ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত রোগ। বাংলাদেশে বড় দাগে মশাবাহিত রোগগুলো হলো—ডেঙ্গু, চিকুনগনিয়া, জিকা, ফাইলেরিয়েছিস, ম্যালেরিয়া, জাপানিজ এনকেফেলাইটিস প্রভৃতি। এই রোগগুলো যেসব মশা দিয়ে বাহিত হয়, সেগুলো সাধারণত এডিস, কিউলেক্স এবং অ্যানোফিলিস।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি যে রোগটি আমাদের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো ডেঙ্গু। যার বাহক এডিস ইজিপ্টাই এবং এডিস অ্যালবোপিক্টাস। সত্য বলতে কী, এডিস মশার আনুপাতিক ঘনত্ব কিউলেক্স মশার তুলনায় অতি নগণ্য। কিন্তু তারপরও কেন তার তাণ্ডবতা দিন দিন বেড়েই চলছে। বেড়ে চলেছে মৃত্যুর মিছিল।
কিউলেক্স মশার অত্যাচার আর উপদ্রুপে মনে হয় পুরো ঢাকা শহর ওরা দখলে নিয়েছে। কোনো কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। সবকিছুই তাদের দখলে। দেশের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোও চলে গেছে অ্যানোফিলিস মশার আওতায়। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে আমরা সবাই মশার রাজ্যে ভাড়াটিয়া। কেন এমন ভয়ানক পরিস্থিতি।
আমাদের দেশে একটি মশক নিবারণ অধিদপ্তর রয়েছে। কতটা কার্যকর এই অধিদপ্তর এবং কতটা সুফল পাচ্ছেন দেশবাসী। তা সত্যিই জানার সময় এসেছে। মশক দমনে কার্যকর পদক্ষেপ অবশ্যই বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে। বিজ্ঞান অবশ্যই ডেটাবেসের ওপর ভিত্তি করেই পদ্ধতি নিরূপণ করবে।
২০২২ সালের এক পরিসংখ্যান মোতাবেক ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আয়তন ১৯৬ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার, অঞ্চল ১০টি, ওয়ার্ড ৫৪টি ও বাড়ি ১,৬৩৬৯২৪টি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল ১০টি, ওয়ার্ড ৭৫টি ও বাড়ি ১,১০৪৭০৩টি। ওপরের পরিসংখ্যান থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে, উত্তর সিটি করপোরেশন আয়তনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তুলনায় ৮৭ দশমিক শূন্য ২ বর্গকিলোমিটার বেশি এলাকাজুড়ে অবস্থিত। যদিও ঢাকা উত্তর সিটিন ওয়ার্ড দক্ষিণের তুলনায় কম।
এবার আসি বাড়ির সংখ্যার সঙ্গে মশক নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক কী? উত্তর খুবই স্পষ্ট। ১৯ থেকে ২৭ জুন উত্তর সিটি করপোরেশন মশক নিধন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। প্রশিক্ষণ কর্মশালায় কর্মীদের কাছ থেকেই জানতে পারি ৬০ সিসি লার্ভিসাইড হিসেবে প্রদত্ত টেমিফোস (একটি অর্গানো-ফসফেট কীটনাশক) প্রতি ১০ লিটার পানির মধ্যে ১৫ সিসি মিশিয়ে স্প্রে করতে হয় এবং প্রতিদিন এক-একজন কর্মী মোট টেমিফোস স্প্রে করে ৬০ সিসি। অর্থাৎ ৪০ লিটার পানিতে ৬০ সিসি লার্ভিসাইড। তাদের ভাষ্যমতে প্রতিদিন এই ৪০ লিটার পানিতে মেশানো ৬০ সিসি লার্ভিসাইড দিয়ে গড়ে ৪০-৬০টি বাড়ি স্প্রে করা সম্ভব। যদিও তাদের প্রদত্ত লগ বুকে মাত্র দু-একটি বাড়ির মালিক বা কেয়ারটেকারের সই থাকে। বিষয়টি সত্যিই ভাবিয়ে তোলার মতোই। এদের কোনো যথাযথ পর্যবেক্ষণও নেই।
যাই হোক, যদি প্রতিদিন একেকজন কর্মী ৬০টি বাড়িই স্প্রে করে, তাহলেও উত্তরের মোট নিযুক্ত মশক নিধনকর্মী ১১০০ জনের একবার করে সব বাড়ি স্প্রে করতে সময় লাগবে কমপক্ষে ২৪ দিন। এই ২৪ দিনে মশা তার জীবন চক্র শেষ করে, রোগ ছড়িয়ে মানুষের জীবন কেড়ে নিয়ে মানুষকে সর্বস্বান্ত করে ফেলবে অনায়াসেই। একই হিসাবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নিযুক্ত ৮৭৩ জন মশক নিধন কর্মীর ১৯০৪৭০৩টি বাড়ি স্প্রে করতে কমপক্ষে সময় লাগবে ২১ দিন। এর মধ্যেই মশক তার সব ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম মনের আনন্দেই শেষ করবে এবং করেই চলেছে বলে ডেঙ্গুকে আমরা শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে দিতে সফল হয়েছি।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, সমাধান কী? সমাধান অবশ্যই আছে। তবে তারও আগে সাধারণ জনগণের কাছে তুলে ধরতে হবে মশক নিবারণ অধিদপ্তরের দায়িত্ব কী এবং কতজন জনবল নিয়ে কী সফলতা বয়ে এনেছে মশক নিধন কার্যক্রমে। অধিদপ্তর ঢাকায় অবস্থিত। অথচ ঢাকাতেই মশক নিধন কার্যক্রম কতটা নাজুক। এই অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করতে হবে। ঢেলে সাজাতে হবে কাঠামো। কর্মটিই তাদের মশা মারা। তাই কর্মীসহ কীটতাত্ত্বিক সক্ষমতা বাড়ানো আশু প্রয়োজন। প্রয়োজন গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সুবন্দোবস্তকরণের। তাদের নিজস্ব জনবল ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে মশার ঘনত্ব জরিপ থেকে শুরু করে নিধন কার্যক্রমের প্রতিনিধিত্ব করবে এই অধিদপ্তর। কারণ মশা, ডেঙ্গু ভাইরাসসহ প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে।
সিটি করপোরেশনের বাইরে মশক নিধনের সব কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া উচিত এই অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে। তাই প্রয়োজন এখনই এর আমূল সংস্কার। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন এই অধিদপ্তর স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে বৈজ্ঞানিকভাবে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করার মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জিত হবে।
ঢাকা-উত্তর সিটির প্রতিটি বাড়িতে সপ্তাহে দুবার লার্ভিসাইডিং ও এডাল্টিসাইডিং করতে হলে মশককর্মী প্রয়োজন হবে কমপক্ষে ৯ হাজার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটির সপ্তাহে দুদিন লার্ভিসাইডিং ও এডাল্টিসাইডিং করতে প্রয়োজন হবে কমপক্ষে ছয় হাজার মশক নিধনকর্মী। তারপরও থাকতে হবে অত্যন্ত চৌকস পর্যবেক্ষণ। কারণ, হিসাব অনুযায়ী একজন কর্মী প্রতিদিন কমপক্ষে ৬০টি করে বাড়ি স্প্রে করবে। শুধু একটি বা দুটি বাড়ি স্প্রে করলে কখনোই কোনোভাবে কাঙ্ক্ষিত সফলতা তো দূরের কথা, অবস্থা প্রতিদিন এমনই পরিস্থিতির দিকে মোড় নেবে, যা থেকে কোনোভাবেই রক্ষা নেই। একই সঙ্গে ময়লা-আর্বজনা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সংখ্যা এবং পানি ব্যবস্থাপনাকর্মীদের সংখ্যাও বাড়াতে হবে এবং তাদের কাজের পর্যবেক্ষণ তৎপরতা আরো জোরদার করতে হবে।
নগরে মশা উৎপাদনের কারখানা অব্যাহত রেখে কখনোই মশা নিধন করা সম্ভব নয়। তাই নগর-পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও পরিবেশবাদীরা অবশ্যই সমন্বিত কার্যক্রমে যথাযথ ভূমিকা পালন করবেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিডিসি বা আইইডিসিআর নিপসম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় মশক ঘনত্বের জরিপ করে, সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করে। সিটি করপোরেশন সেই মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে মশক নিবারণ অধিদপ্তর কী ভূমিকা রাখছে মশা নিয়ন্ত্রণে। মশাকে নিয়ে গবেষণা থেকে শুরু করে, মশার বায়োলোজি, মশার ইকোলজি, বায়ো-ক্যামিস্ট্রি, মশার আচরণ, পরিবেশের সঙ্গে তার অভিযোজন প্রভৃতি বিষয়ে বাস্তব ও প্রায়োগিক গবেষণা, গবেষণালব্ধ ফল বিশ্লেষণে প্রয়োজনীয় কৌশল প্রণয়ন। জনবল তৈরি ও কর্মপরিধি নির্ধারণ এবং মূল্যায়ন যথাযথ না হলে অবস্থা যেমন আছে, দিন দিন তার চেয়েও খারাপ হতেই থাকবে।
কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হলে বছরে তিনটি মশার ঘনত্ব পরিমাপের জরিপ একাধিক প্রতিষ্ঠান হতে করে এর ক্রস চেকিংয়ের মাধ্যমে পলিসি নির্বাচন করতে হবে। পলিসির বাস্তবসম্মত বহমুখী বা হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ প্রয়োগ করতে হবে। একক কোনো পদ্ধতিই কখনো কার্যকর হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে আইপিএম এবং আইভিএমের সমন্বয়ে আইপিভিএম বা সমন্বিত বালাই ও বাহক ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করা জরুরি। এতগুলো কাজের সমন্বয় ওই প্রতিষ্ঠানকেই করতে হবে, যে প্রতিষ্ঠান তৈরিই হয়েছে মশক নিবারণ অধিদপ্তর হিসেবে।
যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে আলাদা একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে শুধু ভেক্টরবাহিত রোগ ও ইমার্জিং রি-ইমার্জিং সংক্রামক রোগগুলো নিয়ে সার্বিক গবেষণা এবং কর্মপরিকল্পনা নির্ধারিত হবে। হ্যাঁ এখনই সময় জনস্বাস্থ্যে ব্যবহৃত কীটনাশকগুলোর সক্রিয় উপাদান পরীক্ষা, তার উন্নয়ন, প্রয়োগ পদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট মানবসম্পদ উন্নয়ন, মশার প্রজনন ধ্বংসসহ সব অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান নির্মোহভাবে কাজ করার।
এটি হতে পারে মশক নিবারণ অধিদপ্তর বা আলাদাভাবে জাতীয় ভেকটর ও সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ নামে আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, নিপসস, আইইডিসিআর, সিডিসি অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। শত্রুটি হলো মশা নামক একটি পোকা। একে দমন করতে হলে ঢিলেঢালা পদ্ধতিতে কোনো কাজ হবে না। গ্রহণ করতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। সব পরিসংখ্যানিক উপাত্ত সামনে রেখে সেই অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগই আনবে কাঙ্ক্ষিত সফলতা।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ
জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম), ঢাকা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

