আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দ্য স্টোরি অব সাইফুল আজম

ইসরাইল ও ভারতের দুঃস্বপ্ন এক বাংলাদেশি কিংবদন্তি

শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

ইসরাইল ও ভারতের দুঃস্বপ্ন এক বাংলাদেশি কিংবদন্তি

গাজা, অন্তহীন এক মৃত্যুফাঁদ। এই উপত্যকায় অবরুদ্ধ মানুষ প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছে ইসরাইলি নৃশংসতার। এবার ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে তাড়িয়ে দিতে চাচ্ছে ইসরাইল ও আমেরিকা। উপত্যকাজুড়ে তৈরি করেছে বিভীষিকা।

বিজ্ঞাপন

অবরুদ্ধ উপত্যকা গাজা যখন উত্তপ্ত হয়, তখন আলোচনায় উঠে আসে বাংলাদেশি এক বীরের গল্প। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধে এই বীর ছিলেন ইসরাইলের আতঙ্ক। তার নাম সাইফুল আজম। তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন ২০২০ সালের ১৪ জুলাই। ওই সময় তার মৃত্যুতে শোকাহত ছিল ফিলিস্তিনসহ মুসলিমবিশ্ব। তবে বাংলাদেশের ভেতর তিনি বেঁচে ছিলেন অনেকটাই নীরবে। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। সাইফুল আজম জন্মেছিলেন ১৯৪১ সালে, পাবনা জেলায়।

১৪ জুন, রোববার। ঢাকায় মৃত্যু হয় এক ব্যক্তির। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। এই বৃদ্ধ জন্মেছিলেন ১৯৪১ সালে, পাবনা জেলায়।

সাইফুল আজমের নামের আগে লেখা হতো ‘লিভিং ইগলস’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া খেতাব এটি। আকাশপথে সাহসের সঙ্গে যারা লড়াই করেছেন, এমন ২২ জনকে এই খেতাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের বৈমানিক সাইফুল আজমও।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খেতাব পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এই খেতাব যখন পেয়েছেন, তিনি নিশ্চয়ই বড় মাপের কেউ। তিনি ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের প্রশিক্ষক। বিদেশে তার রয়েছে বিপুল সুনাম।

কেন এত সুনাম?

কারণ, তিনি চার-চারটি দেশের বিমানবাহিনীর হয়ে কাজ করেছেন। আর আকাশ লড়াইয়ে দেখিয়েছেন সাহসিকতা। সাইফুল আজম নামের এই বৈমানিক ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে জর্ডানের হয়ে চারটি ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেন। এখন পর্যন্ত কোনো পাইলট একা ইসরাইলের এত বিমান ধ্বংস করতে পারেননি। এই যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন পাকিস্তান বাহিনীতে কর্মরত। সেখান থেকে ডেপুটেশনে তাকে পাঠানো হয় জর্ডান বাহিনীতে। জর্ডান বাহিনীতে এই সাফল্যের পর ইরাক থেকে তাকে চেয়ে পাঠানো হয়। জর্ডান সাইফুল আজমকে ইরাকে পাঠায় এবং সেখানেও বীরত্ব দেখান। এই বীরের মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছিল ফিলিস্তিনের মাটিতে।

সাইফুল আজমের বীরত্ব এখানেই শেষ নয়। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে ভারতের যুদ্ধবিমানও ধ্বংস করেন তিনি।

সাইফুল আজমের অতীত বর্ণাঢ্য, সাগরের মতো বিশাল। আরব-ইসরাইল ছয় দিনের যুদ্ধে মাত্র দুটি আকাশ লড়াইয়ে চারটি ইসরাইলি বিমান ধ্বংস করা সহজ কাজ নয়। এই কঠিন কাজটা তিনি করেছিলেন ফিলিস্তিনিদের জন্য। মুসলমানদের পবিত্র ভূমি আল-আকসার জন্য।

তার মৃত্যুর পর ফিলিস্তিনের ইতিহাসবিদ ওসামা আল-আশকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘আল-আকসা মসজিদকে রক্ষায় আমাদের এই লড়াইয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ভাইয়েরা সঙ্গে ছিল।’

ফিলিস্তিনের অধ্যাপক নাজি শৌকরি টুইট বার্তায় লিখেছিলেন, ‘সাইফুল আজম ফিলিস্তিনকে ভালোবাসতেন এবং জেরুজালেমের স্বার্থে লড়াই করেছিলেন।’ শৌকরি সাইফুলকে সালাম জানিয়ে আল্লাহর কাছে তার জন্য অনুগ্রহ চেয়েছিলেন।

ফিলিস্তিনের আরো অনেকেই তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছিলেন। তার অনন্য বীরত্বের কথা তুলে ধরেছিলেন। তাহলে কি এই বীর শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য!

তিনি বাংলাদেশের জন্য কী করেছেন?

যখন পাকিস্তান বাহিনীতে ছিলেন, এই সাইফুল আজম লড়েছেন দেশের জন্য। যখন মধ্যপ্রাচ্যে ছিলেন, লড়েছেন দায়িত্ব আর বিশ্বাসের জন্য। আর একাত্তরের অস্থির সময়ে ছিলেন বাংলাদেশের জন্য।

এবার চলুন ঘুরে আসা যাক তার লড়াকু জীবন থেকে :

তখন ১৯৬৭ সাল। তৃতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ছয় দিনের এই যুদ্ধে চার আরব রাষ্ট্র মিসর, জর্ডান, সিরিয়া ও ইরাকের ওপর তুমুল বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। এতে মিসরের প্রায় পুরো বিমানবাহিনীর সরঞ্জাম উড়ে যায় ধুলোর মতো। সিরীয় বিমানবাহিনীর তিন ভাগের দুই ভাগ শক্তি ধ্বংস হয়। আরব দেশগুলোকে ঘিরে ধরে বিপদ। এর মধ্যে ফিলিস্তিনের গাজা ও সিনাইয়ের দখল নিয়ে নেয় ইসরাইল। পশ্চিমতীর এবং জেরুজালেমে কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়নি তাদের। ইসরাইল দখল নেয় সিরিয়ার গোলান মালভূমির। শক্তি ও সামর্থ্য ছিল আরবদের বেশি। তবে কৌশলে এগিয়ে ছিল ইসরাইল।

ঠিক এই পরিস্থিতিতে একজন বীরের উদয় হয় আরবদের তাঁবুতে। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ওই সময়ের বাঁক বদলে দেওয়া সেই বীর সাইফুল আজম। যিনি পূর্ব পাকিস্তান থেকে ডেপুটেশনে গিয়েছিলেন জর্ডানে। সেদিনের পূর্ব পাকিস্তান আজকের বাংলাদেশ।

দিনটি ছিল জুনের ৫ তারিখ। সাইফুল আজম তৈরি হয়ে যান বিমান নিয়ে। শূন্যে তাকে লড়তে হবে ইসরাইলের বিমানের সঙ্গে। এই লড়াইকে ডাকা হয় ‘এয়ারস্পেস ডগ ফাইট’।

দুপুর ১২টা বেজে ৪৮ মিনিট। খবর এলো মিসর বিমানবাহিনীর সব সরঞ্জাম গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইল। এখন জর্ডানের মাফরাক ঘাঁটির দিকে আসছে চারটি বিধ্বংসী বিমান। এর বিপরীতে মাফরাক ঘাঁটি থেকে উড়ল জর্ডানের দুর্বল চারটি ‘হকার হান্টার’। এর একটির পাইলট সাইফুল আজম।

পাল্টা প্রতিরোধ গড়লেন তিনি। ঈগলের মতো পাখা মেলে দিলেন দখলদারদের গতির সামনে। ‘হকার হান্টার’-এ বসেই সাইফুল আজম নিশানা তাক করলেন। ঘায়েল হলো দুই ইসরাইলি সেনা। একই সঙ্গে মাটিতে ফেলে দিলেন ইসরাইলি এক ‘সুপার মিস্টেরে’ বিমান। আরো একটি আঘাত হানলেন তিনি। প্রায় অকেজো হয়ে এলো ইসরাইলের আরো এক জঙ্গি বিমান। ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে সেই বিমান পালিয়ে গেল নিজেদের সীমানায়।

সাইফুলের এই দুঃসাহসিকতায় মুগ্ধ হন জর্ডানের বাদশাহ হুসেইন। বৈমানিকদের অনুপ্রেরণা দিতে তাঁবুতে এসে হাজির হন তিনি। সেই সন্ধ্যায় সাইফুল আজমকে নিজের গাড়িতে তুলে নেন সুলতান। বাদশাহর সঙ্গে তিনি দেখতে যান আহত দুই সহযোদ্ধাকে।

এই কৃতিত্বের জন্য জর্ডান তাকে ‘হুসাম-ই-ইস্কিলাল’ সম্মাননা দেয়।

ওই ঘটনার দুদিন পর ইরাকের বিমানবাহিনী জর্ডানের কাছে সাইফুল আজমকে চেয়ে পাঠায়। খবর আসে ইরাক বিমানবাহিনীর ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে ইসরাইল। অধিনায়কের ভূমিকায় থেকে এই হামলা রুখে দিতে হবে আজমকে।

জুন মাসের ৭ তারিখ। ইরাকের ‘এইচ-থ্রি’ ও ‘আল-ওয়ালিদ’ ঘাঁটি রক্ষার দায়িত্ব তার ওপর। সঙ্গে আছেন আরেক পাইলট ইহসান শার্দুম। উড়ে আসে ইসরাইলের চারটি ‘ভেটোর বোম্বার’ ও দুটি ‘মিরেথ থ্রিসি’। এগুলোর বিপরীতে ইরাকও গড়ে তুলে শক্ত প্রতিরোধ। একটি ইসরাইলি ‘মিরেজ থ্রিসি’ বিমানের ক্যাপ্টেন গিডিওন দ্রোর গুলিতে নিহত হন আজমের উইংম্যান। সেই সঙ্গে মাটিতে পড়ে যায় দুটি ইরাকি বিমান।

ফুঁসে ওঠেন সাইফুল আজম। তিনি নিশানা ঠিক করেন ‘মিরেজ থ্রিসি’ এবং এর পইলট গিডিওন দ্রোর দিকে। পাল্টা আঘাত হানেন তিনি। ক্যাপ্টেন দ্রোর তখন বিমান থেকে প্যারাস্যুট নিয়ে বের হন। পরে তাকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক করা হয়।

সাইফুল আজম আরো একটি ইসরাইলি ‘ভেটোর বোম্বার’ ধ্বংস করেন। সেটার ক্যাপ্টেন গোলান বিমান থেকে বের হয়ে এসে ধরা দেন।

একজন সাইফুল আজম ব্যর্থ করে দেন ইসরাইলি বাহিনীকে। দুজন যুদ্ধবন্দির বিনিময়ে ইসরাইলের কাছে আটক জর্ডান ও ইরাকের হাজারের বেশি সেনাকে মুক্ত করা হয়। ইরাক তাকে দেয় ‘নাত আল-সুজাহ’ সম্মাননা।

আজমের এই বীরত্ব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই ছিল না। বরং নিজের দেশ পাকিস্তানের জন্যও বড় বীরত্ব দেখিয়েছিলেন এর দুই বছর আগে। তখন ১৯৬৫ সাল। পাক-ভারত যুদ্ধ চলছে। ‘এফ-৮৬ স্যাবরজেট’ জঙ্গি বিমান নিয়ে তিনি একটি সফল গ্রাউন্ড অ্যাটাক করেন। ফিরে আসার সময় ভারতের হামলার শিকার হয় তার বৈমানিক দল। পাল্টা হামলা করেন সাইফুল। তার নিশানায় একটি ভারতীয় ‘ফোল্যান্ড নেট’ জঙ্গি বিমান আক্রান্ত হয়। যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক করা হয় ফ্লাইট অফিসার মায়াদেবকে।

তখনকার জন্য আকাশপথে সরাসরি লড়াইয়ে এ ঘটনা ছিল বিরল। এই কৃতিত্বের জন্য পাকবাহিনী তাকে সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘সিতারা-ই-জুরাত’ দেন।

পাক-ভারত যুদ্ধে বীরত্বের কারণেই তাকে পাঠানো হয় জর্ডানে। তার সঙ্গে গিয়েছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর আরো কয়েকজন পাইলট।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরে ১৯৬৯ সালে ‘শেনিয়াং এফ-৬’ জঙ্গি বিমানের ফ্লাইট কমান্ডার হন আজম। পরে পাকবিমান বাহিনীর ‘ফাইটার লিডারস স্কুল’-এর ফ্লাইট কমান্ডারের দায়িত্ব নেন তিনি।

এরপর তার সামনে এসে দাঁড়ায় আরেক বাস্তবতা, ১৯৭১ সাল। আগেই বলা হয়েছে, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের প্রশিক্ষক ছিলেন তিনি। আর বিমান ছিনতাইয়ের গোপন পরিকল্পনাটিও তার সঙ্গে আলাপ করেছিলেন মতিউর। এ ছাড়া করাচি থেকে একটি জেটবিমান ছিনতাই করার পরিকল্পনা ছিল আজমের। সে অনুযায়ী মার্চের ৬ তারিখে স্ত্রী ও সন্তানকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন তিনি।

‘টি-৩৩’ জঙ্গি বিমান নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় শহীদ হন মতিউর। এরপর পাক-গোয়েন্দা সংস্থার সন্দেহ যায় সাইফুল আজমের দিকে। তাকে রিমান্ডে নিয়ে টানা ২১ দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এর আগেই তার ওপর উড্ডয়ন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার সঙ্গে আরো খারাপ কিছুও হতে পারত। কিন্তু পাকিস্তানের জন্য যে বৈমানিক এতকিছু করেছেন, তাকে হত্যা করতে চায়নি দেশটির সামরিক বাহিনী। কথিত আছে, তাকে হত্যা না করার জন্য জর্ডানের বাদশাহর অনুরোধ ছিল। সে যাই হোক বেশ কিছুদিন অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয় আজমকে।

১৯৭২ সালে তিনি ফিরে আসেন বাংলাদেশে। ১৯৭৭ সালে উইং কমান্ডার হন। পরে বিমানবাহিনীর ঢাকা ঘাঁটির অধিনায়ক হন। ডিরেক্টর অব ফ্লাইট সেফটি ও ডিরেক্টর অব অপারেশনসের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৭৯ সালে অবসর নেন সাইফুল আজম।

পরে সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটির চেয়ারম্যান, ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের এমডির দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৯১ থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত পাবনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তার রাজনৈতিক দল বিএনপি। শেষ জীবনে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘নাতাশা ট্রেডিং এজেন্সির’ এমডির দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৪ জুন এই আকাশযুদ্ধের কিংবদন্তির মৃত্যু হয় ‘সাধারণ এক বৃদ্ধ’ হিসেবে।

লেখক : সাংবাদিক

smmoshahid@yahoo.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন