আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভূরাজনীতি, সফট পাওয়ার ও বায়োটেকনোলজি

এ টি এম জান্নাতুল মোসনাজ

ভূরাজনীতি, সফট পাওয়ার ও বায়োটেকনোলজি

কয়েক বছর আগেও ভূরাজনীতি বাংলাদেশে খুব কম আলোচিত বিষয় ছিল। তবে ২০২৩-২৪ সালের নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর সক্রিয়তা এবং শাসক দলের ভারতকে জড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ার ফলে এটি জনসাধারণের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। এখন এটি শুধু পাঠ্যপুস্তক বা সেমিনারের বিষয় নয়, বরং চায়ের দোকানেও আলোচিত হচ্ছে, যা জনগণের সচেতনতা বাড়িয়ে সরকারকে সঠিক পথে রাখার চাপ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের কারণে যেমন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এটি একটি বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তেমনি বিশ্ব ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর। তার নীতিগত পরিবর্তন, ইউরোপ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও ইউক্রেন ইস্যু বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা তৈরি করে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ, চীনের তাইওয়ান মহড়া ও ফিলিস্তিনে ইসরাইলি গণহত্যা আন্তর্জাতিক আইনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।

বিজ্ঞাপন

এশিয়ায় ভারতের আগ্রাসী ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ, বিশেষ করে বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত হত্যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর আধিপত্যের বিপরীতে ছোট ও দুর্বল দেশগুলো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে, যেখানে তাদের নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক অবস্থান রক্ষায় সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক শক্তিগুলোর স্বার্থ জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নিকট বাণিজ্য ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কই মুখ্য হয়ে উঠবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন সহযোগী, যেখানে পোশাক খাত অন্যতম।

অন্যদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ও পারমাণবিক প্রকল্পে সম্পর্ক থাকলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক অর্থনীতি, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় গভীর হচ্ছে। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বিনিয়োগকারী এবং সামরিক অংশীদার। তুরস্কের সঙ্গে সামরিক ঘনিষ্ঠতাও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর নজর কেড়েছে।

ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও বাণিজ্য ঘাটতি, তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত হত্যা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি ও সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং তাদের মিডিয়ায় বাংলাদেশ নিয়ে অপপ্রচারের কারণে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, যা দুই দেশের আস্থার সম্পর্ক নষ্ট এবং স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।

এতে করে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক কৌশল পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি আমাদের বৈশ্বিক প্রভাব সীমিত করেছে। তবে বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনূসের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক কার্যক্রম নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। সার্ক, বিমসটেক ও আসিয়ানে বাংলাদেশের ভূমিকা প্রসারে তার প্রচেষ্টা ইতিবাচক। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশকে ভারতের চশমা ছাড়াই মূল্যায়ন করতে আগ্রহী।

ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর স্বার্থের টানাপড়েনে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে দক্ষিণ এশিয়ার সফট পাওয়ার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কারণ ‘সফট পাওয়ার’ কৌশলই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপান সফট পাওয়ার ব্যবহার করে বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার করছে, যা বাংলাদেশও করতে পারে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, বাংলাদেশের মতো ছোট দেশ কীভাবে সফট পাওয়ার হবে।

সফট পাওয়ার এমন একটি ক্ষমতা, যা জোর-জবরদস্তি বা সামরিক শক্তি ব্যবহারের পরিবর্তে প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, মূল্যবোধের মাধ্যমে অন্যদের প্রভাবিত করে একটি দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। এই ধারণাটি ১৯৮০-এর দশকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ নাই প্রবর্তন করেন। প্রযুক্তির সুফল অন্যান্য দেশে রপ্তানি, কূটনৈতিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক সংযোগ, মানবসম্পদ ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সফট পাওয়ার হয়ে তার কৌশলগত অবস্থানকে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে শক্তিশালী করতে পারে।

বিশ্বজুড়ে বায়োটেকনোলজি (জীবপ্রযুক্তি) শুধু বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের একটি ক্ষেত্র নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের সফট পাওয়ার বৃদ্ধির একটি কার্যকর উপায়। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে ন্যাটো এগিয়ে থাকার জন্য প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কৌশলকে উন্নত করার লক্ষ্যে এক বিলিয়ন ইউরো বাজেটের একটি প্রকল্প, ‘ন্যাটো ইনোভেশন ফান্ড চালু’ করেছে। যেখানে অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তির পাশাপাশি বায়োটেকনোলজিতে বিনিয়োগ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট-২০২২-এর মাধ্যমে দ্য ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশন অন ইমার্জিং বায়োটেকনোলজি (এনএসসিইবি) নামে একটি দ্বিদলীয় মার্কিন আইনসভা কমিশন গঠন করে। যারা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশলে জীবপ্রযুক্তিকে কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে।

যদি বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে জীবপ্রযুক্তিকে সঠিক উপায়ে ব্যবহার করতে পারে, তবে এটি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধশিল্প এবং পরিবেশ সংরক্ষণে বায়োটেকনোলজির অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে। চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই সেক্টরে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি আদান-প্রদানের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফরম তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের কৃষি খাত অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। জীবপ্রযুক্তির ব্যবহার করে উন্নত বীজ, টিস্যু কালচার ও জৈব সার উৎপাদন কৃষিতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। জলবায়ু-সহনশীল ফসল উদ্ভাবন, উদ্ভিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং এ প্রযুক্তি রপ্তানি করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কৃষি কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে করে যে শুধু দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে তা নয়, বরং বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করা সম্ভব।

বাংলাদেশের ওষুধশিল্প ইতোমধ্যেই জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছে এবং ১৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করছে। তবে, বায়োটেকনোলজি খাতে অগ্রসর হলে আরো বড় বাজার দখল করা সম্ভব। বায়োফার্মাসিউটিক্যালস উৎপাদন ও রপ্তানিতে বিনিয়োগ দেশকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করবে এবং স্বাস্থ্য খাতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জনের পথ সুগম করবে।

বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য কম খরচে উচ্চমানের ওষুধ সরবরাহের মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সহযোগী হয়ে উঠতে পারে। সম্ভাব্য খাতগুলো হলো : ভ্যাকসিন উৎপাদন ও রপ্তানি, বায়োসিমিলার ওষুধ, মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি, হরমোন ও এনজাইম চিকিৎসা, জিন থেরাপি ও স্টেম সেল থেরাপি। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ‘ভ্যাকসিন ডিপ্লোমেসি’ বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছিল।

ভারতের ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি এবং চীন থেকে টিকা কিনতে বাধ্য হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সর্বোচ্চসংখ্যক টিকা অনুদান দেয়। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ যদি নিজস্ব ভ্যাকসিন উৎপাদন করে, তাহলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে। গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেশ নিজস্ব স্বাস্থ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য নিরাপত্তায়ও নেতৃত্ব দিতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য বায়োটেকনোলজিভিত্তিক সমাধান তৈরি করে অর্থাৎ বায়োরেমিডিয়েশন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে পরিবেশ উন্নয়নে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে পারে এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বে ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ যদি উন্নত গবেষণা কেন্দ্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিক্ষার্থী ও গবেষকদের আকৃষ্ট করতে পারে এবং বায়োটেকনোলজি ইনোভেশনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তবে এটি দেশের জন্য এক নতুন কূটনৈতিক শক্তি হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া এবং তার বাইরের দেশগুলোয় বাংলাদেশের প্রভাব বাড়াবে।

এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করে বায়োটেকনোলজিকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে গড়তে হবে। নীতিগত সমন্বয় হলে আন্তর্জাতিক বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ সম্ভব। দেশব্যাপী জীবপ্রযুক্তি গবেষণার জন্য বিশেষায়িত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আর এ জন্য বেসরকারি খাত এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে গবেষণায় তহবিল বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা জরুরি। উন্নত গবেষণা কেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর ত্বরান্বিত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দক্ষ শ্রমশক্তি এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচ বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখবে। যদি সঠিক নীতি, বিনিয়োগ এবং নেতৃত্ব নিশ্চিত করা যায়, তবে বায়োটেকনোলজি বা জীবপ্রযুক্তি হবে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচিতি এবং গর্বের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

লেখক : ম্যানেজার, সিসমার্ক লিমিটেড

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন