন্দল ও ক্ষোভের সৃষ্টি হতে পারে। সীমিত মানুষের চিন্তার (গ্রুপথিংক) ওপর অতিনির্ভরশীলতার কারণে অনেক সময় ভিন্নমত বা বিকল্প কোনো ভালো পরামর্শ আড়ালে পড়ে যায়। ফলে নীতিনির্ধারকরা বাস্তবতার বাইরে গিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারেন।

দেশে দেশে কিচেন ক্যাবিনেট

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা অনেক বেশি। সেখানে একে ‘ইনার সার্কেল’ বা ‘ব্রেন ট্রাস্ট’ বলা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বা জো বাইডেনের শাসনামলেও তাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পরামর্শকদের এই ভূমিকায় দেখা গেছে। টনি ব্লেয়ারের শাসনপদ্ধতিকে গণমাধ্যম ‘সোফা গভর্নমেন্ট’ নাম দেওয়া হয়েছিল। ডাউনিং স্ট্রিটের ১০ নম্বরের একটি রুমে সোফায় বসে তিনি তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দু-তিনজন সহযোগীকে নিয়ে মূল সিদ্ধান্ত নিতেন। মার্গারেট থ্যাচারের আমলেও এই সংস্কৃতির প্রবল উপস্থিতি ছিল। ভারতের ইতিহাসে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলের ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। পরে মনমোহন সিংয়ের আমলে সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল’ এবং বর্তমান নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও প্রধান সচিবকে নিয়ে গঠিত কোর গ্রুপই মূলত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে। কানাডায় একে বলা হয় ‘গভর্নমেন্ট বাই পিএমও’ এবং অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাডের আমলের অনানুষ্ঠানিক নীতিনির্ধারক দলকে বলা হতো ‘গ্যাং অব ফোর’।

সৌদি আরবের মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তার অত্যন্ত বিশ্বস্ত তরুণ উপদেষ্টা ও রাজপরিবারের নির্দিষ্ট কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে গঠিত কোর গ্রুপই দেশের তেলনীতি থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতির মূল রূপকার। আমিরাতের শেখ মোহাম্মদ আল নাহিয়ান তার ঘনিষ্ঠ ভাই ও বিশ্বস্ত উপদেষ্টাদের নিয়ে গঠিত ‘ইনার সার্কেল’-এর মাধ্যমেই সব কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ওমানের প্রয়াত সুলতান কাবুশ এবং কাতারের আমির শেখ তামিম আল থানি—উভয়ই আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার চেয়ে তাদের ব্যক্তিগত সচিব, উপদেষ্টা এবং দিওয়ানের নির্দিষ্ট সদস্যদের ওপর ভরসা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করে আসছেন। ফ্রান্সের রাজা লুই চতুর্দশের বিশেষ পরামর্শক দল কিংবা মোগল সম্রাট আকবরের ‘নবরত্ন’ মূলত এই রাজকীয় কিচেন ক্যাবিনেটেরই প্রাচীন রূপান্তর।

পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের পর জেনারেল জিয়াউল হক (১৯৭৭-৮৮)একটি বেসামরিক মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন। কিন্তু সেই মন্ত্রিসভার সদস্যদের কোনো প্রকৃত ক্ষমতা ছিল না। জিয়াউল হকের আসল কিচেন ক্যাবিনেট গঠিত হয়েছিল তৎকালীন কয়েকজন কোর কমান্ডার এবং বিশেষ করে, আইএসআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে। জেনারেল পারভেজ মোশাররফ (১৯৯৯-০৮) যখন শওকত আজিজকে প্রধানমন্ত্রী করে একটি বেসামরিক সরকার গঠন করেন, তখনো আসল ক্ষমতা ছিল ‘কোর গ্রুপ’-এর হাতে। তার বিশ্বস্ত কয়েকজন জেনারেলকে নিয়ে গঠিত দলই ছিল তার কিচেন ক্যাবিনেট, যারা দেশের পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তানীতি নির্ধারণ করতেন।

লাতিন আমেরিকার চিলির জেনারেল পিনোশে (১৯৭৩-৯০) তার আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিপরিষদের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক দলের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলেন। চিলির অর্থনীতি সচল করতে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল মুক্তবাজার অর্থনীতিবিদের একটি ছোট দলকে উপদেষ্টা নিয়োগ করেন, যাদের ইতিহাসে ‘শিকাগো বয়েজ’ বলা হয়। এরা কোনো আনুষ্ঠানিক মন্ত্রী ছিলেন না, কিন্তু পিনোশের কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্য হিসেবে চিলির পুরো অর্থনৈতিক পলিসি তৈরি করেছিলেন। অন্যদিকে, তার কিচেন ক্যাবিনেটে ছিল গোপন পুলিশ বাহিনী ‘DINA’-এর প্রধান এবং অনুগত সেনা জেনারেলরা।

১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে মিয়ানমার যখন রাষ্ট্রীয় শান্তি ও উন্নয়ন কাউন্সিল (SPDC) নামক জান্তা দ্বারা শাসিত হতো, তখন সেখানে দেখানোর জন্য একটি সরকার ও মন্ত্রিসভা ছিল। কিন্তু আসল ক্ষমতা ছিল সিনিয়র জেনারেল থান শোয়ে এবং তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দু-তিনজন জেনারেলের হাতে। বর্তমান সময়েও জেনারেল মিন অং হ্লাইং তার অত্যন্ত বিশ্বস্ত কয়েকজন সামরিক কমান্ডারকে নিয়ে গঠিত একটি ছোট কিচেন ক্যাবিনেটের মাধ্যমেই দেশ চালাচ্ছেন।

কর্তৃত্ববাদী বা একনায়কতান্ত্রিক শাসকদের ক্ষেত্রেও কিচেন ক্যাবিনেটের উপস্থিতি শুধু একটি কৌশল নয়, বরং একনায়কের টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার। একনায়কতান্ত্রিক শাসনে প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রকাঠামো, সংসদ বা আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভা সম্পূর্ণ দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় থাকে। উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন দেশটির আনুষ্ঠানিক প্রশাসন বা দলের চেয়ে একটি অত্যন্ত গোপন এবং বিশ্বস্ত ‘কোর গ্রুপ’-এর মাধ্যমে পরমাণুনীতি থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ সমস্ত দমনমূলক সিদ্ধান্ত নেন। কিমের এই আধুনিক কিচেন ক্যাবিনেটের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য হলেন তার ছোট বোন কিম ইয়ো জং এবং দেশের শীর্ষ দু-একজন সামরিক ও প্রোপাগান্ডা প্রধান।

সোভিয়েত ইউনিয়নের স্টালিনের আমলে আনুষ্ঠানিক ‘পলিটব্যুরো’ বা মন্ত্রিসভা থাকলেও, রাষ্ট্রের আসল নীতিনির্ধারণ হতো একটি ইনার সার্কেলে। স্টালিন মাঝরাতে তার ক্রেমলিনের দপ্তরে বা ব্যক্তিগত বাসভবনে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নিয়ে নৈশভোজ এবং মদ্যপানের আসর বসাতেন। ভোররাত পর্যন্ত চলা এই অনানুষ্ঠানিক আসরগুলোই ছিল তার আসল ‘কিচেন ক্যাবিনেট’।

জার্মানিতে হিটলারের শাসনব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সেখানে আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক ১৯৩৮ সালের পর কার্যত বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। হিটলার বার্লিনের চ্যান্সেলারি কিংবা বাভারিয়ার পাহাড়ি বাসভবনে তার বিশ্বস্ত কয়েকজন নাৎসি নেতার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে দেশ চালাতেন। হিটলারের কিচেন ক্যাবিনেটের মূল স্তম্ভ ছিলেন প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস, বিমানবাহিনী প্রধান হারমান গোয়েরিং, এসএসপ্রধান হাইনরিখ হিমলার এবং তার ব্যক্তিগত সচিব মার্টিন বোরম্যান।

ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের শাসনব্যবস্থা ছিল পারিবারিক ও আঞ্চলিক কিচেন ক্যাবিনেটের একটি নিখুঁত উদাহরণ। সাদ্দাম হোসেনের আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভা ‘রেভল্যুশনারি কমান্ড কাউন্সিল’ থাকলেও, রাষ্ট্রের গোয়েন্দা, সামরিক ও ভূরাজনৈতিক বড় সিদ্ধান্তগুলো আসত তার অত্যন্ত সংকীর্ণ একটি পারিবারিক ও উপজাতীয় বৃত্ত থেকে। তার দুই ছেলে (উদে ও কুসে), তার সৎ ভাই বারজান আল-তিকরিতি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী আদনান খাইরাল্লাহ ছিলেন এই ইনার সার্কেলের মূল চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশে কিচেন ক্যাবিনেট

১৯৮০-এর দশকে জেনারেল এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে দৃশ্যমান বড় মন্ত্রিসভা থাকলেও, রাষ্ট্রের মূল রাজনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো সেনানিবাসের ভেতরে বসা তৎকালীন প্রভাবশালী সামরিক এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত অনানুষ্ঠানিক কিচেন ক্যাবিনেটেই চূড়ান্ত হতো। খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে (১৯৯১-৯৬) কিচেন ক্যাবিনেটটি ছিল মূলত দক্ষ আমলা ও প্রবীণ রাজনীতিকদের নিয়ে গঠিত একটি সহায়ক ব্যবস্থা। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০১-০৬) এসে সেই অনানুষ্ঠানিক বৃত্তটি ‘হাওয়া ভবন’-এর রূপে একটি সমান্তরাল ক্ষমতা কেন্দ্রে পরিণত হয়, যা আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিপরিষদের সাংবিধানিক গুরুত্বকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছিল।

শেখ হাসিনার (২০০৯-২৪) শাসনামলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণ। শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক বলয়, বিশ্বস্ত সামরিক কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয় ও মন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিয়োগকৃত কজন উপদেষ্টাকে নিয়ে কিচেন ক্যাবিনটে গড়ে উঠেছিল। সাধারণ ক্যাবিনেট মন্ত্রীরা এসব সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রায় সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকতেন এবং অনেক সিনিয়র মন্ত্রীও আক্ষেপ করে বলতেন, তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা খবরের কাগজ বা প্রজ্ঞাপন জারির পর জানতে পারতেন।

অন্তর্বর্তী সরকারে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমলেও একটি ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ থাকার গুঞ্জন বা গুঞ্জনোত্তর আলোচনা-সমালোচনাকে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একটি নিয়মিত নির্বাচিত সরকারের চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছাত্র-জনতার একটি অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের পর, সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রায় রাষ্ট্রকাঠামো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে এ সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। প্রতিদিনের নানামুখী ক্রান্তিকালীন সংকট ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২৫-৩০ জন উপদেষ্টার সবাইকে নিয়ে প্রতিদিন আনুষ্ঠানিক বৈঠক করা বা দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থেই অনেক সময় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দীর্ঘ বৈশ্বিক কর্মজীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘসূত্রতার চেয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ছোট, দক্ষ এবং বিশ্বস্ত টিমের মাধ্যমে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় কিংবা সংস্কারের রূপরেখা তৈরির মতো তাৎক্ষণিক ও সংবেদনশীল বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার পাশে তিন-চারজনের একটি ‘কোর গ্রুপ’ বা কিচেন ক্যাবিনেট থাকা রাষ্ট্রযন্ত্রকে গতিশীল রাখার স্বার্থেই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং অনিবার্য।

এখানে একটি সূক্ষ্ম শাসনতান্ত্রিক বাস্তবতার কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। অনেক সময় সরকারের ভেতরে মূল নেতার অজান্তেই সমমনা কয়েকজন সদস্য মিলে নিজস্ব একটি প্রভাবশালী বলয় বা ‘ক্ষমতার উপকেন্দ্র’ (Sub-Clique) তৈরি করেন। তারা হয়তো অনানুষ্ঠানিক আড্ডা, নৈশভোজ বা খেলাধুলার সুযোগ নিয়ে নিজেদের মধ্যে কোনো কৌশল বা ঐকমত্য তৈরি করেন, যা পরে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে সম্মিলিতভাবে উপস্থাপন করে সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। একে সরাসরি প্রধান নেতার ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বলা না গেলেও, ক্ষমতার রাজনীতিতে এটি একটি চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক আচরণ। রাজনীতি বিজ্ঞানে একটি শব্দ আছে—‘ক্যামেরিলা’। এর অর্থ হলো প্রধান শাসকের চারপাশের এমন একটি অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠী, যারা নিজেদের স্বার্থে বা নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে পর্দার আড়ালে একজোট হয়ে কাজ করে। রাষ্ট্র পরিচালনায় মূল নেতার সরলতা বা ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে তার চারপাশের মানুষ এভাবেই অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার বলয় তৈরি করে নেয়।

পরিশেষে বলা যায়, কিচেন ক্যাবিনেট কোনো আইনি প্রতিষ্ঠান না হলেও আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় এর উপযোগিতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এটি রাষ্ট্রনেতাদের দ্রুত, গোপন ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। কিচেন ক্যাবিনেট কোনো কাঠামোগত অপরাধ বা দোষের কিছু নয়। ফ্যাসিবাদী বা একনায়কতান্ত্রিক শাসনে এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও জবাবদিহি এড়ানোর হাতিয়ার হতে পারে; কিন্তু সংকটে পড়া একটি রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন, গতিশীল ও সুরক্ষিত করার জন্য সরকারপ্রধানের পক্ষে এমন একটি বিশ্বস্ত, ক্ষুদ্র ও দক্ষ বলয়ের ওপর ভরসা করা রাষ্ট্রস্বার্থেই সম্পূর্ণ যৌক্তিক। তবে এই সংস্কৃতির ইতিবাচক সাফল্য তখনই নিশ্চিত হয়, যখন তা আনুষ্ঠানিক ক্যাবিনেটের মর্যাদা এবং আইনি ক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে খর্ব না করে শুধু একটি স্বচ্ছ ও সহায়ক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে । গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা ও রাষ্ট্রীয় দক্ষতার মধ্যে এই ভারসাম্য বজায় রাখাই যেকোনো প্রশাসনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অন্তর্বর্তী সরকার

drkhalid09@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...