আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিশ্বে বিরল মৃত্তিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম ভান্ডার গ্রিনল্যান্ড

সানা খান

বিশ্বে বিরল মৃত্তিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম ভান্ডার গ্রিনল্যান্ড

ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ; কিন্তু আয়তনের তুলনায় এখানে জনবসতি সবচেয়ে কম। এই দ্বীপের কৌশলগত অবস্থান এবং এর বিপুল খনিজ সম্পদের জন্য এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দ্বীপটি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এই দ্বীপটি দখলের হুমকি পুনর্ব্যক্ত করার পর গ্রিনল্যান্ডে বাড়তি সৈন্য পাঠিয়েছে ডেনমার্ক সরকার। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে ইউরোপের আটটি দেশের ওপর ট্রাম্প ব্যাপকভাবে শুল্ক আরোপ করার হুমকি দিলেও পরে তা থেকে সরে আসেন। কিন্তু এতে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যে রকম মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে, তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এই পরিস্থিতিতে ডেনিশ ও গ্রিনল্যান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর দেখা করার কথা রয়েছে। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক নজর রাখছে চীন ও রাশিয়া।

২০২৩ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, ইউরোপীয় কমিশন ‘গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল’ হিসেবে যে ৩৪টি খনিজ পদার্থের নাম তালিকাভুক্ত করেছে, তার মধ্যে ২৫টিই আছে গ্রিনল্যান্ডে। মূল্যবান এসব খনিজ সম্পদের ওপরই নজর দিয়েছেন ট্রাম্প। বিশেষ করে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য অপরিহার্য উপাদান বিরল মৃত্তিকার জন্য চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরশীলতা কমাতে গ্রিনল্যান্ডের বিরল মৃত্তিকার বিশাল ভান্ডার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই প্রয়োজন। পরিবেশগত কারণে অনেক আগে থেকেই তেল ও গ্যাস উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া আমলাতান্ত্রিক বাধা এবং দ্বীপের আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিরোধিতার কারণে এই ভূখণ্ডের মূল্যবান সম্পদের খনিগুলো এখনো অনুন্নত রয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

বিরল মৃত্তিকা

গ্রিনল্যান্ডের নানা ধরনের খনিজ সম্পদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে রেয়ার আর্থ বা বিরল মৃত্তিকা। এর মজুত রয়েছে দ্বীপের দক্ষিণ গার্ডার প্রদেশে। ক্রিটিক্যাল মেটালস করপোরেশন, এনার্জি ট্রানজিশন মিনারেলস এবং নিও পারফরম্যান্স ম্যাটেরিয়ালসের মতো কোম্পানিগুলো এসব সম্পদ আহরণে নানা প্রকল্প নিলেও কিছু আইনি বিরোধের কারণে এর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং বায়ু টারবাইনে ব্যবহৃত স্থায়ী চুম্বকের জন্য বিরল মৃত্তিকা উপাদানগুলো অপরিহার্য। বিশ্বব্যাপী সবুজ জ্বালানি রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও এই খনিজ সম্পদটি।

গ্রাফাইট

গ্রিনল্যান্ডে গ্রাফাইটের ব্যাপক মজুত রয়েছে। এই খনিজ পদার্থটি আহরণের জন্য গ্রিনরক নামে একটি কোম্পানির নেওয়া অ্যামিটসক প্রকল্পটির কার্যক্রম এখনো সেভাবে শুরু হয়নি। প্রাকৃতিক গ্রাফাইট মূলত ইভি ব্যাটারি এবং ইস্পাত তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, যা গ্রিনল্যান্ডকে বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান ব্যাটারিশিল্পের সম্ভাব্য সরবরাহকারী হিসেবে স্থান করে দিয়েছে।

তামা ও নিকেল

গ্রিনল্যান্ডে বিশেষ করে দ্বীপের উত্তর-পূর্ব এবং মধ্য-পূর্বাঞ্চলে তামার মজুত কী পরিমাণ আছে, তা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। লন্ডনে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান এইট্টি মাইল দ্বীপে তামা ও নিকেল মজুতের জন্য পরিচিত ডিস্কো-নুসুয়াক সাইট উন্নয়নে কাজ করছে। এখানে নিকেল, প্ল্যাটিনাম ও কোবাল্টও আছে এবং নিকেল আহরণ ও মজুত করা এখানে সাধারণ একটি বিষয়। অ্যাংলো আমেরিকান কোম্পানি ২০১৯ সাল থেকে পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের অনুমোদন পেয়েছে। স্টেইনলেস স্টিল উৎপাদন এবং ইভি ব্যাটারি প্রযুক্তির জন্য এসব ধাতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জিংক

উত্তর গ্রিনল্যান্ডে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত এলাকায় জিংকের মজুত রয়েছে। এই এলাকায় নেওয়া সিট্রোনেন ফজর্ড প্রকল্পকে বিশ্বের বৃহত্তম অনুন্নত জিংক-সিসার মজুতগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু এখনো এর বাণিজ্যিক উন্নয়ন কার্যক্রম খুবই সীমিত।

সোনা ও হীরা

দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের সেরমিলিগারসুক ফজর্ডের চারপাশে সোনার মজুত রয়েছে। গত বছর আমারক মিনারেলস কোম্পানি দ্বীপের মাউন্ট নালুনাক এলাকায় একটি খনি খনন করেছে। অন্যদিকে হীরার মজুত বেশি রয়েছে পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডে। দ্বীপের অন্যান্য এলাকাতেও হীরার সন্ধান পাওয়া যায়, যা এই ভূখণ্ডের খনিজ বৈচিত্র্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে এগুলোর উত্তোলন লাভজনক হতে পারে।

লোহা, টাইটানিয়াম-ভ্যানেডিয়াম, টাংস্টেন ও ইউরেনিয়াম

লৌহ আকরিকের মজুত দক্ষিণ, মধ্য ও উত্তর-পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডে অবস্থিত। টাইটানিয়াম ও ভ্যানাডিয়ামের মজুত দক্ষিণ-পশ্চিম, পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ইস্পাত সংকর ধাতুর জন্য ভ্যানাডিয়াম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। টাংস্টেন মূলত মধ্য-পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে বেশি পাওয়া যায়। ইনুইট আতাকাতিগিট সরকারের অধীনে ২০২১ সাল থেকে ইউরেনিয়াম অনুসন্ধানে খনন কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে বাই প্রোডাক্ট বা উপজাত হিসেবে ইউরেনিয়াম ধারণকারী বিরল-মৃত্তিকা প্রকল্পের উন্নয়ন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।

কৌশলগত প্রভাব

গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক পণ্যের একটি সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে এই ভূখণ্ডটিকে সামনে তুলে এনেছে। এখানে এমন সব খনিজ সম্পদ আছে, যা সবুজ প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য। তবে পরিবেশগত সুরক্ষা, আদিবাসীদের বিরোধিতা এবং আমলাতান্ত্রিক বাধা মূল্যবান এসব সম্পদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার গতিকে ধীর করে দিয়েছে। আর্কটিক অঞ্চলের এই দ্বীপের কৌশলগত অবস্থান এর ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্যকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এজন্যই যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অন্যান্য শক্তির দৃষ্টি পড়েছে গ্রিনল্যান্ডের ওপর, যারা এখানের খনিজ সম্পদ এবং আর্কটিক শিপিং রুট উভয় ক্ষেত্রেই প্রবেশাধিকার চাইছে।

বিশ্লেষণ

গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুযোগের প্রতিনিধিত্ব করছে। কিন্তু এগুলো আহরণ করা খুব সহজ নয়। এগুলো উত্তোলন করার ক্ষেত্রে পরিবেশগত নিয়মকানুন, স্থানীয় বিরোধিতা এবং জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বড় বাধা। এটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং সামাজিক/পরিবেশগত স্থায়িত্বের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে, যা অনেক সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।

ভূ-অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রিনল্যান্ডে মূল্যবান খনিজ সম্পদের মজুত এই দ্বীপটিকে সবুজ প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা উপকরণের জন্য বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, বিরল মৃত্তিকা ও গ্রাফাইট বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, বায়ু টারবাইন এবং স্থায়ী চুম্বকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী এই পণ্যগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে গ্রিনল্যান্ড চীনের বাইরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারে। চীন বর্তমানে এই পণ্যগুলোর বাজারের ওপর আধিপত্য বজায় রেখেছে।

এই পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে গ্রিনল্যান্ডের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখল করার সাম্প্রতিক হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র কেবল খনিজ সম্পদের জন্যই নয়, বরং আর্কটিক অঞ্চলে এর কৌশলগত অবস্থানের কারণেও গ্রিনল্যান্ডের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। চীনসহ অন্যান্য শক্তিগুলো গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মূল্যবান খনিজ সম্পদ এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই দ্বীপকে আর্কটিক অঞ্চলে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে পারে।

তবে দ্রুত খনিজ সম্পদ আহরণের ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া সামাজিক অস্থিরতা, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং ডেনমার্ক বা দ্বীপের আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে বিরোধের কারণ হতে পারে। অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি না করে গ্রিনল্যান্ডকে তার খনিজ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে টেকসই খনিজ সম্পদ আহরণ, সতর্ক নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ বিশাল সুযোগ তৈরির পাশাপাশি অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এই অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলোর দায়িত্বশীল সরবরাহকারী হবে, নাকি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে, তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের ওপর।

মডার্ন ডিপ্লোমেসি থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...