গাজা উপত্যকার স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোররাতে ফিলিস্তিনিরা যখন সাহরি বা তাদের ভাষায় সোহুর খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়েই মুহুর্মুহু শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো উপত্যকা। ইসরাইলের প্রায় দুই ডজন যুদ্ধবিমান গাজার বিভিন্ন ভবন ও তাঁবু লক্ষ্য করে নির্বিচার বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যেই লাশে পরিণত হয় নারী, শিশুসহ ৪ শতাধিক ফিলিস্তিনি।
নিহতদের মধ্যে গাজার কার্যত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ইশাম দা-লিস ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আল ওয়াতফা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান বাহজাত আবু সুলতান এবং বিচার মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আহমেদ আল খাত্তাসহ হামাসের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন।
ইসরাইলি বাহিনী গত ১৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া অস্ত্রবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে নির্বিচার এই হামলা শুরু করে। তবে এটাই প্রথম নয়, ১৯ জানুয়ারির পর থেকে মঙ্গলবারের আগ পর্যন্ত তারা চুক্তি লঙ্ঘন করে অনেকবারই গাজায় হামলা করেছে। এসব হামলায় ১৫৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এসব হামলার মধ্যে উত্তর গাজায় একটিতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি দাতব্য সংস্থার একজন কর্মী ও সংস্থাটির সঙ্গে থাকা একজন সাংবাদিকসহ ৯ জন নিহত হন।
অস্ত্রবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় দফার বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা চলাকালে ব্যাপক আকারের এই হামলা চালাল ইসরাইলি বাহিনী। তবে ইসরাইল দ্বিতীয় দফার আলোচনা সামনে এগিয়ে না নিয়ে প্রথম দফার সম্প্রসারণ বা সময় বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছিল আলোচনায়। একই সঙ্গে তারা প্রথম দফাতেই আরো বেশিসংখ্যক জিম্মির মুক্তি দাবি করছিল। কিন্তু চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দ্বিতীয় দফার বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা চলাকালে প্রথম দফার সময় বাড়ানো হবে। এ সময় জিম্মি মুক্তি নিয়ে চুক্তিতে কিছুই বলা হয়নি। কিন্তু ইসরাইল চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে প্রথম দফাতেই আরো বেশিসংখ্যক জিম্মির মুক্তি দাবি করে আসছিল। হামাস তাদের এই দাবি না মানলে তারা দ্বিতীয় দফার আলোচনা বাতিল করার হুমকি দিচ্ছিল বারবার।
অন্যদিকে, হামাস চুক্তির দ্বিতীয় দফা বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছিল। ইসরাইল ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফও হামাসের হাতে আটক অবশিষ্ট জিম্মিদের একবারে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু হামাস তাতে রাজি হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উইটকফ সপ্তাহান্তে হুমকি দিয়ে বলেছেন, অবিলম্বে সব জিম্মিকে একবারে মুক্তি না দিলে হামাসকে ‘চরম মূল্য দিতে হবে’। তার এই হুমকির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে মঙ্গলবার ভোর রাতের ভয়াবহ হামলার মধ্য দিয়ে। টানা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে গাজার বিভিন্ন এলাকায় নির্বিচার বিমান হামলা করে শতাধিক নারী, শিশুসহ ৪২৬ জনকে হত্যা ও প্রায় ৬০০ জনকে আহত করার মাধ্যমে হামাসের চরম মূল্য দেওয়া শুরু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরাইল অস্ত্রবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই এ আলোচনাকে স্থায়ীভাবে নস্যাৎ করে আবার সর্বাত্মক হামলা শুরুর সুযোগ খুঁজছিল। গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার আলোচনা সম্পর্কে অবহিত এক ব্যক্তি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, গাজায় যুদ্ধ যদি আবার শুরু হয়, তাহলে এটা নিয়ে আর মাথা ঘামাবেন না প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। পত্রিকাটির এই রিপোর্টের সত্যতা পাওয়া যায় মঙ্গলবার ভোরের হামলার প্রতি ট্রাম্পের অনুমোদন দেওয়ার ঘটনায়। হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা হামলায় ট্রাম্পের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
হামাস অস্ত্রবিরতি চুক্তির প্রথম দফার মেয়াদ বাড়ানোর ইসরাইলি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর ২ মার্চ থেকেই সেনারা গাজায় ত্রাণসামগ্রী প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। অথচ অস্ত্রবিরতি চুক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই ছিল গাজা উপত্যকায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাখা ত্রাণসামগ্রীর সরবরাহ আবার চালু ও তা জোরদার করা। পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে এটা করা খুবই জরুরি ছিল। কিন্তু ইসরাইল অজুহাত সৃষ্টি করে রমজান মাসের শুরুতেই গাজায় ত্রাণ প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এমনকি ৯ মার্চ থেকে গাজায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ করার নির্দেশ দেন ইহুদি বর্ণবাদী দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী ইলি কোহেন। এর ফলে পুরো গাজাই শুধু অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়নি, একই সঙ্গে সাগরের লবণাক্ত পানি শোধন করে খাওয়ার উপযোগী করার প্লান্টটিও বন্ধ হয়ে গেছে।
ফলে ২ মার্চের পর থেকেই ১৭ দিন ধরে অনাহারে, অর্ধাহারে এবং পরের দিকে না খেয়েই রোজা রাখতে হচ্ছে অবরুদ্ধ গাজাবাসীকে। আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর, কাতার, জাতিসংঘও ইসরাইলের এই আচরণের নিন্দা জানিয়েছে। কাতারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গাজায় ত্রাণ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার ইসরাইলি পদক্ষেপ ‘অস্ত্রবিরতি চুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’
ইসরাইলের এই পদক্ষেপকে গাজার ফিলিস্তিনিদের অনাহারে রেখে হত্যা করার নীতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে হামাস। এখন আন্তর্জাতিক সমালোচনা এড়ানোর কৌশল হিসেবে মাঝেমধ্যে দু-চার ট্রাক ত্রাণ গাজায় প্রবেশ করতে দিচ্ছে, যা গাজার শতকরা এক ভাগ মানুষের হাতেও পৌঁছাবে না। এই পরিস্থিতিতে না খেয়ে রোজা রাখা ছাড়া আর কিইবা করার আছে গাজার অসহায় ফিলিস্তিনিদের?
হামলায় নিহতদের সম্পর্কে গাজার আল আহলি ব্যাপটিস্ট হাসপাতালের চিকিৎসক আল কারিম বলেছেন, ‘তারা ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন, কিন্তু তাদের মুখে এখনো অনাহারের চিহ্ন ফুটে আছে। শুকিয়ে যাওয়া মুখগুলো দেখলে মনে হয়, বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দেহগুলো ছিন্নভিন্ন হওয়ার আগে অনাহারই তাদের গ্রাস করেছে, ঠেলে দিয়েছে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে। হাসপাতালে কাফনের কাপড়ে মোড়া ছিন্নভিন্ন লাশের সারির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এ কথা বলছিলেন।
নিহতদের মধ্যে ৫ থেকে ১২ বছর বয়সি অনেকগুলো শিশুর লাশও আছে। তারা ইসরাইলি হামলায় নিহত হলেও দীর্ঘ অনাহারে তারা জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে পড়েছিল। তাদের মুখে অনাহারের ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, এই শিশুরা সাহরি বা সোহুর খাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। খাওয়ার পর অবশিষ্ট রাতটি হয়তো তারা একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু ক্ষুধা-তৃষ্ণার যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট শিশুগুলোর ভাগ্যে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ আর হয়নি। ইসরাইল ঠান্ডা মাথায় তাদের হত্যা করেছে।
হাসপাতালটির জরুরি বিভাগের আরেক কোনা থেকে হঠাৎ ভেসে আসে এক জীর্ণ, ছেঁড়া কালো পোশাক পরিহিত এক মায়ের বুকভাঙা আর্তনাদ ‘আমার সন্তানরা কোথায়, কোথায় আমার বুকের ধনগুলো? তারা ক্ষুধার্ত, তারা তো সোহুর খায়নি।’ এভাবে বিলাপ করছিলেন আর লাশের সারিগুলোর ভেতর দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছিলেন সন্তানদের লাশের সন্ধানে। তার এই বুকফাটা আর্তনাদ সহ্য করার মতো ক্ষমতা সেখানে কারোরই ছিল না।
এরপর সেই মা কাফনের কাপড়ে মোড়া ছোট্ট তিনটি লাশের পাশে মেঝেতে হাঁটুগেড়ে বসে এক হাতে সন্তানদের হাত ধরে ও অন্য হাত কাঁধে রেখে মৃদু ঝাঁকুনি দিতে থাকলেন, যেন তিনি তাদের আস্তে করে ঘুম থেকে জাগাচ্ছেন। তিনি বলতে লাগলেন, ‘আমার বুকের মানিকরা, উঠে পড়ো, তোমাদের জন্য আমি সোহুর তৈরি করেছি। তোমরা না খেয়ে, ক্ষুধা পেটে নিয়ে মারা যেয়ো না।’ একজন নার্স সেই মাকে শান্ত করার জন্য এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরলে তিনি সেই নার্সকে সরিয়ে দিলেন। তারপর তার ছোট্ট মেয়েটির মুখের সাদা কাপড় খুলে আলতো করে চিবুকে ধরে বললেন, ‘আমার প্রিয় কন্যা, তোমার কি এখন আর ক্ষুধা নেই? ক্ষুধার যন্ত্রণায় তুমি সারারাত কেঁদেছো। কিন্তু তোমাকে দেওয়ার মতো সামান্য এক টুকরো রুটিও আমার কাছে ছিল না। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও প্রিয় মা আমার।’
গাজা উপত্যকাজুড়েই আজ এই মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সুজাইয়া এলাকার আবু খালেদ আবেদ ইসরাইলি হামলায় বিধ্বস্ত তার বাড়ির ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন পরিবারের সদস্যদের লাশ বের করার জন্য। সাহরির সময় খাওয়ার জন্য কিছু একটা তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন তারা। তেমন কিছুই ছিল না ঘরে। সামান্য রুটি, একটু চা পানি খেয়ে তারা রোজা রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক এমন সময়ই হঠাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে ঘরের কাচগুলো ভেঙে যায় এবং ছাদ ধসে পড়ে তাদের মাথার ওপর। তিনি বেঁচে গেলেও স্ত্রী ও সন্তানদের সবাই নিহত হয়েছেন।
আবু খালেদ আবেদের প্রশ্ন কেন ইসরাইলি সেনারা আমাদের হত্যা করছে? আমার সন্তানদের কী অপরাধ যে তারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় মারা যাবে? তিনি জোরে চিৎকার করে বলেন, ‘আমি আমার সন্তানদের জীবিত ফেরত চাই। আমার কাছে খাবার চেয়ে কান্না করা সন্তানদের কথা আমি কী করে ভুলে থাকব? তাদের ছাড়া আমি কেমন করে বেঁচে থাকব? কোথায় আজ মানবতা? আরব দেশগুলো ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আজ কোথায়? ইসরাইলের সঙ্গে প্রকাশ্যে ও গোপনে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলা আরব দেশগুলোর কাছে তার এই প্রশ্নের কোনো জবাব আছে কি?
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

