আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রাজনীতিবিদরা হয়ে উঠুন বাংলাদেশপন্থি

ড. শামীম হামিদী

রাজনীতিবিদরা হয়ে উঠুন বাংলাদেশপন্থি
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের রাজনীতি ১৬ বছর ধরে একদলীয় কর্তৃত্ববাদের দখলে ছিল। তাদের গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা শুধু নির্বাচনী প্রচারণার স্লোগানে সীমাবদ্ধ ছিল, বাস্তবে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থকেই তারা অগ্রাধিকার দিয়েছে। একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসনের মাধ্যমে বিরোধী মত দমন, প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করাই হয়ে উঠেছিল শাসনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য। অথচ গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও জনস্বার্থে নীতিনির্ধারণ, যা বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সংকুচিত হতে হতে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। এ সংকট থেকে মুক্তির জন্য জনগণ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়, যা নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দেয়।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীনদের শাসন পদ্ধতি ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছিল। রাজনীতি জনগণের কল্যাণের জন্য নয়, বরং ক্ষমতার চিরস্থায়ী রূপ তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়েছে। শাসনব্যবস্থায় দলীয় আনুগত্যই প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে, ফলে দক্ষ নেতৃত্ব বিকাশের পথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একাধিক নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো নিরপেক্ষতার বদলে দলীয় স্বার্থে কাজ করেছে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতির সংযোগও গভীর। রাজনৈতিক পুঁজিবাদ ও স্বজনপ্রীতির কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ, ঋণনির্ভর উন্নয়ন এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে অর্থনীতি পরিচালিত হয়েছে, যেখানে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত থেকেছে। উন্নয়নের নামে নেওয়া প্রকল্পগুলো কখনোই টেকসই হয়নি, বরং বৈদেশিক নির্ভরশীলতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও দলীয়করণ ও দুর্নীতি বেড়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারপ্রাপ্তির সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এটি শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি, বরং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনার পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছে। তরুণ সমাজ, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যখন দলে দলে রাস্তায় নেমে আসে, তখন স্পষ্ট হয়ে যায়, দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এই আন্দোলনের শক্তি শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি স্থাপন করেছে।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়, নতুন বাংলাদেশ কি শুধু শাসকের পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি কাঠামোগত সংস্কারের দিকে এগোবে? ইতিহাসের শিক্ষা হলো, রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন তা কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭০-এর দশকে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে স্বৈরাচার পতনের পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। সেসব দেশে দেখা গেছে, ক্ষমতার রদবদল হলেও পুরোনো শাসন সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়নি, ফলে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল থেকে গেছে। বাংলাদেশকেও এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারেÑ তাই শুধু ব্যক্তির পরিবর্তন নয়, বরং নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারই হতে হবে প্রধান উদ্দেশ্য।

নতুন বাংলাদেশে রাজনীতির মূল ভিত্তি হতে হবে বাংলাদেশপন্থি দৃষ্টিভঙ্গি। অর্থাৎ, রাজনৈতিক স্বার্থ নয়, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় নীতিগুলো নির্ধারণ করতে হবে জনগণের প্রয়োজনের ভিত্তিতে, যেখানে বহিরাগত চাপ বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ নয়, বরং দেশীয় উন্নয়ন ও স্বাধীনতা রক্ষাই প্রধান হবে। অর্থনীতিকে স্বাধীন করতে হবে বৈদেশিক ঋণের চক্র থেকে, যেখানে স্থানীয় শিল্প ও কৃষিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে মুক্তচিন্তার বিকাশের কেন্দ্র, যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলীয়করণ থাকবে না এবং জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয় না, বরং এটি প্রতিষ্ঠিত হয় সামাজিক ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও আইনগত স্বচ্ছতার ভিত্তিতে। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোটাধিকার নয়, বরং এর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা। বাংলাদেশের জনগণ ১৬ বছর ধরে গণতন্ত্রের নামে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে থেকেছে। অনেক ত্যাগ ও আন্দোলনের ফলেই আজকের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনীতিবিদদের এখন দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধারা প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু মতাদর্শগত স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে দলীয় সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক ও স্বনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে।

বাংলাদেশের জনগণ এখন এক নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব হবে জনগণের এই প্রত্যাশার মর্যাদা দেওয়া এবং স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা। দলীয় আনুগত্য নয়, দেশপ্রেম ও জনকল্যাণকেই হতে হবে রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। আত্মনির্ভরশীল, গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়তে হলে এখনই রাজনীতিবিদদের বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির পথে হাঁটতে হবে।

লেখক : চেয়ারম্যান, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন