ভারতে জুলাই মাসে ‘জেনারেশন জেড’-এর সপ্তাহব্যাপী প্রবল বিক্ষোভ হিন্দুত্ববাদী পরিচয়ের রাজনীতির প্রভাব হ্রাসের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। তরুণ ভোটাররা এখন ধর্মীয় রাজনীতিতে জড়ানোর চেয়ে নিজেদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার বৃদ্ধির দাবি পূরণের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। তাদের এই বিক্ষোভ প্রমাণ করেছে, নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বর্তমানের মতো রাজনৈতিকভাবে এতটা দুর্বল অবস্থায় গত এক যুগে আর পড়েননি।
ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তাদের শাসনাধীন রাজ্যগুলোর মধ্যে বিহার ও মধ্যপ্রদেশে বিধানসভার দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপনির্বাচনে হেরে গেছে। চলতি মাসের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিত এই উপনির্বাচনের মধ্যে একটি আসন ছিল দলের জাতীয় সভাপতির ছেড়ে দেওয়া, যা প্রায় তিন দশক ধরে বিজেপির দখলে ছিল। বিজেপির এই পরাজয়ে ‘জেন জি’র বড় ভূমিকা ছিল। তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ভারতের নির্বাচনি রাজনীতিকে নতুন রূপ দেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে কেবল নির্বাচনের ফলাফল দিয়ে এই বিক্ষোভের বৃহত্তর তাৎপর্য বোঝা সম্ভব নয়, যা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা হলো—এই বিক্ষোভ গত এক দশকে বিজেপির যত্নসহ গড়ে তোলা একটি রাজনৈতিক বয়ানকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। বিজেপির সেই বয়ানে নির্বাচনি ময়দানে মোদিকে একজন অপরাজেয় নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
এই বিক্ষোভগুলোর অনন্য বৈশিষ্ট্য নিহিত আছে এগুলোর সামাজিক কাঠামোর মধ্যে। ভারতে এর আগেও বড় ও দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন হয়েছে। যেমন কৃষকদের বছরব্যাপী চলা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকারকে বিতর্কিত তিনটি কৃষি আইন বাতিল করতে বাধ্য করেছিল। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে হওয়া বিক্ষোভের সময়ও ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয়েছিল এবং এই আন্দোলনের অনেক শীর্ষস্থানীয় সংগঠক বছরের পর বছর ধরে বিনা বিচারে কারাগারে আছেন।
সেসব আন্দোলনকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, আদর্শ বা সংখ্যালঘুকেন্দ্রিক আন্দোলন হিসেবে চিত্রিত করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বর্তমান ছাত্র-আন্দোলন মৌলিকভাবেই ভিন্ন। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভারতের শহুরে ও শিক্ষিত তরুণরা। এরা সেই জনগোষ্ঠী, যারা একসময় বিজেপির অন্যতম উৎসাহী রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল এবং ‘হিন্দুত্ব’ প্রকল্পের সামাজিক অগ্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন। তাই বলা যায়, এবারের আন্দোলন অনেক দিক থেকেই রাজনৈতিক পরিবারের ভেতর থেকেই উঠে আসা এক বিদ্রোহ। ফলে পরিচিত রাজনৈতিক বয়ান ব্যবহার করে একে উপেক্ষা করা বা দমন করা মোদি সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
হিন্দুত্ববাদী যুবসমাজের অসন্তোষ
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই পরিবর্তনের তাৎপর্য বুঝতে হলে গত এক দশকে বিজেপি যে রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, তা অনুধাবন করা প্রয়োজন। ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে পরপর তিনটি পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করা এবং অধিকাংশ রাজ্যের নির্বাচনে আধিপত্য বজায় রাখা অসাধারণ রাজনৈতিক সাফল্য। হিন্দু জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ’ (আরএসএস) ও তাদের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সাংগঠনিক শক্তির ওপর ভর করে বিজেপি নির্বাচনি প্রচারণাকে একটি স্থায়ী কার্যক্রমে পরিণত করেছে। তারা অত্যাধুনিক নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং মোদিকে একজন দুর্নীতিমুক্ত ও দৃঢ়চেতা নেতা হিসেবে তুলে ধরার শক্তিশালী বয়ানের সমন্বয় ঘটিয়েছে।
এই রাজনৈতিক আধিপত্যের স্থায়িত্ব মূলত দুটি পারস্পরিক পরিপূরক স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল—হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি। প্রথম বিষয়টি অনেকাংশেই বাস্তবায়িত হয়েছে। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল, অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ এবং সংখ্যাগুরুকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বয়ানের সুদৃঢ়করণ—এসব পদক্ষেপ আন্দোলনের দীর্ঘদিনের অনেক আদর্শিক লক্ষ্য পূরণ করেছে। তবে মোদি সরকারের দ্বিতীয় স্তম্ভটি, অর্থাৎ ‘সুদিন আসছে’ বা ব্যাপকভিত্তিক সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি অনেক বেশি বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতীকী বিজয় রাজনৈতিক উদ্দীপনাকে কিছু সময়ের জন্য জিইয়ে রাখতে পারে ঠিকই, কিন্তু তা কখনোই নিশ্চিত কর্মসংস্থান, ক্রমবর্ধমান আয় এবং সুযোগ-সুবিধা প্রসারের বিকল্প হতে পারে না। যে প্রজন্মটি অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী ‘পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি’কে (আইডেন্টিটি পলিটিকস) আপন করে নিয়েছিল, তারা যখন কর্মবাজারে প্রবেশ করল, তখন তারা সরকারকে আদর্শিক লক্ষ্য পূরণের মাপকাঠিতে বিচার করার চেয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নিরিখেই বেশি বিচার করতে শুরু করল। তাই এখন বড় প্রশ্ন হলো, যে প্রজন্ম হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের সামাজিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছিল, তারা কেন এখন মোদির এই প্রকল্পের জন্য রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে?
প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
গত এক দশক যদি সত্যিই এমন কোনো যুগান্তকারী অর্থনৈতিক অগ্রগতির সময় হয়ে থাকে, যেমনটা বিজেপির সমর্থকরা প্রায়ই দাবি করেন, তবে ভারতের তরুণরাই এর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হওয়ার কথা ছিল। একটি প্রকৃত রূপান্তরমূলক অর্থনীতির ক্ষেত্রে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ, কম উৎপাদনশীল কৃষি খাত থেকে শ্রমশক্তির স্থানান্তর, মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রসার ও সুরক্ষা, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান হ্রাস, শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব কমানো এবং প্রবৃদ্ধির সুফল ব্যাপকভাবে বণ্টন করার মতো বিষয়গুলো প্রত্যাশিত।
ভারতের অর্থনীতির আকার নিঃসন্দেহে বেড়েছে। ২০১৪ সালের প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে বর্তমানে তা প্রায় চার ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ধারারই ধারাবাহিকতা, কোনো নাটকীয় উল্লম্ফন নয়। কারণ গড় প্রবৃদ্ধির হার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের আমলের আগের দশকের প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গেই তুলনীয়। মাথাপিছু জিডিপি এখনো তিন হাজার ডলারের নিচে, অথচ দেশের শীর্ষ এক শতাংশ মানুষের হাতে জাতীয় সম্পদের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ের ২২ শতাংশেরও বেশি পুঞ্জীভূত।
শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষ জাতীয় আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশের মালিক। এছাড়া ২০০০ সালে ভারতে বিলিয়নেয়ার বা শতকোটি টাকার মালিক ছিল ১০-এর কম, যা বর্তমানে ২৫০ ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে ভারতে আনুমানিক ৪৩ থেকে ৪৫ কোটি মধ্যবিত্ত নাগরিক রয়েছেন। আবার ৪৫ কোটিরও বেশি ভারতীয় এখনো অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে কাজ করছেন। এটিই প্রমাণ করে, দ্রুত সম্পদ সৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মোদি সরকারের পক্ষে এখনো সম্ভব হয়নি।
ভারতের শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ জিডিপিতে এই খাতের অবদান মাত্র ১৭ শতাংশের মতো। অন্যদিকে উৎপাদন খাত জিডিপির ১৩-১৭ শতাংশের মধ্যেই স্থবির হয়ে আছে এবং মোট শ্রমশক্তির মাত্র ১১-১২ শতাংশকে কর্মসংস্থান দিচ্ছে। যদিও ভারত তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, অটোমোবাইল, টেলিযোগাযোগ, ইলেকট্রনিক্স এবং মহাকাশ প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে বিশ্বমানের শিল্প গড়ে তুলেছে, তবুও ৬০ কোটিরও বেশি শ্রমশক্তির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এসব খাত ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ৮০-৯০ শতাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতেই কাজ করছেন এবং বেকারদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই শিক্ষিত তরুণ।
এক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে ভারতের তুলনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৮০ সালের দিকে মাথাপিছু আয়ের প্রায় সমপর্যায় থেকে যাত্রা শুরু করে চীন ব্যাপক শিল্পায়নের মাধ্যমে তার অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনে। তারা প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করে এবং বিশ্বের বৃহত্তম মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে তোলে। অন্যদিকে মোদি সরকারের অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি এবং লাখ লাখ মানুষ, বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সংযুক্ত ও ক্রমেই শিক্ষিত হয়ে ওঠা প্রজন্মের বাস্তব অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্যেকার ব্যবধানই ভারতের তরুণদের ক্রমবর্ধমান হতাশার মূল কারণ।
‘জেনারেশন জেড’ বেড়ে উঠছে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ, বিশ্বব্যাপী তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ এবং দ্রুত প্রত্যাশা পূরণের যুগে। প্রতিশ্রুত সমৃদ্ধি বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার মানসিকতা এই প্রজন্মের অনেক কম। তারা রাজনৈতিক বৈধতাকে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক ফলাফলের নিরিখে বিচার করতে চায়। সরকারের প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক ফল লাভের জন্য যুগ যুগ অপেক্ষা করার ধৈর্য তাদের নেই। বিক্ষোভ বা আন্দোলনের চেয়েও বরং তরুণদের এই অধৈর্য মনোভাবই আগামী দশকের ভারতের প্রধান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

