কিস্তি-৩

জুলাই কেন আমাদের লড়াই

জুলাই কেন আমাদের লড়াই

বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মতবিরোধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো গণভোটের রায়। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান দাবি হচ্ছে, গণভোটের এই রায় কার্যকর করা।

আলোচনায় গণপরিষদ গঠন প্রসঙ্গ

বিজ্ঞাপন

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা না হলেও নানা মহলে সম্ভাব্য পদ্ধতি নিয়ে পর্যালোচনা ছিল। সেই পর্যালোচনায় মূলত তিনটি পদ্ধতির কথা সামনে আসে—

১। সংবিধান পুনর্লিখন।

২। সংবিধান সংশোধন।

৩। সংবিধান সংস্কার।

সংবিধান পুনর্লিখনের প্রক্রিয়া হল—‘গণপরিষদ’ গঠন করা এবং সেই গণপরিষদের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান রচনা করা, যা মূলত এই জুলাই সনদ মেনেই তৈরি হবে। অর্থাৎ, প্রথম প্রক্রিয়াটি হল গণপরিষদ গঠন করে সংবিধান পুনর্লিখন।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে যে বিশেষ পরিষদ বা অ্যাসেম্বলি গঠিত হয়, তাকেই ‘গণপরিষদ’ বলা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭২ সালে এমন একটি গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল। তৎকালীন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে এই পরিষদের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং এই গণপরিষদই স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান তৈরি করে।

প্রশ্নবিদ্ধ ৭২-এর গণপরিষদ

তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭২ সালের সেই গণপরিষদের বৈধতা নিয়ে নিয়ে একটি আইনি প্রশ্ন আজ অবধি রয়ে গেছে। কারণ ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে যে গণপরিষদটি গঠিত হয়েছিল, তা স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট বা গণরায় নিয়ে গঠিত হয়নি। সেই গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল অবিভক্ত পাকিস্তানের ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে। উক্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেই নির্বাচনের গণরায় মেনে না নেওয়ার কারণেই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে সেই ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ওপর ভিত্তি করেই ঘোষণা করা হয় যে, উক্ত নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের যারা জয়লাভ করেছিলেন, তারাই হবেন বাংলাদেশের গণপরিষদের সদস্য এবং বাস্তবেও ঠিক তেমনটিই ঘটেছিল।

১৯৭০ সালের তদানীন্তন পাকিস্তান আমলের নির্বাচনের মাধ্যমে পাকিস্তানি নাগরিকদের ম্যান্ডেট বা গণরায়ের ভিত্তিতে যে পরিষদ গঠিত হয়েছিল, তাদের দ্বারাই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচিত ও প্রবর্তিত হয়েছিল। এই বিষয়টিই ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম একটি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ আইনি দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত।

তবে যে প্রক্রিয়াতেই হোক না কেন, তৎকালীন সময়ে একটি গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল এবং সেই গণপরিষদেই ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। এরপর ১৯৭২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়কালে এ দেশে এমন কোনো বিশেষ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি, যার কারণে পুনরায় আরেকটি গণপরিষদ গঠন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবে।

নতুন গণপরিষদ গঠনের প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই প্রশ্নটি পুনরায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্থাপিত হয় যে, দেশে আবার একটি নতুন গণপরিষদ গঠন করা হোক এবং সেই পরিষদের মাধ্যমে নতুনভাবে সংবিধান পুনর্লিখন করা হোক। যদি এই প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করা হত তবে পূর্ববর্তী সংবিধানে কী বিধিবদ্ধ রয়েছে—তা বিবেচনা করার কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকত না। ঠিক যেভাবে ১৯৭২ সালের সংবিধান রচনার সময় তদানীন্তন পাকিস্তানের সংবিধানে কী ছিল বা কী ছিল না তা বিবেচনা করা হয়নি।

২০২৪ এর বিপ্লবের পর একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে দেশ নতুনভাবে যাত্রা শুরু করবে- এমনটাই ছিল বিপ্লবীদের প্রত্যাশা। আর গণপরিষদের মাধ্যমে এই নতুন সংবিধান তৈরি হওয়া সম্ভব ছিল। গণপরিষদের দাবির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি তথা জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র জনতার। এই কারণেই জুলাই বিপ্লবের নেতৃবৃন্দ আন্দোলনের পর থেকেই সুনির্দিষ্ট কয়েকটি ধারণার ওপর গুরুত্বারোপ করতেন, যার মধ্যে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ গঠন এবং ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’—এই দুটি শব্দবন্ধ ছিল অত্যন্ত মৌলিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। মূলত এই ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ ও ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ নামক আকাঙ্ক্ষা দুটি বাস্তবে রূপায়ণের একমাত্র ফর্মুলা ছিল একটি নতুন গণপরিষদ গঠন করা। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি নতুন সংবিধান তৈরি করা সম্ভব হতো, তবে অত্যন্ত পোক্ত ও মজবুত ভিত্তির ওপর সম্পূর্ণ এক নতুন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হতে পারত।

পরিবর্তনের পথে বাঁধা

তবে এই আমূল পরিবর্তনের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াল সমাজ ও রাজনীতির স্বার্থান্বেষী কায়েমী গোষ্ঠী, যারা দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের সমাজ-রাষ্ট্রের জেঁকে বসা মোড়ল হিসেবে অধিষ্ঠিত আছে। কারণ প্রচলিত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে সবকিছু যদি নতুন করে গড়ে তোলা হয়, তবে তাদের সেই আধিপত্যের অবসান ঘটবে। এই কারণে তারা এমন কোনো মৌলিক বা কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে সায় দেয়নি। তাদের অভিমত ছিল- জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রে কিছু পরিবর্তন আসলে আসুক, তবে রাষ্ট্রের পূর্বতন মৌলিক কাঠামোটি অপরিবর্তীত থাকুক। সেই বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরেই যা কিছু সংশোধন প্রয়োজন, তা সম্পন্ন করা যাবে; কিন্তু মূল কাঠামোটি কোনোভাবেই বদলানো যাবে না। অর্থাৎ, প্রচলিত সংবিধান বহাল রেখে, তার ভেতরেই প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার পক্ষে তাদের মত।

২য় প্রস্তাব সংবিধান সংশোধন

এমতাবস্থায়, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সংবিধান সম্পূর্ণ বাতিল করার ধারণার পরিবর্তে, তা সংশোধনের ধারণাটি আলোচনায় এল। চলমান সংবিধানকে বহাল রেখে তার ভেতরে পরিবর্তন আনার দুটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। এর প্রথমটি হলো গতানুগতিক ও স্বাভাবিক পদ্ধতি, অর্থাৎ সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবর্তন আনা। এই রুটিন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সংবিধানে মোট ১৭টি সংশোধনী আনা হয়েছে। দেশের প্রায় প্রতিটি পার্লামেন্ট বা সংসদের মেয়াদকালেই কম-বেশি সংশোধনী গৃহীত হয়েছে। এ যাবৎ বাংলাদেশে মোট ১২টি জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে ১৭টি সংশোধনী সম্পন্ন হয়েছে। এটিই হলো সংবিধান পরিবর্তনের প্রচলিত বা সাংবিধানিক পদ্ধতি।

‘সংবিধান সংশোধনী’ স্থায়ী সমাধান নয়

সংবিধানের এই সংশোধন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে কিছু মূলনীতি অনুসরণ করতে হয়। অর্থাৎ, কোনো পরিবর্তন বা সংশোধনী আনতে তার একটি সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক বা আইনি পদ্ধতি রয়েছে, যেখানে জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনের প্রয়োজন পড়ে। রাষ্ট্রে সাধারণ কোনো বিল বা আইন পাস করার ক্ষেত্রে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হলেই চলে; কিন্তু সংবিধানের কোনো ধারা সংশোধন কিংবা কোনো আইন পরিবর্তন করতে হলে দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংসদে এই দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি অর্জিত হলে সংবিধানের সংশোধনী বিলটি পাস হয় এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংবিধানে সেই পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত হয়।

তবে কেবল সংসদে বিল পাস হওয়াই কোনো সংশোধনীর স্থায়িত্বের শেষ কথা নয়। আজ সংসদে একটি সংশোধনী পাস হলেও তা আগামীকালই আবার আইনগত কারণে বাতিল হয়ে যেতে পারে। যেকোনো সংশোধনী সংবিধানে টিকে থাকতে হলে এবং তা বিধিসম্মত হতে হলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হয়। তা হল, উক্ত সংশোধনীটি কোনোভাবেই সংবিধানের মূলনীতি চতুষ্ঠয়ের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না। ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ছিল চারটি:

১. জাতীয়তাবাদ

২. ধর্মনিরপেক্ষতা

৩. গণতন্ত্র

৪. সমাজতন্ত্র

সুতরাং, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে, এমনকি সকল সদস্যের সম্মতিক্রমেও কোনো সংশোধনী পাস হওয়ার পর কেউ যদি উচ্চ আদালতে এই মর্মে চ্যালেঞ্জ করে যে, উক্ত সংশোধনীটি সংবিধানের এই মূল চার নীতির কোনো একটির সাথে সাংঘর্ষিক বা পরিপন্থী, তবে সেই সংশোধনীটি আইনিভাবে বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সবাই মিলে সম্পূর্ণ ঐকমত্যের ভিত্তিতেও যদি সংবিধানের কোনো অংশ সংশোধন করে, আর তা যদি মূলনীতির পরিপন্থী প্রমাণিত হয়, তবে সেই সংশোধনী বেআইনি ও বাতিল হবে। এই সুনির্দিষ্ট আইনি মারপ্যাঁচের কারণেই বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন সংশোধনী অতীতে বারবার আদালতের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে এবং উচ্চ আদালতের বিচারকগণ সেই সংশোধনীগুলোকে বিধিসম্মত হয়নি উল্লেখ করে বাতিল ঘোষণা করেছেন। সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি, এমনকি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হওয়া সত্ত্বেও সংবিধানের মূলনীতি পরিপন্থী হওয়ার কারণে অনেকগুলো সংশোধনী বেআইনি বলে বিবেচিত হয়েছে। এভাবেই অতীতে সংবিধানের পঞ্চম, ত্রয়োদশ, পঞ্চদশ ও ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল বাতিল ঘোষিত হয়েছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, সংবিধান পরিবর্তনের যে সাধারণ সংশোধনী বা অ্যামেন্ডমেন্ট প্রক্রিয়া, তা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এটি মূলত একটি রুটিন ওয়ার্ক যা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি সংবিধানেই নিয়মিত ঘটে থাকে।

এই সংশোধনীর আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো, কোনো একটি সংসদীয় মেয়াদে কোনো বিষয় সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও, পরবর্তী নির্বাচনে বিরোধী পক্ষ যদি দেশের ক্ষমতায় এসে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি লাভ করে, তবে তারা পূর্ববর্তী সেই সংশোধনীটিকে পুনরায় পরিবর্তন বা বাতিল করে দিতে পারে। অথবা, ওই নির্দিষ্ট সংসদ বহাল থাকা অবস্থাতেই যদি কোনো নাগরিক বা পক্ষ সেই সংশোধনীটিকে মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক দেখিয়ে আদালতে রিট বা চ্যালেঞ্জ করে, তবে আদালতও উক্ত সংশোধনীকে বাতিল করে দিতে পারে।

বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এর সাংবিধানিক অবস্থান

এই আইনি জটিলতার কারণেই বাংলাদেশের সংবিধানে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা সাংবিধানিক ও কাঠামোগত দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়া সেই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:

১. সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ সংযুক্তি।

২. রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ‘আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’ স্থাপন।

৩. ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান।

এই তিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় বিভিন্ন সময়ে সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল। আর এই সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়ার কারণেই এগুলোর আইনি ভিত্তির মধ্যে দুর্বলতা রয়ে গেছে। সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার যে চার মূলনীতি রয়েছে, তার অন্যতম একটি হলো ধর্মনিরপেক্ষতা; অথচ আলোচ্য এই তিনটি বিষয় আপাতদৃষ্টিতে অন্য সকল ধর্মের ওপর ইসলাম ধর্মকে এক ধরনের প্রাধান্য প্রদান করে। এই কারণে আইনি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই তিনটি বিষয়ের সংযুক্তি মূলত সংবিধানের মূল ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। যে কারণে পরবর্তীতে এটি আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার পর, আদালত ‘আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’-এর ধারাটিকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দেয়। তাত্ত্বিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে শুধু এই একটি বিষয়ই নয়, বরং তিনটি বিষয়ই বাতিলযোগ্য।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে বাকি ধারাগুলো আদালত তখন বাতিল করল না কেন? এর কারণ হলো এ দেশের আদালত ও বিচারকগণ সচরাচর ক্ষমতাসীন সরকারের আজ্ঞাবহে পরিণত হন। তৎকালীন সরকার রাজনৈতিকভাবে অনুধাবন করেছিল যে, যদি সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ বা ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বাতিল করে দেওয়া হয়, তবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি বা পাবলিক সেন্টিমেন্ট সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হবে এবং সাধারণ জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে। এই রাজনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে তারা বিচারবিভাগকে প্রচ্ছন্ন নির্দেশ দিয়েছিল যেন এই দুটি সংবেদনশীল বিষয় বাতিল না করে, আপাতত কেবল ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’-এর অংশটি বাতিল করে দেওয়া হয়।

ফলশ্রুতিতে, আদালতের রায়ের মাধ্যমে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’-এর ধারাটিকে সংবিধান থেকে উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ এবং ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ নামক বিষয় দুটি দৃশ্যত বা কাগজে-কলমে বহাল আছে ঠিকই, কিন্তু সংবিধানের মূলনীতির আলোকে তা দুর্বল অবস্থায় টিকে আছে। কারণ এই সংযুক্তিগুলো মূলত সংবিধানের মূল চার নীতির একটি, অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক ও বিপরীতমুখী। ফলে অত্যন্ত দুর্বল আইনি ভিত্তিতে ঝুলে থাকার কারণে, ভবিষ্যতে যেকোনো ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবাপন্ন সরকার চাইলেই স্রেফ সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বা আদালতের মাধ্যমে এটিকে অনায়াসে বাতিল করে দিতে পারে।

অতএব, জুলাই সনদের মাধ্যমে যেসকল বৈপ্লবিক বা নতুন আকাঙ্ক্ষার কথা সংবিধানে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠছে, তা বাস্তবায়ন করার সবচেয়ে সুনিশ্চিত ও নিরাপদ উপায় ছিল একটি নতুন গণপরিষদ গঠন করে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সংবিধান রচনা করা। এটি সম্পন্ন করা সম্ভব হলে রাষ্ট্রের আমূল বা আগাগোড়া পরিবর্তন ঘটানো যেত। কিন্তু যেহেতু দেশের প্রভাবশালী পক্ষগুলো বা কায়েমি গোষ্ঠীসমূহ এই আমূল পরিবর্তনের পথটি মানতে রাজি হচ্ছিল না, তাই বাধ্য হয়েই এর বিকল্প কী হতে পারে তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন হয়।

বিকল্প পন্থার সন্ধান

সেই বিকল্প পন্থাটি ছিল চলমান সংবিধানকে বহাল রেখে তার ভেতরেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা পরিমার্জন সাধন করা। কিন্তু সংবিধানে এই পরিবর্তন আনার যে স্বাভাবিক পদ্ধতি অর্থাৎ সংশোধনী বা অ্যামেন্ডমেন্ট আনা, যা খুবই দুর্বল প্রক্রিয়া। যেকোনো নতুন পরিবর্তন আনতে গেলে বর্তমান সংবিধানের যে মূলনীতিগুলো রয়েছে, সেগুলোকে সম্পূর্ণ মেনেই তা আনতে হবে। অথচ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রধান দ্বিমত ও মৌলিক আপত্তি তো রয়েছে মূলত ওই চার মূলনীতিকে কেন্দ্র করেই। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক আইনি কাঠামো অনুযায়ী, গণপরিষদ ছাড়া অন্য কারও পক্ষে সেই মূলনীতি পরিবর্তন করার কোনো আইনি এখতিয়ার নেই; আর সেই গণপরিষদ তো ১৯৭২ সালেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যা নতুন করে আর কখনো গঠিত হয়নি।

এই জটিলতার কারণে জুলাই-উত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতির এই পর্যায়ে এসে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষই একমত হল যে, এর একমাত্র বিকল্প পদ্ধতি হলো সংবিধানের আমূল ‘সংস্কার’ করা। এটি কোনো সাধারণ সংশোধন নয়, বরং প্রকৃত অর্থেই সংস্কার। আর এই সংবিধান সংস্কারের জন্য গাঠনিক ক্ষমতা সম্পন্ন একটি বিশেষ পরিষদ প্রয়োজন, যা কোনো সাধারণ সংসদ দ্বারা সম্পাদন করা সম্ভব নয়। সাধারণ সংসদগুলো কেবল সংবিধানে সংশোধনী আনতে পারে; কিন্তু তারা সংবিধানের মৌলিক সংস্কার, পুনঃপ্রবর্তন কিংবা নতুনভাবে সংবিধান রচনা করতে পারে না। এই ধরনের সুদূরপ্রসারী মৌলিক কাজগুলো করার জন্য যে বিশেষ আইনি এখতিয়ার বা ক্ষমতার প্রয়োজন পড়ে, তাকে বলা হয় ‘গাঠনিক ক্ষমতা’।

গণপরিষদ হল সম্পূর্ণ গাঠনিক ক্ষমতাসমৃদ্ধ একটি পরিষদ। আগেই বলা হয়েছে দেশের বড় রাজনৈতিক শক্তি গণপরিষদে সম্মত নয়।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ

এমতাবস্থায় দেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞদের পক্ষ থেকে একটি বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপিত হল যে, গাঠনিক ক্ষমতা দিয়ে একটি বিশেষ পরিষদ গঠন করা হোক, যার প্রাতিষ্ঠানিক নাম হবে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’। এমন গাঠনিক ক্ষমতা সম্পন্ন একটি পরিষদের মাধ্যমে যদি সংবিধানের মৌলিক সংস্কার সাধন করা যায় এবং সেই সংস্কারের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হয়, তবে পরবর্তীতে কোনো পক্ষই আইনিভাবে সেটি বাতিল করতে পারবে না এবং কেউ তা আদালতে নিয়ে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগও পাবে না। এমনকি ভবিষ্যৎ কোনো সাধারণ সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ কিংবা সর্বসম্মত মেজরিটি দিয়েও সংশোধনীর মাধ্যমে এই পরিবর্তনের ভেতরে হাত দেওয়া সম্ভব হবে না। ফলে এই সংস্কারের আইনি ভিত্তিটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুরক্ষিত হয়ে উঠবে। তৎকালীন সময়ে সব পক্ষই এই ভাবনার সাথে একমত পোষণ করেছিল যে, জুলাই সনদটিকে এমন একটি নিশ্ছিদ্র আইনি প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা উচিত, যেন পরবর্তীতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত শক্তি, সংসদ কিংবা আদালত এটিকে বাতিল বা অকার্যকর করতে না পারে।

এই লক্ষ্য পূরণের জন্য ন্যূনতম যে পদক্ষেপটি গ্রহণ করা আবশ্যক, তা হল পূর্বোল্লিখিত গাঠনিক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিশেষ পরিষদ গঠন করে সংবিধানের কাঠামোগত সংস্কার সাধন করা। এর বিপরীতে প্রথম পদ্ধতি তথা কেবল সাধারণ সংশোধনীর মাধ্যমে এই কাজ সম্পন্ন করতে গেলে জুলাই সনদের মূল চেতনা ও পরম আকাঙ্ক্ষা কখনোই পূরণ হবে না। কারণ সংশোধনী যেকোনো পরবর্তী সংসদই অনায়াসে বাতিল করে দিতে পারে; যার প্রমাণ হল, দেশে এ যাবৎ আনা ১৭টি সংশোধনীর অনেকগুলোই পরবর্তীতে আদালতে কিংবা সংসদে গিয়ে বাতিল হয়ে গেছে। অর্থাৎ, এই প্রক্রিয়ার পরিবর্তনগুলো স্থায়ী হয় না; আজ তা প্রবর্তিত হলে কালকেই অন্য কোনো সরকার এসে তা বদলে দিতে পারে।

সংস্কার পরিষদেই সবার ঐক্যমত

দীর্ঘদিনের নানামুখী টানাপোড়েন ও রাজনৈতিক দরকষাকষির পর, জুলাই বিপ্লবের পক্ষের যারা গণপরিষদ গঠনপূর্বক ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ ও ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছিল, তারা বাস্তবতার নিরিখে নিজেদের অবস্থান থেকে কিছুটা নমনীয় হল। অপরদিকে, যারা কেবল সংবিধানে সাধারণ সংশোধনীর মাধ্যমে এক ধরনের জোড়াতালি বা গোঁজামিল দিয়ে কাজ সারতে চাচ্ছিল তারাও তাদের আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এল। পরিশেষে উভয় পক্ষের মাঝামাঝি একটি সমঝোতা হিসেবে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হল যে, দেশে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করা হবে এবং তার মাধ্যমেই সংবিধানের চূড়ান্ত সংস্কার সম্পন্ন করা হবে।

প্রকৃত অর্থে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দুটি পথ ছিল; যার প্রথমটি হল গণপরিষদ গঠন করা এবং দ্বিতীয়টি হল সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা। এই দুই পদ্ধতির কথা আলোচিত হয়ে আসছিল এবং এই বিকল্প দুটির যেকোনো একটিকে গ্রহণ করার সুযোগ ছিল। সকলের সম্মতির ভিত্তিতে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের উদ্যোগ নেয়া হল।

সংস্কার পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে গণভোট

এরপর তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এল- এই সংবিধান সংস্কার পরিষদ কীভাবে গঠিত হবে?

কেননা এমন পরিষদ গঠন করতে গেলে তার পেছনে জনগণের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ম্যান্ডেট বা আইনগত গণরায়ের আবশ্যকতা রয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে অর্পিত নয়, তা সংবিধানকেও দেওয়া নেই, দেশের পার্লামেন্টের হাতেও দেওয়া নেই। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কিংবা দেশের সংবিধান- কোনোটিই সার্বভৌম নয়; বরং রাষ্ট্রের একমাত্র সার্বভৌম হল জনগণ।

যেহেতু রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী জনগণ, সেহেতু জনগণের প্রত্যক্ষ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েই এই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা আবশ্যক; তবেই সেই পরিষদ রাষ্ট্রে যেকোনো ধরনের শক্তিশালী পরিবর্তন বা কাঠামোগত সংস্কার সাধন করার আইনি বৈধতা লাভ করবে। এই যুক্তি ও উপলব্ধি থেকেই সকল পক্ষ একমত হল যে, এ উদ্দেশ্যে দেশে একটি ‘গণভোট’ অনুষ্ঠান করা হবে। এই গণভোটের মূল উদ্দেশ্য হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে জনগণের মতামত গ্রহণ করা।

গণভোটের ব্যালট

এই ঐকমত্যের ভিত্তিতে ঐকমত্য কমিশন গণভোটের জন্য ৪টি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নকে সন্নিবেশ করে ব্যালট তৈরি করে। যেই ৪ প্রশ্নের মধ্যে জুলাই সনদের মূল স্পিরিট ও সারকথা অন্তর্ভুক্ত হয়। এই ব্যালটের উপর জনগণের সরাসরি রায় গ্রহণ করা হবে।

গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সেই পরিষদকে এমন একটি বিশেষ ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ প্রদান করা হবে, যার বলে তারা জুলাই সনদের চেতনা অনুযায়ী সংবিধানের মৌলিক সংস্কার করতে পারবে। জনগণ এমন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরিষদ গঠনে একমত কি না এটিই ছিল গণভোটের মূল কথা। এর পাশাপাশি, জুলাই সনদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল স্পিরিটকে অস্পষ্ট না রেখে সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট গ্রহণ করা হবে।

জুলাই সনদের ভেতরে যেহেতু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, তাই ঢালাও প্রশ্ন করলে সেই ভিন্নমতের বিষয়গুলো অস্পষ্ট থেকে যেতে পারত। তাই জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক দিকগুলোকে যতটা সম্ভব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে গণভোটের চার প্রশ্নের মাধ্যমে সনদের মূল নির্যাসকে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়।

গণভোট ব্যালটের ব্যাপকতা

জুলাই সনদের মাধ্যমে বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে মূলত কী কী মৌলিক পরিবর্তনের প্রস্তাবনা আনা হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, গণভোটের সেই চারটি প্রশ্ন কীভাবে সমগ্র জুলাই সনদকে নিজের ভেতরে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করতে সমর্থ হয়েছে। যদিও প্রশ্নসংখ্যা ছিল মাত্র চারটি, কিন্তু এই চারটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের পরিধি এতই বিস্তৃত ছিল যে, তার ভেতরে যেন গোটা জুলাই সনদের সম্পূর্ণ রূপরেখাটিই একীভূত হয়ে সামনে এসেছে। বিষয়টিকে একটি তাত্ত্বিক বইয়ের বিন্যাসের সাথে তুলনা করে বোঝা যেতে পারে; যেমন কাউকে যদি সুনির্দিষ্টভাবে চারটি প্রশ্ন করা হয়, যার প্রথম প্রশ্নটি হল বইটির প্রথম অধ্যায় থেকে দশম অধ্যায়ের যাবতীয় বিষয়ের মূল নির্যাস লেখো, দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো একাদশ অধ্যায় থেকে চতুর্দশ অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ তুলে ধরো, তৃতীয় প্রশ্নটি হলো পঞ্চদশ অধ্যায় থেকে পঁয়ত্রিশতম অধ্যায়ের মূল বক্তব্য পরিষ্কার করো এবং চতুর্থ প্রশ্নটি হলো ছত্রিশতম অধ্যায় থেকে পঞ্চাশতম অধ্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত সমস্ত আলোচনার নির্যাস লিপিবদ্ধ করো- তবে বাহ্যিকভাবে প্রশ্ন ৪টি মনে হলেও পঞ্চাশ অধ্যায়ের সেই বইটির কোনো অংশই আর বাকি থাকে না। গণভোটের সেই চার প্রশ্নের কাঠামোটিও ছিল অনেকটা এমন।

এই প্রক্রিয়ার একটি সহজ সুরত বা বিকল্প পথ এমনও হতে পারত যে, জনগণের সামনে স্রেফ একটি একক প্রশ্ন রাখা হলো যে, তারা জুলাই সনদের আলোকে দেশের সংবিধান সংস্কার করার পক্ষে একমত কি না? এমন একটি মাত্র সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন করলেও তাত্ত্বিকভাবে কাজ চলত, কিন্তু বাস্তবে এই ধরনের ঢালাও প্রশ্ন করলে পরবর্তীতে বিতর্কের সুযোগ থাকত। কারণ জুলাই সনদের ভেতরে প্রতিটি দলের নিজস্ব ‘নোট অব ডিসেন্ট’ লিপিবদ্ধ রয়েছে। এমতাবস্থায় সাধারণ জনগণ যদি স্রেফ ‘হ্যাঁ’ বলে সনদের পক্ষে ঢালাওভাবে একমত প্রকাশ করত, তবে তা নিয়ে অস্পষ্টতা থেকে যেত।

ফ্যাসিবাদ রোধে জুলাই সনদ

রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরম এককেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়ে। নিরঙ্কুশ ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা যখন কোনো একক ব্যক্তি বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাতে কুক্ষিগত হয়, ঠিক তখনই সেখান থেকে ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়। বাংলাদেশের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থায় এই ক্ষেত্রে যেসকল গভীর সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলোকে আমূল পরিবর্তন করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাই হল জুলাই জাতীয় সনদ। এই সনদের অধীনে যেসকল মৌলিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি দিক হলো দেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা।

বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর ক্ষমতাসীন দলকে যেভাবে একচ্ছত্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে তা যৌক্তিক পরিমাণে হ্রাস করতে হবে। কারণ এই অসীম ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দল রাষ্ট্রে সর্বেসর্বা বা ডিক্টেটর হয়ে ওঠেন এবং স্বেচ্ছাচারিতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন।

এই অনিয়ন্ত্রিত একনায়কতন্ত্র থেকেই মূলত ফ্যাসিবাদের আগমন ঘটে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে চরম বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। অতএব, ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধের প্রধান শর্তই হলো প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দলের এই একচ্ছত্র ক্ষমতা কমিয়ে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা, যেন কোনো শাসক বা দল ভবিষ্যতে আর ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার সুযোগ না পায়। তবে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দলের এই ক্ষমতা হ্রাসের প্রক্রিয়াটি এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে, যেন তা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক বা শাসনতান্ত্রিক ক্ষেত্রে আবার কোনো ধরনের অচলাবস্থা বা শূন্যতার সৃষ্টি না হয়। অর্থাৎ, কৌশলগতভাবে এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে যাতে মূল উদ্দেশ্যও সফল হয়, আবার রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাও বজায় থাকে। এই লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কিছু সুনির্দিষ্ট ক্ষমতাকে বিভক্ত করে তা রাষ্ট্রপতির অনুকূলে ন্যস্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খুবই সীমিত। কিছু নিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা, আর কিছু অনুষ্ঠানের আজ্ঞাবাহী অলংকার হওয়া ছাড়া রাষ্ট্রপতির হাতে তেমন কোনো ক্ষমতাই নেই।

এই চরম ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা দূর করতেই জুলাই সনদের প্রস্তাবনায় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নিকট হস্তান্তর করার কথা বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি, বিচারক নিয়োগদানের ক্ষমতাও প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশনের হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাব আনা হয়েছে; যার ফলে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকবে না। এই নতুন রূপরেখায় প্রধান বিচারপতি এবং উচ্চ আদালতের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ বিচারকদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ স্বতন্ত্র নিয়োগ কমিশন গঠিত হবে। এই স্বাধীন কমিশনই সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিতভাবে দেশের বিচার বিভাগ পরিচালনা করবে, নতুন বিচারক নিয়োগ দেবে এবং প্রয়োজনীয় আদালত প্রতিষ্ঠা করাসহ বিচারিক সমস্ত বিষয় তদারকি করবে, যা বর্তমান ব্যবস্থায় মূলত প্রধানমন্ত্রী এককভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকেন।

একই সাথে, রাষ্ট্র পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ও কমিশন রয়েছে, যেগুলোতে এখন প্রধানমন্ত্রী এককভাবে নিয়োগদান করেন, তার মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির কাছে হস্তান্তর হবে। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো এখন সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাধীন। জুলাই জাতীয় সনদের সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী এই সকল পদে নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির অধীনে চলে যাবে এবং প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন বিচারক নিয়োগ দিবে। এর মূল যৌক্তিকতা হল, প্রধানমন্ত্রী যখন এককভাবে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা ভোগ করেন তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই নিজের রাজনৈতিক দলের প্রতি অনুগত ব্যক্তিদের বিচারক হিসেবে বেছে নেন। আর দেশের উচ্চ আদালতের বিচারকগণ যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের আদর্শের অনুসারী হন, তবে তাঁদের কাছ থেকে নিরপেক্ষ বা ইনসাফপূর্ণ বিচার আশা করা যায় না। এর ফলে সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার মধ্যেই এক ধরনের বৈষম্য ও বেইনসাফি তৈরি হয়। কাজেই, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা রক্ষার স্বার্থেই বিচারক নিয়োগের এই প্রক্রিয়াটিকে প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি নিরপেক্ষ কমিশনের অধীনে আনা আবশ্যক।

বিচার বিভাগের পাশাপাশি রাষ্ট্রের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ রয়েছে, যেগুলোকে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এক সময় সম্পূর্ণ দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি ক্ষেত্র হলো পিএসসি বা বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন। দেশের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান বিধিমালা, নিয়োগের ধরন এবং কারা নিয়োগ পাচ্ছে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি হতাশাজনক চিত্র ফুটে ওঠে। বর্তমান ব্যবস্থায় বিসিএস পরীক্ষার প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষা শেষে মৌখিক পরীক্ষা বা ভাইভার পর্যায়টিতে এসে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। টেলিফোনে তদবির বা অনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অভিযোগ রয়েছে। এর ক্ষতিকর ফলস্বরূপ, পাঁচ বছরের একটি সরকারি মেয়াদে পুরো প্রশাসনে যেসকল কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তারা মূলত সেই সময়কার ক্ষমতাসীন দলের একনিষ্ঠ কর্মী বা সমর্থক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই দলীয়করণের ধারাবাহিকতায় গত ১৫ বছরের প্রশাসনে একটানা আওয়ামী লীগের অনুগত লোকজন নিয়োগ পেয়েছে; এর পূর্ববর্তী ৫ বছরের প্রশাসনে নিয়োগ পেয়েছিল বিএনপি জোটের পছন্দের লোকজন। তারও আগের ৫ বছরের মেয়াদে আবার আওয়ামী লীগের অনুগতরা এবং তার আগের ৫ বছর বিএনপির লোকজন সরকারি চাকরিতে সুযোগ পেয়েছিল। এইভাবে যখনই যে সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, দেশের মূল প্রশাসনিক কাঠামো বা আমলাতন্ত্র তাদেরই দলীয় লোকজনে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রশাসনের এই ভয়াবহ দলীয়করণ বন্ধ করার লক্ষ্যেই জুলাই সনদে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই নতুন পিএসসির চেয়ারম্যান কিংবা এর মূল পরিচালনা পর্ষদটি এমন একটি স্বতন্ত্র প্রক্রিয়ায় নিয়োগ হবে, যেখানে কেবল সরকারি দল বা প্রধানমন্ত্রীর একক রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে না। এই নিরপেক্ষ কমিশনটি গঠন করার পেছনে কিছু বিশেষ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষাকবচ থাকবে, যার মাধ্যমে এটি একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও স্বাধীন কমিশন হিসেবে কাজ করবে এবং মেধার ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে নিয়োগ নিশ্চিত করবে। এভাবে রাষ্ট্রের যেসকল গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্তমানে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন, সেগুলোর ওপর থেকে প্রধানমন্ত্রীর সেই একক আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে মৌলিক পরিবর্তন আনা হবে।

চলবে...

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন