ভারতের মুসলিম ও সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার সংকট

ভারতের মুসলিম ও সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার সংকট

‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ইনশাআল্লাহ’ আর ‘জাজাকাল্লাহ’Ñতিনটি অতি পরিচিত শব্দ। হঠাৎ করেই শব্দ তিনটি আজকের ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিকত্ব, জাতীয়তাবাদ আর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে এক বিশাল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। ২০২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের আইপিএস অফিসার বুশরা বানো একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে বুশরা তার কাজের অভিজ্ঞতা এবং আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্সিয়াল কোচিং একাডেমির অবদানের কথা সেখানে তুলে ধরেন। এর পরপরই হিন্দু লিগ্যাল ফান্ড নামে একটি সংগঠন পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্রসচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ জানায়। তাদের বক্তব্য, বুশরা বানো ভিডিওতে ইসলামি অভিব্যক্তি ব্যবহার করেছেন। ‘জয় হিন্দ’ বা ‘বন্দে মাতরম’-এর মতো বাক্য ব্যবহার না করে তিনি কেন এসব বললেন, সেই প্রশ্নও তোলা হয়। এর পরদিনই বানোকে বদলি করে রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের ডেপুটি কমান্ড্যান্ট হিসেবে পাঠানো হয়। অভিযোগ আর বদলি দুটো খবরই সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে তার এই বদলি ধর্মীয় শব্দ ব্যবহারের কারণেই হয়েছে কি না, রাজ্য সরকার তা স্পষ্ট করেনি। এই পার্থক্যটুকু মাথায় রাখা জরুরি। তবে এই বিতর্ক একটি বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন সামনে এনেছে : যখন সংখ্যালঘু ধর্মের সাধারণ ভাব প্রকাশ রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হয়ে ওঠে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির প্রতীকগুলোকে দেশপ্রেমের প্রতীক বানানো হয়, তখন ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিকত্বের অর্থ আসলে কী দাঁড়ায়?

বিজ্ঞাপন

সংবিধানের প্রতিশ্রুতি

ভারতের সাংবিধানিক পরিচয় একদম পরিষ্কার। সংবিধানে ভারতকে একটি ‘সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আইনগত সমতা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতার পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়া আছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানে ‘সমাজতান্ত্রিক’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ দুটি বহাল রাখেন। আদালত স্পষ্ট করে বলেন, ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে শব্দগুলো যুক্ত করার আগে থেকেই ভারতের সংবিধানের মূল চেতনা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। তাই ভারতের মূল সংকট সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার অনুপস্থিতি নয়। আসল সংকট হলো সাংবিধানিক নীতি আর রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান দিন দিন বেড়ে যাওয়া।

সংবিধান নিজে নিজে বাস্তবায়িত হয় না। রাজনৈতিক নেতা, আমলা, পুলিশ, আদালত, নাগরিক সমাজ আর সাধারণ মানুষ মিলেই সাংবিধানিক নীতিকে বাস্তবতায় রূপ দেন। একটা ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র যখন সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী আদর্শে আচ্ছন্ন রাজনৈতিক পরিবেশে পরিচালিত হয়, তখন মূল গণতান্ত্রিক প্রশ্নটা সামনে চলে আসে।

হিন্দুত্ব ও সাংবিধানিক নাগরিকত্ব

হিন্দুধর্ম আর হিন্দুত্বের তফাতটা বোঝা খুব জরুরি। হিন্দুধর্ম একটি প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় ধর্মীয়-দার্শনিক ঐতিহ্য। অন্যদিকে হিন্দুত্ব হলো একটি আধুনিক রাজনৈতিক ভাবধারা, যা ভারতের জাতীয় পরিচয়কে মূলত হিন্দু সভ্যতা ও সংস্কৃতির আলোকে দেখে। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সুদীর্ঘ ভাবাদর্শগত সম্পর্ক রয়েছে। এই আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রভাব বেশ স্পষ্ট। তবে এই বিতর্ককে কোনোভাবেই ‘হিন্দু বনাম মুসলিম’ লড়াই হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কোটি কোটি হিন্দু এখনো বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখেন। আসল টানাপোড়েনটা হলো সাংবিধানিক নাগরিকত্ব আর ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের মধ্যে।

সাংবিধানিক নাগরিকত্বের নিয়ম অনুযায়ী একজন ভারতীয় ‘নমস্তে’, ‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘সৎ শ্রী আকাল’, ‘জয় হিন্দ’ কিংবা স্রেফ ‘গুড মর্নিং’Ñযেভাবেই সম্ভাষণ জানান না কেন, তিনি সমানভাবে ভারতীয়। দেশপ্রেম কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় শব্দের ওপর নির্ভর করতে পারে না।

বুশরা বানোর বিতর্কটি তাই একটি বড় প্রতীকী বার্তা দেয়। ‘ইনশাআল্লাহ’ বললে যদি সন্দেহ জাগে, আর সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির শব্দগুলো সহজেই দেশপ্রেমের প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়, তবে বুঝতে হবে ধর্মনিরপেক্ষতার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। একজন মুসলিম যে যথেষ্ট ভারতীয়, তা প্রমাণ করার জন্য তাকে নিজের মুসলিম পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হবেÑএকটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের কাছ থেকে তা আশা করা যায় না।

ঘটনাটি শুধু একজন অফিসারের নয়

একটি প্রশাসনিক বিতর্ক দিয়ে প্রায় বিশ কোটি ভারতীয় মুসলিমের অভিজ্ঞতা বিচার করা যাবে না। তবে নাগরিকত্ব আইন, ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং বাংলাভাষী মুসলিমদের সঙ্গে আচরণের মতো বিষয়গুলোর পাশে রেখে দেখলে বুশরা বানোর ঘটনাটির গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে যায়। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়ে বিতর্ক থামেনি। কারণ আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা নির্দিষ্ট কিছু অমুসলিম সংখ্যালঘুদের দ্রুত নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মকে শর্ত হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। সমর্থকদের দাবি, এই আইন অত্যাচারিত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আশ্রয় দেয় এবং ভারতীয় মুসলিমদের নাগরিকত্ব কাড়ে না। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, নাগরিকত্ব নীতিতে ধর্মীয় ভেদাভেদ আনা একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সাম্যনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

একইভাবে ‘বুলডোজার বিচার’Ñঅর্থাৎ অপরাধের অভিযুক্ত বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি বড় ধরনের সাংবিধানিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এমন বেআইনি ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে মূলত মুসলিমদেরই বেশি নিশানা করা হয়েছে। পাশাপাশি গো-রক্ষার নামে সহিংসতা, বাংলাভাষী মুসলিমদের ওপর নির্যাতন, উচ্ছেদ এবং মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যের খবরও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ঘটনার আইনি প্রেক্ষাপট ও দায়িত্ব ভিন্ন ভিন্ন। এগুলোকে কোনো কেন্দ্রীয় ষড়যন্ত্র বলা ঠিক হবে না। তবে সব মিলিয়ে একটি গণতান্ত্রিক প্রশ্ন তো থেকেই যায়: ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিকত্বের সুযোগ কি সব ভারতীয় সমানভাবে পাচ্ছেন?

প্রতীকী ধর্মনিরপেক্ষতার সমস্যা

ভারত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র এবং এক বহুত্ববাদী সভ্যতা হিসেবে তুলে ধরে। যেখানে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, জৈন, ইহুদিসহÑসবাই এক সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে পাশাপাশি বাস করে। এই ভাবমূর্তির পেছনে শক্ত ভিত্তিও রয়েছে। সরকার, সেনাবাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সিনেমা, ব্যবসা ও সংস্কৃতিÑসব ক্ষেত্রেই ভারতীয় মুসলিমদের অনবদ্য অবদান রয়েছে। তাছাড়া আদালত, সাংবাদিক, গবেষক, আইনজীবী, অ্যাকটিভিস্ট এবং নাগরিক সমাজ আজও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাই ভারতে মুসলিমদের কোনো অধিকার বা আইনি সুরক্ষা নেইÑএমনটা বলা ভুল হবে। কিন্তু ভারত যেহেতু একটি বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের দাবি করে, তাই সংখ্যালঘুদের প্রতি তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। বৈচিত্র্যকে যখন বিশ্বমঞ্চে প্রশংসা করা হয়, আর দেশের ভেতরে রাজনীতির প্রয়োজনে মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’, জনমিতির জন্য হুমকি বা বহিরাগত হিসেবে দেখানো হয়, তখনই তৈরি হয় মূল দ্বন্দ্ব।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ভারতে ক্রমবর্ধমান মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য ও বৈষম্যমূলক আচরণের তথ্য তুলে ধরেছে। অন্যদিকে ভারত সরকার ও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাই আসল প্রশ্ন এটি নয় যে ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে আছে কি না। সেগুলো স্পষ্টতই আছে। মূল প্রশ্ন হলো, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিগুলো সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না।

ইসরাইল, ভারত ও একটি বিতর্কিত তুলনা

ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সম্পর্ক এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ১৯৯২ সালে দুই দেশের মধ্যে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়। ২০১৭ সালে নরেন্দ্র মোদির ঐতিহাসিক ইসরাইল সফর ছিল কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর। ওই সফর দুই দেশের সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। এরপর থেকে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, কৃষি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও উদ্ভাবন খাতে এই সহযোগিতা অনেকটাই বেড়েছে।

২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের নেসেটে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদি ইসরাইলে বসবাসরত ভারতীয় বংশোদ্ভূত ইহুদিদের উদ্দেশে বলেন, ইসরাইল তাদের ‘পিতৃভূমি’ আর ভারত তাদের ‘মাতৃভূমি’। প্রেক্ষাপটটি মাথায় রাখা দরকার : তিনি শুধু সেই ইহুদিদের উদ্দেশ্য করেই কথাটি বলেছিলেন, যারা ভারতে জন্ম নিয়ে পরে ইসরাইলে গিয়েছেন। তবু, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের সমালোচকরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইলের আচরণের সঙ্গে ভারতের মুসলিমদের বর্তমান পরিস্থিতির একটি তুলনা টেনে থাকেন।

তবে এমন তুলনা করার ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা প্রয়োজন। ভারত কখনোই ইসরাইল নয়, আর ভারতীয় মুসলিমরাও ফিলিস্তিনি নন। দুদেশের ইতিহাস, ভূখণ্ডগত বিরোধ, সাংবিধানিক কাঠামো এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই নয়াদিল্লি ভারতীয় মুসলিমদের সামলাতে ইসরাইলি মডেল ব্যবহার করছেÑএমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত কোনো ভিত্তি নেই।

বরং একটি বাস্তবসম্মত প্রশ্ন তোলা যেতে পারে : ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা হলেও কি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী জাতীয়তাবাদের লক্ষণগুলো একই রকম হতে পারে? বিশেষ করে, যখন সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম আর জাতীয় পরিচয়কে এক করে দেখা হয়। তবে সাংবিধানিক পার্থক্যটা স্পষ্ট : ইসরাইল নিজেকে আইনিভাবে ইহুদি জনগণের রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। অন্যদিকে ভারত সংবিধানে নিজেকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। তাই ভারতকে সবসময় তার নিজের সাংবিধানিক অঙ্গীকার দিয়েই বিচার করতে হবে।

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে আত্মসমর্পণ নয়

বুশরা বানোর বিতর্কটি শেষ পর্যন্ত আমাদের সেই মৌলিক নীতিতেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ‘আসসালামু আলাইকুম’ মানে আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক; ‘ইনশাআল্লাহ’ মানে যদি ঈশ্বর চান; আর ‘জাজাকাল্লাহ’ হলো কৃতজ্ঞতা ও শুভকামনা জানানোর ভাষা। এর কোনোটিই ভারত, হিন্দুধর্ম, ভারতের সার্বভৌমত্ব কিংবা সংবিধানের বিরুদ্ধে যায় না।

একটি ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণতন্ত্রে ‘আসসালামু আলাইকুম’-এর সঙ্গে ‘জয় হিন্দ’, কিংবা ‘ইনশাআল্লাহ’-এর সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’-এর কোনো প্রতিযোগিতার প্রয়োজন নেই। শব্দগুলো ভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে আসতেই পারে, কিন্তু একজন নাগরিকের পরিচয়ে সেগুলো পাশাপাশি শান্তিতে টিকে থাকতে পারে।

প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা নাগরিকদের ধর্মহীন হতে বলে না। রাষ্ট্র যেন ধর্মের কারণে কাউকে বিশেষ সুবিধা না দেয় কিংবা শাস্তি না দেয়Ñসেটাই আসল কথা।

পরীক্ষাটা খুব সহজ : ‘নমস্তে’, ‘সৎ শ্রী আকাল’, ‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘জয় হিন্দ’ কিংবা ‘গুড মর্নিং’Ñযেটাই বলা হোক না কেন, নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি যদি না বদলায়, তবেই বোঝা যাবে ধর্মনিরপেক্ষতা সঠিকভাবে কাজ করছে। কিন্তু একটি শব্দ আনুগত্য প্রকাশ করে আর অন্যটি যদি সন্দেহ তৈরি করে, তবে সমস্যাটা শব্দের নয়, সমস্যাটা বক্তার পরিচয়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির।

সাংবিধানিক ভারত ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ভারত

আজ ভারত জাতীয়তাবাদের দুটি ভিন্ন ধারণার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। একটি ধারণা বিশ্বাস করে সাংবিধানিক নাগরিকত্বে। যা ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী এবং যেকোনো বৈচিত্র্যকে আপন করে নিতে দ্বিধাহীন। অন্য ধারণাটি জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে হিন্দু সভ্যতাকে বসাতে চায়। যেখানে সংখ্যালঘুদের ওপর নিজস্ব সংস্কৃতি প্রমাণের এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়।

প্রথম ভাবনাটি প্রশ্ন করে : আপনি কি ভারতের নাগরিক? দ্বিতীয় ভাবনাটি প্রশ্ন তুলতে চায় : আপনি কি যথেষ্ট ভারতীয়?

এই সূক্ষ্ম তফাতটিই একজন নাগরিকের নিরঙ্কুশ সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে শর্তসাপেক্ষ অধিকারের পার্থক্য গড়ে দেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে ভারতের সংবিধান আজও এক শক্তিশালী ঢাল। সুপ্রিম কোর্ট এখনো ধর্মনিরপেক্ষ নীতি রক্ষা করে চলছেন। পাশাপাশি সাংবাদিক, গবেষক, আইনজীবী, অ্যাকটিভিস্ট এবং সাধারণ মানুষ ভারতের এই বহুত্ববাদী রূপকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তাই এই লড়াইকে শুধু ভারত বনাম মুসলিম কিংবা হিন্দু বনাম মুসলিম হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

এটি আসলে ভারতের নিজের পরিচয় নিয়ে ভারতের ভেতরেরই একটি আত্মোপলব্ধির লড়াই।

শেষ পর্যন্ত এটি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের মূল চরিত্র রক্ষার এক আন্দোলন। ভারতীয় গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা শুধু সংখ্যালঘুদের সহ্য করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা নিজেদের মৌলিক পরিচয় ধরে রেখেই পূর্ণ অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারছে কি না, সেটাই আসল কথা। ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে লেখা থাকতে পারে, আদালত তা রক্ষা করতে পারেন আর আন্তর্জাতিক মঞ্চে তা প্রশংসিতও হতে পারে। কিন্তু এর প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে দৈনন্দিন জীবনে। যখন একজন মুসলিম অফিসার বলবেন ‘আসসালামু আলাইকুম’, একজন হিন্দু অফিসার বলবেন ‘নমস্তে’, একজন শিখ বলবেন ‘সৎ শ্রী আকাল’, একজন খ্রিষ্টান ঈশ্বরের নাম নেবেন, আর একজন নিরীশ্বরবাদী কিছুই বলবেন না। তবু রাষ্ট্র সবাইকে সমান সম্মান ও নাগরিক অধিকার দেবে। এটা সংখ্যাগরিষ্ঠের দেওয়া কোনো দয়া নয়। এটি সংবিধানের দেওয়া সমান অধিকারের গ্যারান্টি।

গণতন্ত্র যখন টিকে থাকার প্রমাণ হিসেবে নাগরিকদের কাছে নিজের পরিচয় ছোট করার দাবি তোলে, তখন শুধু সংখ্যালঘুর অধিকারই বিপন্ন হয় না, সমতার মূল ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে ওঠে।

বি আর আম্বেদকরের সেই ঐতিহাসিক সতর্কবার্তাটি হয়তো আজও সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, ‘সাংবিধানিক নৈতিকতা কোনো প্রাকৃতিক আবেগ নয়। এটিকে সযত্নে লালন করতে হয়।’ ভারতের আসল চ্যালেঞ্জ হলো সেই নৈতিকতাকে এমনভাবে লালন করা, যাতে কোনো নাগরিককে নিজের বিশ্বাসের মর্যাদা আর ভারতীয় হওয়ার মর্যাদার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে না হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন