১৯৭২ সালের মার্চে বাংলাদেশ সব ধরনের বিদেশি সেনামুক্ত হওয়ার সময়ের একটু আগে বা পর থেকে দেশে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় যেন হঠাৎ করেই নাভি দেখানো অজন্তা ধাঁচের শাড়ি পরা অপূর্ব সুন্দরী তরুণীদের উপস্থিতি দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। এর পাশাপাশি এলোমেলো কাপড় পরা বা না পরা, উল্টোপাল্টা কথা বলা, গাঁজা টানা, মাঝেমধ্যে নাচা-গাওয়া বা চুপ মেরে থাকা ‘বাউল’ বা ‘ফকির’ বলে পরিচিত হয়ে পড়া যুবকদেরও প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তরুণীদের বেশি দেখা যেত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর পত্রিকাপাড়া এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও অনুষ্ঠানে। তথাকথিত ‘বাউল’ বা ‘ফকির’দের দেখা যেত বেশি মাজারগুলোয়, বিশেষ করে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে ‘হাইকোর্ট মাজার’ বলে পরিচিত, ‘অলিয়ে বাংলা’ বলে খ্যাত হজরত খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (র.)-এর মাজারের প্রাঙ্গণ ও আশেপাশে। এই ‘ফকির-বাউল’দের অনেকেই ছিলেন ফকির-বাউল সাজা নকল ‘বাউল’।
নব তরুণ আমার জগৎ তখন এসব এলাকাতেই—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, আর পল্টনে পত্রিকাপাড়ায় লেখালেখির নেশায় সময় কাটাতাম। এ দু’জায়গায় যেতে পথে পড়ত বাংলা একাডেমির মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সব, আর হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ। এক জায়গা থেকে অন্যটায় যেতাম হেঁটে, পথে আর তার দু’প্রান্তের জায়গাতে ওইসব সুন্দরী তরুণী আর আসল-নকল ‘বাউল-ফকির’ দেখতাম। ওই সুন্দরী তরুণী আর এইসব নকল বাউল-ফকির সম্পর্কে তখন সাধারণ্যে প্রচলিত ছিল যে, এরা গোয়েন্দা বা বিদেশি চর এবং এদের উদ্দেশ্য ছিল নব মুক্ত বাংলার পুনর্গঠনের প্রধান সম্পদ ও বাহন তরুণদের নারী ও মাদকাসক্ত করে নষ্ট করা। তা কতদূর সত্য, খোদাই জানেন।
ওই সময়ই আজম ভাই (আজম খান) উপরোক্ত চরণগুলো লেখেন এবং তা গেয়ে জনপ্রিয় করেন। দেশমুক্তির পরপরই তরুণ ক’জন, শাহযাদ ফিরদাউসের উদ্যোগে ‘সমষ্টি’ নামে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি সংগঠন করে তার পট ধরে ‘ব্লু ড্রাগন’ নামে বাংলাদেশের প্রায় নিশ্চিত প্রথম পপ সংগীত ব্যান্ড গঠন করেন। আমি নিজে ওই ধরনের পাশ্চাত্যানুকরণ-মূলক সংগীত ব্যান্ড খুব একটা পছন্দ না করলেও তাতে থাকি প্রধানত সংগীত দলটিতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু শাহযাদ ফিরদাউস, জামশেদুজ্জামান, তার অগ্রজ ফখরুজ্জামান—তাদের সঙ্গে থাকার জন্য অনেকটা, আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমার আবাল্য আগ্রহ ও সংশ্লিষ্টতার সুবাদে। দলের ফখরুজ্জামান ভাইয়ের কোনো সুবাদে পরিচিত টাঙ্গাইলের মনিরুজ্জামান ছানুর আমন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় আমরা টাঙ্গাইলে গিয়ে আমাদের প্রথম অনুষ্ঠান করতে যাই। এ অবস্থায় আমাদের দিয়ে তাদের অনুষ্ঠান করাতে আগ্রহী ছানুর স্থানীয় প্রতিপক্ষের সমর্থকরা পচা ডিম ছুড়ে অনুষ্ঠান পণ্ড করে দিলে আমাদের দল নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং তার পরপরই জিঙ্গা নামে দেশের দ্বিতীয় পপ সংগীত ব্যান্ড তৈরি হয়। তা সার্থক হয়, আর তার গীতিকার ও প্রধান গায়ক আজম খান বিখ্যাত হন। তিনি সমাজ সচেতনতামূলক গান লিখে ও গেয়ে তার বিষয়বস্তু জনপ্রিয় করেন। উপরোক্ত চরণসংবলিত গানটির মাধ্যমে ‘বাউল-ফকির’ সাজা নকলদের সম্পর্কে জনশ্রুতিটিতে বিধৃত সচেতনতা তুলে ধরেন ও জনপ্রিয় করেন। আসল-নকল ফকির বা বাউল চেনা এবং তাদের মৌলিক পার্থক্যটি ভালো করে জানা-বোঝা দরকার। না বুঝতে পারলে ১৯৭২ সালের মতোই আবার বাউলের ছদ্মবেশে বিদেশি বা বিজাতীয় চরেরা ‘বাউল’ সেজে দেশ-জাতির সর্বনাশের কাজে লেগে যেতে পারে।
আসল বাউল : ১. ‘আনিস ফকির কয়, সবকিছু হয় তারই কেরামতিতে। তারেই স্মরি সব অবস্থায়—গতি হোক বা দুর্গতি।’ (১৯৮৮ বা তার আশেপাশে বলা)
২. ‘আমি গরিবির জলে গোসল করে দারিদ্র্যকে করেছি পান; দুঃখ-কষ্টের আতর মেখেছি—এও খোদার বড় দান।’ (২০০৪ বা তার আশেপাশে বলা)
ওপরের দুই পঙ্ক্তিগুচ্ছে আসল বাউলের পরিচয় পরিষ্কার। প্রথম পঙ্ক্তিগুচ্ছটিতে বাউলের মনের গভীরের বিশ্বাস ও চিন্তাচেতনা, আর দ্বিতীয় পঙ্ক্তিগুচ্ছে তার দৃশ্যমান জীবনধারা বিধৃত। এর বাইরে কোনো বাউল নেই। এর বাইরে কেউ বাউলের ভেক ধরলে সে নকল বাউল, ধর্ম ও সমাজ তথা সামাজিক শান্তিবিধ্বংসী—শান্তিপ্রিয় প্রেমময় শান্তির বাণী প্রচার করা, আর সে মতেই নিজের জীবনসাধনায় নিবিষ্ট বাউলপন্থারও পরিপন্থী। এটা কোনো তাত্ত্বিক কথা নয়, কেতাবি বয়ানও নয়। বাউল জীবনসাধনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাজাত উপলব্ধির নির্যাসরূপে দেড় যুগের ব্যবধানে উচ্চারিত স্বগতোক্তি দুটি লেখাও হয়নি তখন, প্রকাশনার জন্যও ছিল না। নিছক আত্মজ উপলব্ধির উচ্চারণ, যা আরো প্রায় দু’যুগ পরে ঘটনাক্রমে লিপিবদ্ধ ও প্রকাশিত হয়ে পড়ে। প্রকৃত সব বাউল বচনের ক্ষেত্রেই এমন। আসল বাউলেরা সাধারণত নিজেরা অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাউল সেজে বেড়ায় না, অমন প্রচারণাও করে না। যে ‘বিরাট শিশু খেলিছে আপন মনে,’ তারই রঙের প্রতিবিম্বে রঙ্গিত হয়ে আপন মনেই তার আপন উপলব্ধির উচ্চারণগুলোকে স্বগতোক্তি করে বসে কখনো কখনো। কখনো নীরবে, আপনারই ভেতর, কখনো উচ্ছ্বাসে সোচ্চারে। সেটাই বাউলগান, বচন বা বাউলগীত হয়। কখনো তা লিপিবদ্ধ করে ফেলা হয়।
বাউলের ধর্ম—সব আসল বাউলই ধর্ম মানেন, আল্লাহ খোদায় বিশ্বাস করেন, ভক্তি করেন অসামান্য। তা না করে বাউল হওয়াটাই অসম্ভব। তা ‘বাউল’ শব্দটির অর্থ খেয়াল করলেই বোঝা যাবে। ‘বাউল’ হলো আরবি ‘বি’ বা ‘ব’, বা ফারসি ‘বা’; আর আরবি ও ফারসির ‘আউলিয়া’—এ দু’শব্দের সংযোগে গঠিত। ‘বি’, ‘ব’, বা ‘বা’-এর অর্থ, ‘সহ’ বা ‘সঙ্গে’। ‘আউলিয়া’ হলো ‘আউলিয়া-আল্লাহ’র সংক্ষেপ, ‘অলি-আল্লাহ’র বহুবচন, অর্থ—‘আল্লাহর বন্ধুগণ’। ‘বাউল’ হলো ‘বা-আউলিয়া’ থেকে ‘বাউলিয়া’র সংক্ষেপিত রূপ। ‘বা-আউলিয়া’ বা ‘বাউলিয়ার’ আসল অর্থ ‘আল্লাহর বন্ধুদের সঙ্গে’ যে থাকে, অর্থাৎ ‘আল্লাহর বন্ধুর সঙ্গী’। ‘অলি-আউলিয়ার সঙ্গী’ তাদের ছাত্র-শিষ্য, ভক্ত। বাংলাদেশে এসে শাহজালাল (র.)-ও তার সঙ্গীসাথির মতো অলি-আউলিয়ারা স্থানীয় অনার্য জনসাধারণকে বিভিন্ন কল্পিত মূলত প্রকৃতিপূজামূলক দেবদেবীর পূজার নামে বহিরাগত উচ্চবর্ণ আর্য ব্রাহ্মণ পূজারি আর তাদের স্বার্থরক্ষী ক্ষেত্র দখলকারী সশস্ত্র ‘ক্ষত্রিয়’দের অপশাসন ও অত্যাচার থেকে মুক্ত করলে পরাজিত আর্য শাসক ও তাদের বশংবদরা ‘বাউলিয়া’ বলতে খ্যাপা বোঝাতে শুরু করে। সেখান থেকেই ‘বাউল্যা’ বা ‘বাউলা’ বলতে খ্যাপা বোঝাতে শুরু করে তারা। কিন্তু সাধারণের ভাষায় ‘বাউলিয়া’ বলতে ‘বা-আউলিয়া’, অর্থাৎ ‘আল্লাহর অলিদের সঙ্গী-শিষ্য’ই বোঝাতে থাকে, আর সেই ‘বাউলিয়া’ সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘বাউল’ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহর অলিরা তাদের সঙ্গী-শিষ্যদের যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও ভক্তি, আনুগত্য ও ভালোবাসার শিক্ষাই দেবেন, তা-ই স্বাভাবিক। নিজের শিক্ষাগুরু, তথা কোরআনের পরিভাষায়, ‘মুর্শিদ’-এর প্রেমে সিক্ত তার ভক্ত সঙ্গী-শিষ্যও যে সেই শিক্ষায় নিমজ্জিত হয়ে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও ভক্তি, আনুগত্য ও ভালোবাসায় অবিচল হবেন, তাও স্বাভাবিক। তাই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও ভক্তি, আনুগত্য ও ভালোবাসায় অবিচল নয়, এমন কেউ—আর যা-ই হোক, প্রকৃত ‘বাউল’ হতে পারে না। এমন কেউ ‘বাউল’-এর ভেক ধরলে, ভয়ংকর নকল ‘বাউল’। উদাহরণস্বরূপ, লালন শাহ ফকির আজমীরের খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (র.)-এর সঙ্গী-শিষ্য নিজামুদ্দীন আউলিয়ার সঙ্গী-শিষ্য আঁখি সিরাজ সাঁইর সঙ্গী-শিষ্য হিসেবে তাদের সবারই মতো, তাদের শিক্ষানুযায়ী আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও ভক্তি, আনুগত্য ও ভালোবাসায় অবিচল ছিলেন, তারই শিক্ষা দিতেন। লালনগীতিতে বিধৃত তার কথায় তার নিজের মুর্শিদ হজরত আঁখি সিরাজ (র.)-এর পরিষ্কার উল্লেখ করেই তার শিক্ষার প্রতিধ্বনি: ‘মজজুব’, ভ্রান্তি, পথভ্রষ্টতা তবে তার সম্পর্কে নানা ভুল ধারণা প্রচলিত হয়ে পড়েছে—কিছুটা সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কারণে কৃত অপপ্রচার, কিছুটা হয়তো তার এমন কোনো আচরণ বা বচনের জন্য, যা প্রেক্ষিত মোতাবেক অনেকে বুঝতে পারেনি।
‘মজজুব’ অর্থাৎ খোদাপ্রেমের আবেগের আতিশয্যে অভিভূত হয়ে সাধারণত সংক্ষিপ্ত সাময়িক কালের জন্য অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায়, কখনো কখনো কোনো কোনো ধর্মসাধক নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই নিজের অচেতনে এমন করে, বা বলে বসেন। ধর্মের আইন ‘শরিয়ত’-এ তা তার অবস্থার কারণে ধর্তব্য হয় না, অনুসরণীয়ও নয়, তার অনুসরণ বা প্রচার ধর্মে অনুমোদিতও নয়। লালন শাহ-সহ কোনো কোনো বাউল গুরু বা ‘মুর্শিদ’-এর ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় বদ নিয়তে কেউ কেউ, আর বাউল সাজা বা বাউলপ্রেমী সাজা পথভ্রষ্টরা এরকম কিছু পেলে তার অননুমোদিত প্রচার-প্রসার ও অনুসরণ করে বাউল ও তাদের ধর্ম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করে সমাজে অনিষ্টের পথ খুলে দেয়। আর সে পথ ধরে ধর্মরক্ষা করে, বা তার ভান করে এমন অপ্রকৃতাবস্থার আচরণ বা বচন দমনের নামে ‘অলি-মুর্শিদ’-এর ‘সহবত’ অর্থাৎ সঙ্গভিত্তিক কোরাআন শরিফ আর সুন্নত মোতাবেক ধর্মশিক্ষার আদি ও অনিবার্য আবশ্যক পদ্ধতিটি উৎপাটনে সক্রিয় হয়ে ধর্মনাশ করে। ‘অলি-মুর্শিদ’-এর ‘সহবত’ অর্থাৎ সঙ্গভিত্তিক কোরাআন শরিফ আর সুন্নত মোতাবেক ধর্মশিক্ষা ও দীক্ষায় ব্যাপৃত ছিলেন বলেই হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ছাত্র শিষ্যদের ‘সাহাবি’, অর্থাৎ ‘সহবত’ বা ‘সঙ্গ’-এ থাকা জন, তথা ‘সঙ্গী’। ধর্মে দীক্ষা ও শিক্ষাদানকারী ‘অলি-মুর্শিদ’, আর তার ‘সঙ্গে’ থেকে ধর্মশিক্ষায় নিবিষ্টদের এই পারস্পরিক ‘সহবত’ বা ‘সঙ্গ’-এর সম্পর্কের কারণে তাদেরও অনেক সময় ‘সাহেব’, আক্ষরিক অর্থে ‘সঙ্গী’ বলা হতো। সেখান থেকেই বাংলা-সহ বহু ভাষায়ই ‘সাহেব’ বা ‘ছাহেব’ শব্দটির প্রচলন হয়। যদিও আজকাল সাধারণত তার প্রয়োগ এতই ব্যাপক হয়ে পড়েছে যে, তা যেকোনো যথার্থ কারণে বা অন্য কোনো কারণেই সম্মানিত ব্যক্তির ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়। তিনি আসল ‘বাউল’ ও তাদের শিক্ষাদীক্ষার ওস্তাদ; কোরাআন শরিফে উল্লেখিত ও নবী করিম (সা.)-এর সুন্নতে প্রদর্শিত শিক্ষাদান ও গ্রহণ পদ্ধতি মতো তিনি তাতে ব্যাপৃত—‘মুর্শিদ’ ও তার শিষ্যের পারস্পরিক ‘সঙ্গ’ সম্পর্কে যুক্ত হোন বা নাই হোন। তবে আজও বাংলাদেশের কোথাও ‘ছাহেব’—কখনো কখনো সংক্ষেপে ‘ছা’ব’ শব্দটি ‘অলি-মুর্শিদ’ ওস্তাদের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়।
‘মাজার’ পূজিত বা পূজনীয়? সাধারণ্য, বিশেষত পাশ্চাত্য শিক্ষায় অর্ধশিক্ষিত, আর ধর্ম বাদ দেওয়া বাউলের ভেক ধরা গাঁজা খাওয়া মূর্খ পথভ্রষ্ট ‘বাউল’ শব্দটির ওপরে ব্যাখ্যাত মূল অর্থ ভুলে বসার কারণে মনে করে ‘বাউল’রা প্রধানতই ‘মাজার’-এ বসে থাকে, সেখানেই গাঁজা খায়, আর মাজারপূজা করে। প্রকৃত প্রস্তাবে, আসল বাউল ‘মাজার’-এ ‘অলি-মুর্শিদ’দের কবরে গিয়ে তাদের ‘জিয়ারত’ করে সম্মানপূর্বক ভক্তিভরে দাঁড়ান বা বসেন বটে; কিন্তু তাদের কবরের জিয়ারতই করেন না, পূজার তো প্রশ্নই ওঠে না। কোরআন শরিফ আর সুন্নত থেকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ, তথা ‘শরিয়তের’ হুকুম বের করার চারটি সঠিক বিকল্প পদ্ধতি, ‘মজহব’-এর চার মহান ইমামের অন্যতম, ইমাম মালিক (র.) কবরের ‘জিয়ারত’কে বেদাত বলে হারাম বলে বরং কবরে শায়িত সম্মানিত বিশ্বাসীর ‘জিয়ারত’কে সুন্নত হিসেবে উৎসাহিত করেছেন। আসল বাউল তা-ই করেন। ‘মাজার’-রূপ কবরের পূজা দূরের কথা, তার জিয়ারতও তারা করেন না। কেউ মাজারপূজা করে বলে মাজার ধ্বংস করা শরিয়তের আদেশ-নিষেধের সূক্ষ্ম বিষয় না বোঝার ফল। তাই এমন কাজ ধর্মবিরোধী, শরিয়ত অবমাননাকারী, আইন লঙ্ঘনমূলক ‘খারেজি’-সুলভ অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার শামিল। সূক্ষ্ম বিষয়টির আরো একটু ব্যাখ্যা উপকারী হবে। কোরআন শরিফ আর সুন্নতে বিধৃত নির্দেশনা মোতাবেক মুসলমানদের মৌলিক বিশ্বাসের একটি হলো, মৃত্যুর পরে জীবনে বিশ্বাস—আর তারই অংশ হিসেবে এই বিশ্বাসও যে, মৃত্যুর পর মানুষের বস্তুগত দেহ সাধারণত অচল হয়ে পড়লেও মানুষটি নিজে, অর্থাৎ তার ‘রুহ’ তার বা ‘আত্মা’ মৌলিকভাবে সজীব ও সচল থাকে। আর সাধারণত তার ওই শরীর থেকে ‘রুহ’ কেয়ামতে পুনরায় একসঙ্গে মিলিত হওয়া পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন থাকলেও তার ‘রুহ’, তা যেখানেই থাক, আর তার বস্তুগত শরীরের পরমাণুর চেয়েও প্রতিটি ক্ষুদ্র সূক্ষ্মতম ক্ষুদ্রাংশ পারস্পরিক সচেতনতায় সংযুক্ত থাকে। সে কারণে তার শরীরের অণু-পরমাণু যেখানেই থাকুক—যেমনটি সাধারণত মুসলমানদের ক্ষেত্রে তা তাদের কবরে থাকে, তার সামনে গিয়ে সালাম দিলে তার ‘রুহ’ যেখানেই থাকুক, তা শুনতে পেরে জবাবও দেয়।
মৃত্যুর পর মানুষের বস্তুগত শরীরের অণু-পরমাণু আর তার ‘রুহ’র সচেতন যোগাযোগ এত সূক্ষ্ম পর্যায়ে হয়ে থাকে যে, ওই যোগাযোগের মাধ্যমে তার বস্তুগত শরীরের মাধ্যমে বলা কথা মৃত্যুপূর্ব মানুষের সাধারণ বস্তুগত শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে শোনা সাধারণত সম্ভব হয় না। এজন্যই মৃত্যুপূর্ব মানুষ মৃত্যু-পরবর্তী মানুষটির জবাব সাধারণত শুনতে পায় না। তা সত্ত্বেও ওই জবাবের সারবত্তা অবচেতনভাবে হলেও তার ‘রুহ’ অনুভব করতে পারে। সূক্ষ্ম পর্যায়ের এরূপ যোগাযোগমূলক সস্নেহ বা ভক্তিমূলক সম্পর্ক রাখার জন্য মৃত্যু-পরবর্তী কোনো মানুষের কবরের সামনে বা পাশে গিয়ে সালাম দেওয়া হয় তার সঙ্গে সস্নেহ বা ভক্তিভরে ‘সাক্ষাতের’ উদ্দেশ্যে। এই ‘সাক্ষাৎ’ শব্দটির আরবি প্রতিশব্দ হলো, ‘জর’, যা থেকে ‘জিয়ারত’—অর্থ, ‘সাক্ষাৎ-কর্ম’। ওই একই ‘জর’ শব্দমূল থেকেই, ‘মাজার’, অর্থ—‘জিয়ারত’, তথা সাক্ষাৎ-কর্মের স্থান। কবর তথা প্রয়াতের সঙ্গে ‘সাক্ষাতের’ স্থানের প্রাণহীন মাটি বা ইট-পাথরের সঙ্গে সাক্ষাতের কোনো অর্থ হয় না, যদি না বিশ্বাস করা হয় যে, সে মাটি বা ইট-পাথরের প্রাণ রয়েছে। আর তেমন বিশ্বাস করলে, তা হবে প্রকৃতি-পূজারি ধর্মের (Animism) বিশ্বাস। তাই তা হবে ধর্মবিরুদ্ধ, তাই ‘বেদাত’, যেমন বলেছেন ইমাম মালিক—‘হারাম’। কিন্তু সেখানে যিনি সমাহিত, তার সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে সেখানে যাওয়া অর্থবহ, কোরআন শরিফ আর সুন্নতের ভিত্তিতে ওপরে বর্ণিত বিশ্বাস মোতাবেক—আর তা সুন্নত, উপকারী, যেমনটি খোদ নবী করিম (সা.)-এর আচরণ থেকে পাওয়া যায়। তিনি কবরের পাশে গিয়ে কবরবাসীকে ডেকে সালাম বলেন, যেমন একজন মানুষ অন্য মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে সাধারণত করে থাকে। আসল বাউল মাজারে গেলে এ অর্থেই, এ বিশ্বাসেই কবরে সমাহিত স্বীয় দীক্ষাশিক্ষা গুরু, ‘অলি-মুর্শিদ’-এর ‘সাক্ষাৎ’, তথা ‘জিয়ারত’-এ যান—ওখানকার ইট-পাথরের, এমনকি কবরেরও জিয়ারতের জন্য নয়; এমনকি যে ‘অলি-মুর্শিদ’-এর জিয়ারতে যান, তারও পূজার জন্য মোটেও নয়। বাউলের ভেক ধরে কেউ যদি সে রকম কিছু করে কখনো কোথাও, তাহলে সে আসল বাউল-ফকির নয়, অন্য কোনো ফিকিরে কোনো ধান্ধায় সেখানে তার গমন ও অবস্থান। এর জন্য বাউলদের শিক্ষাদীক্ষার কোরআন শরিফ আর সুন্নত-ভিত্তিক পদ্ধতির বিরুদ্ধাচরণ, বা কোনো প্রয়াত ‘অলি-মুর্শিদ’-এর কবর বা মাজারের প্রাণহীন ইট-পাথরের সঙ্গে যুদ্ধ করা বেকুবি ও বেয়াদবি, দুটো একসঙ্গেই।
‘মাজারে কত ফকির ঘোরে, কয়জনা আসল ফকির’—তা চিন্তা করতে হবে। আল্লাহর প্রতি যে বেয়াদবি করে, সে যা-ই হোক প্রকৃত বাউল হতে পারে না। এদের বেয়াদবি টেকাতে গিয়ে আল্লাহর বন্ধু অলি-আউলিয়াদের প্রতি বেয়াদবিমূলক কর্মকাণ্ডও প্রকৃত ধর্ম হতে পারে না। আসল-নকলের পার্থক্য ভালো করে বুঝতে হবে। নকল ‘বাউল-ফকির’দের ফেতনাবাজি যেমন ক্ষতিকর, তেমনি তাদের প্রতিরোধের নামে অশান্তি সৃষ্টি করাও অশুভ তৎপরতা। এ বিষয়ে সচেতন থেকে শান্তিপূর্ণ কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক: শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ। ঢাকা ও র্হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণা ছাড়াও, পাশ্চাত্যে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

